বুধবার | মে ২৭, ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

চালের অপচয় রোধ

ফসলোত্তর থেকে বিপণন—সব পর্যায়ে উন্নত কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে

একসময় দেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিটি মানুষের অন্ন জোগানো ক্ষুধামুক্তি কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা, কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয়তা এবং সর্বোপরি কৃষকের নিরন্তর পরিশ্রমে কৃষিতে মোট উৎপাদন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে সুনির্দিষ্টভাবে বললে, প্রধানত চালে দেশ অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বৈশ্বিক উৎপাদনেও আমাদের অবস্থান ওপরের সারিতে বর্তমানে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক চিত্র তবে এত সাফল্য সত্ত্বেও চালে আমাদের আমদানি নির্ভরতা কাটেনি এক হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টন চাল আমদানি হয় মূলত আমদানি মূল্যের ওপরই স্থানীয় বাজারে আমাদের প্রধান খাদ্যপণ্যটির দামের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে চালের আমদানি মূল্য কম হলে বাজারে এর দাম কমে, বেশি হলে দাম বাড়ে বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসে ভাতের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার কারণে চালের দাম তাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাবক ভূমিকা রাখে ফলে চালের দাম কম বা স্থিতিশীল রাখা সব সরকারের কাছে একটি বড় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এটি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জও বটে, কেননা পণ্যটি সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার নাগালে রাখতে না পারলে নির্বাচনে ভরাডুবির শঙ্কা থাকে বলতে গেলে নির্বাচনী হিসাবনিকাশে চালের দাম গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর এমন এক বাস্তবতায় বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে বছরে অপচয় বা নষ্ট হয় ২৮ লাখ টন চাল, যা পণ্যটির মোট আমদানির চেয়ে লক্ষণীয় বেশি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালের অপচয় রোধ করা গেলে বিরাজমান খাদ্য ঘাটতি বিপুলাংশে মেটানো সম্ভব হবে এবং চাল আমদানি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা যাবে এতে কৃষি খাতে রাষ্ট্রের ভর্তুকিজনিত অর্থের সাশ্রয় হবে সুতরাং দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থে চালের অপচয় রোধ হওয়া জরুরি

সত্য হলো, চালের অপচয় রোধে আমাদের কিছু বাস্তবিক সমস্যা বিদ্যমান এর মধ্যে বড় সমস্যা হলো আধুনিক, উন্নত উত্তম কৃষিচর্চা প্রবর্তনের ক্ষেত্রে আমাদের পিছিয়ে থাকা ধান থেকে চাল হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পণ্যটিকে ছয়টি ধাপ পেরোতে হয় সেগুলো হলো ধান কাটা, মাঠ থেকে নিয়ে আসা, মাড়াই, শুকানো, গুদামজাত পরিবহন বা বিপণন ছয়টি ধাপের প্রতিটিতেই অপচয় হচ্ছে চালের সাম্প্রতিক সময়ে যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোর দেয়া হলেও এখনো আমাদের কৃষি খাত চলছে প্রথানুগ ধারায় (ম্যানুয়ালি) এর একটি উদাহরণ হলো, বিশ্বের প্রায় সব দেশে ময়েশ্চার মিটার মেশিন দিয়ে আর্দ্রতা পরিমাপ করে ধান কাটার সিদ্ধান্ত নিলেও বাংলাদেশে এখনো দাঁতে কামড় দিয়ে কিংবা দৃশ্যমান অভিজ্ঞতায় ধান কাটার সিদ্ধান্ত নেন কৃষক প্রক্রিয়ায় অপচয় হয় - শতাংশ চাল ধান কাটা, মাড়াই বস্তাবন্দি করার ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে কম্বাইন হার্ভেস্টার ব্যবহার হলেও চাহিদানুপাতে দেশে এর ব্যবহার যৎসামান্য ফলে ধান মাড়াইয়ে কৃষক নির্ভর করেন প্রথাগত পদ্ধতিতে ফলে প্রক্রিয়ায় নষ্ট হয় - শতাংশ চাল এছাড়া হ্যান্ডলিংয়ে, শুকানোর সময়, গুদামজাতে আধুনিক চালকলের বিপরীতে প্রথাগত চালকলে ধান ভাঙাতে নষ্ট হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল চালের অপচয় রোধ করতে হলে আমাদের উৎপাদন থেকে বিপণন প্রতিটি ধাপেই আধুনিক, উন্নত কৃষিযন্ত্র প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে শীর্ষ চাল উৎপাদক দেশের বেশির ভাগই হলো এশিয়ার বাংলাদেশ বাদে তালিকায় রয়েছে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ফিলিপাইন জাপান দেশগুলো কীভাবে ফসল ফসলোত্তর পর্যায় থেকে পরিবহন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে চালের অপচয় কমাচ্ছে, কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, নতুন নতুন উদ্ভাবনে কী ধরনের গবেষণা করছে, সর্বোপরি কী ধরনের কৃষিনীতি গ্রহণ করছে, সেসব অভিজ্ঞতা আমলে নেয়া যেতে পারে মনে রাখা চাই, খাদ্যশস্যের অপচয় খাদ্যনিরাপত্তাকে কিছুটা হুমকিতে ফেলতে পারে এটিকে হেলায় নেয়ার সুযোগ নেই

প্রথানুগ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেও কৃষিতে আমাদের অগ্রগতি ঈর্ষণীয় তবে খাতে পরবর্তী রূপান্তরের জন্য এখানে পড়ে থাকলে চলবে না যুগ বাস্তবতায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি প্রবর্তনে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করতে হবে বাড়াতে হবে কৃষি গবেষণা আশার খবর হলো, সরকার কৃষির যান্ত্রিকীকরণে জোর দিয়েছে কৃষিযন্ত্রে কর ছাড় দিচ্ছে তবে সেগুলো কৃষকের কাছে এখনো খুব একটা পৌঁছেনি তাদের কাছে বিভিন্ন পর্যায়ের কৃষিযন্ত্র পৌঁছাতে সরকারকে আরো আর্থিক নীতিসহায়তা বাড়াতে হবে একই সঙ্গে এসব বিষয়ে সামাজিক সচেতনতাও বাড়িয়ে তুলতে হবে সবার সম্মিলিত প্রয়াসে কৃষি খাতের রূপান্তর ঘটুক, এটিই প্রত্যাশা

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন