বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

অভিমত

পরিবেশে প্লাস্টিকের বিরূপ প্রভাব

তৌহিদুর রহমান তুহিন

মানুষের জীবনে যখন যা প্রয়োজন তখন তা- উদ্ভাবন করছে তবে এখন পর্যন্ত যত আবিষ্কার হয়েছে, এর অন্যতম একটি হলো প্লাস্টিক প্লাস্টিক হলো এমন একটি উপাদান, যা সিনথেটিক বা অর্ধসিনথেটিক জৈব যৌগের তৈরি উপাদান; যা টেকসই, নমনীয়, শক্তিশালী হালকা বর্তমানে প্লাস্টিক ছাড়া এক মুহূর্ত জীবনধারণ অসাধ্য দিনের শুরুতে চায়ের কাপ থেকে রাতে ঘুমানো পর্যন্ত প্লাস্টিক নিত্যসঙ্গীতে পরিণত হয়েছে মানুষের সব রকম চাহিদা মেটাচ্ছে প্লাস্টিক প্লাস্টিকের উৎপাদিত পণ্য

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা অনুযায়ী প্লাস্টিকের বিভিন্ন রকমের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রার মানও পরিবর্তন হচ্ছে স্থানীয় বৈশ্বিক চাহিদার কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর ২০টির মতো প্লাস্টিক কারখানা তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি ছোট, মাঝারি বড় ধরনের প্লাস্টিকপণ্য প্রস্তুতকারক কারখানা রয়েছে যেখানে বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক সামগ্রী, পিভিসি পাইপ, মেডিকেল সামগ্রী, শপিং ব্যাগ, গার্মেন্ট ব্যাগ, প্লাস্টিক বোতল, গৃহস্থালি সামগ্রীসহ ২৫০টির অধিক পণ্য উৎপাদন হচ্ছে বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক রফতানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের মতে, দেশে প্রায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার ছিল হাজার ৫০০ কোটি টাকার দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে

বাংলাদেশে বিকাশমান প্লাস্টিক শিল্পের যাত্রা হয়েছিল ১৯৮০ সালের দিকে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ধীরে ধীরে তা বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার অন্যতম কারণ ছিল বিশাল চাহিদা বেশির ভাগ কারখানা বিদেশী চাহিদা মেটানোর জন্য তাদের উৎপাদন ক্ষমতাও নিয়মিত বৃদ্ধি করে যাচ্ছে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের মানুষ গড়ে প্রায় যেখানে পাঁচ কেজি ব্যবহার করে, সেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত প্রায় ছয় কেজি ব্যবহার করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ৪০ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করে শুধু বাংলাদেশে ১৯৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্লাস্টিকের চাহিদা উৎপাদন ২০ গুণ বেড়েছে একই সঙ্গে বৃদ্ধি করছে অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য; যা পরিবেশ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির মতে, ঢাকা শহরে প্লাস্টিক বর্জ্য ১৯৯২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দশমিক ৭৪ থেকে দশমিক শতাংশ বেড়েছে, যা ২০১৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক শতাংশে

প্লাস্টিকের তীব্র চাহিদার জন্য বাংলাদেশ প্রায় দশমিক লাখ টন কাঁচামাল আমদানি করেছে চাহিদা যে দিন দিন বৃদ্ধি পাবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না বিশ্বে উৎপাদিত সব প্লাস্টিকের মধ্যে অর্ধেকই তৈরি করা হয় মাত্র একবার (ওয়ান টাইম) ব্যবহার করার জন্য, যা উদ্বেগজনক প্লাস্টিক বর্জ্যের অধিকাংশ সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, যা সমুদ্রের জলজ প্রাণী থেকে শুরু করে পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করে দিচ্ছে; যা সমুদ্রের প্রধান সম্পদ মত্স্য প্রজনন বংশবিস্তারের ওপর প্রভাব ফেলছে ২০১৬ সালের জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালে সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিক বেশি থাকবে

প্লাস্টিকের মতো খুব কম আবিষ্কারই মানুষের জীবনে এতটা প্রভাব ফেলতে পেরেছে মাত্র ১০০ বছর আগে আবিষ্কৃত প্লাস্টিক শুধু পোশাক প্যাকেজিং, পরিবহন, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি কাজে ব্যবহার হতো; সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে প্লাস্টিকের বহুমাত্রিক ব্যবহার করতে শুরু করেছে তারা ঐতিহ্যবাহী উপকরণ যেমন কাঠ, সুতা, কাগজ, সিরামিক, গ্লাস, চামড়াজাত দ্রব্য, ধাতব পদার্থের স্থানে প্লাস্টিকের জায়গা করে দিয়েছে টেলিযোগাযোগ খাতে ধাতব অংশের পরিবর্তে মোবাইল কম্পিউটার যন্ত্রাংশের এক বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে শুধু প্লাস্টিক বিশ্বের ৭০ শতাংশ প্লাস্টিকের প্রতিনিধিত্ব করা শাখা হলো প্লাস্টিক প্যাকেজিং, বিল্ডিং নির্মাণসামগ্রী, মোটরগাড়ি স্বাস্থ্যসেবা শুধু প্যাকেজিং শিল্পের জন্যই বিশ্বব্যাপী ৪০ শতাংশ প্লাস্টিকের প্রয়োজন, যার চাহিদা বাড়ছে

এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে এর উৎপাদন খরচ যথেষ্ট কম এবং সহজে পরিচালনা করা যায় মুক্ত বিশ্ববাণিজ্যের সুবাদে পরিবহন ব্যয় কমায় সবার কাছে পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে এবং সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে একটি গ্রহণযোগ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে ইউরোপিয়ান প্লাস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতে, ১৯৫০ সাল থেকে বিশ্বে প্লাস্টিকের গড় চাহিদা প্রায় দশমিক শতাংশ হারে বেড়ে চলছে, যার প্রভাবে বর্তমানে প্রায় ৩৩৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদন হচ্ছে ক্রমাগত প্লাস্টিকপণ্যের চাহিদার পেছনে মূলত কয়েকটি কারণ দেখা হয় প্রথমত হলো, বিশ্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যেখানে তাদের জীবনধারার চাহিদা মেটাতে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয় প্লাস্টিক চাহিদা বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ প্লাস্টিকের অব্যাহত নতুন নতুন উদ্ভাবন, যা সহজেই বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে ভবিষ্যৎ চাহিদার ক্ষেত্রে যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধি উদ্ভাবনকেই গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক বলা হয়, তার পরও পণ্যের স্থায়িত্বও চাহিদা বৃদ্ধিতে সহায়ক প্লাস্টিক শিল্পের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় হাজার ৩০০ মিলিয়ন টন ভার্জিন পণ্য তৈরি করছে, যেখান থেকে মাত্র শতাংশ বর্জ্যকে রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় ১২ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বাকি ৭৯ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য কেবল ফেলে দেয়া হয়েছিল, যা বিশ্বকে একটি আবর্জনার স্তূপ হিসেবে পরিণত করেছে

প্লাস্টিক শিল্প বৃদ্ধির পাশাপাশি এর বিরূপ প্রভাব এরই মধ্যে প্রকৃতিতে পড়তে শুরু করেছে মানুষ প্লাস্টিক ব্যবহারের পর কোনো রকম পুনর্ব্যবহার বা পুনর্চক্রায়ণের মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি প্রকৃতিতে ফেলে দিচ্ছে প্রতি বছর যা দূষিত করছে মাটি, পানি বায়ু সেসঙ্গে এটি মাটির স্বাভাবিক চক্রায়ণ প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদান করে ভূগর্ভস্থ পানি চলাচলে বাধা প্রদান করে সর্বত্র শুধু প্লাস্টিক আর প্লাস্টিকরাস্তাঘাট, নদীনালা, ড্রেন এমনকি পাহাড় পর্যন্ত প্লাস্টিকে ছেয়ে গেছে প্রক্রিয়াজাত খাবারের মোড়ক, কোমল পানীয়, বিভিন্ন ফলের জুস, নিত্যপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী, বহনযোগ্য কনটেইনারসহ প্রায় সবকিছুতেই প্লাস্টিকের ছড়াছড়ি এই ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক উৎপাদন চাহিদা মেটানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে কাঁচামাল প্রয়োজন আর অন্যতম কিছু কাঁচামাল হচ্ছে পলিস্টাইরিন, পলিইথিলিনযা থেকে পানীয় বা কসমেটিক বোতল তৈরি হয়; পলিভিনাইল ক্লোরাইডযা থেকে পিভিসি পাইপ তৈরি হয়; পলিথিন পলিপ্রোফিলিনযা থেকে চেয়ার, টেবিল, প্লেট বা অন্যান্য কঠিন প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদন করা হয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে প্রচুর পরিমাণে দূষিত পদার্থ বায়ুতে নির্গত হচ্ছে এবং দূষণের মাত্রাও ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে

প্লাস্টিকের চাহিদা যে হারে বাড়ছে, অদূরভবিষ্যতে এর প্রভাব সরাসরি মানুষের ওপর পড়বে আমাদের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত মাছ-মাংস বা শাকসবজির মাধ্যমে মাইক্রো প্লাস্টিকের কণা শরীরে প্রবেশ করতে থাকবে এবং খাদ্যশৃঙ্খল ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে যাবে মানবশরীরের থাইরয়েড হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণের জন্য প্লাস্টিকদূষণকে বিশেষভাবে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা 

প্লাস্টিকদূষণের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে হলে এর ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন শুধু আমাদের ইচ্ছাশক্তি সেই সঙ্গে প্লাস্টিকপণ্য সহজলভ্য হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ পুনর্ব্যবহার বা টেকসই ব্যবহার নিয়ে সচেতন নয় সেজন্য আমাদের প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে যেখানে-সেখানে প্লাস্টিকের বর্জ্য না ফেলে পুনর্চক্রায়ণ (রিসাইকেল) রিকভার করে চাহিদা পূরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে তবে এই ক্রমাগত চাহিদার জোগান দিতে প্লাস্টিক কারখানার জন্য একটি বিশেষায়িত শিল্প অঞ্চল তৈরি করতে হবে এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি পাশাপাশি রিসাইক্লিং কারখানা তৈরি করতে হবে, যেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্চক্রায়ণের মাধ্যমে নতুন পণ্য তৈরি হবে

মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনা করে যে প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছিল, কালের পরিক্রমায় তা পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে একদিকে যেমন জীবনধারা সহজ করছে, অন্যদিকে টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যবহূত প্লাস্টিক থেকে উৎপাদিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে মানুষের মধ্যে সচেতনতাবোধ বাড়াতে হবে যেন তারা প্লাস্টিক বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলে এরই মধ্যে বেশকিছু দেশ প্লাস্টিকপণ্য ব্যবহারে অনুৎসাহিত করেছে তাই অনমনীয় ক্ষতিকারক প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে জৈব প্লাস্টিকের সহজলভ্য উদ্ভাবনে এগিয়ে আসতে হবে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে ক্রয়ক্ষমতা প্লাস্টিকবিহীন জীবনযাপন সম্ভব না হলেও পরিবেশের ওপর যেন কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে কার্যত পরিবেশের ক্ষতি করার মানে হলো নিজের ক্ষতি করা, যার প্রভাব বয়ে বেড়াতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেড়ে উঠতে হবে এক তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে জাতিসংঘ থেকে সব আন্তর্জাতিক সংস্থা, জোট ব্যক্তি পর্যায়ে সবাইকে একসঙ্গে প্লাস্টিকের উৎপাদন, বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে প্লাস্টিক বর্জ্য যেন মহামারী আকার ধারণ করতে না পারে, সেজন্য এখন থেকেই দূষণ নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গড়ে তুলতে হবে এক বাসযোগ্য নিরাপদ পৃথিবী

 

তৌহিদুর রহমান তুহিন: শিক্ষার্থী

এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন