শনিবার | জুলাই ১১, ২০২০ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

দেশের খবর

গভীর রাতে রণক্ষেত্র, ছাত্রাবাসে ব্যাপক ভাঙচুর

চবিতে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক

বণিক বার্তা প্রতিনিধি, চবি

পূর্ব শত্রুতার জেরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) গভীর রাতে ছাত্রলীগের দু'পক্ষের সংঘর্ষে ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীসহ অন্তত অর্ধশতাধিক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। রাতে অভিযান চালিয়ে আট জনকে আটক করেছে পুলিশ।

বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে সংঘাত শুরু হয়। এর আগেও গত দুদিনে কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়িয়েছিল ছাত্রলীগের দুটি পক্ষ। সংঘাতের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এএফ রহমান হলের ১৫৯টি কক্ষের মধ্যে ৮৭টি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। 

বিবাদমান পক্ষগুলো শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াসের নেতৃত্বাধীন উপগ্রুপ বিজয় এবং নগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপুর নেতৃত্বাধীন পাঁচটি উপগ্রুপ। শুরুতে সংঘাতটি ছিল বিজয় উপগ্রুপের সঙ্গে কনকর্ডের অনুসারীদের মধ্যকার। পরে কনকর্ডের সঙ্গে মেয়র নাছিরের অনুসারী অন্যান্য উপগ্রুপের নেতাকর্মীরাও যোগ দেন। কনকর্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আবদুল মালেক।

আহতদের মধ্যে দর্শন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মিনহাজ, সংস্কৃত বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের মো. মুজাহিদুল, সমাজতত্ত্ব বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের আকতার হোসেন বিজয়, শিক্ষা ও গবেষণা ইনিস্টিটিউটের একই শিক্ষাবর্ষের সাখাওয়াত চৌধুরী, অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শহিদুল ইসলাম, একই বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের জামিল হাসান, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ফরহাদ, একই বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের এজাজ আহমেদ নিশান, লোক প্রশাসন বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের মেহেদী হাসান, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের সাহেল মিয়া, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ফাহিম হোসেনের নাম জানা গেছে। আহতদের মধ্যে অন্তত ৩৭ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন। আরো ১৫ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শুভাশিষ চৌধুরী শুভ জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে অনেকে হাতে-পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। অনেকের হাত, পা, কোমড় ভেঙে গেছে। সবাইকে চমেক হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হয়নি। তবে তাদের এখানেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যারা খুব সংকটাপন্ন, তাদের চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

আটককৃতরা হলেন- সিক্সটি নাইন উপগ্রুপের কর্মী রসায়ন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের গোলাম শাহরিয়ার, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের জোবায়ের আহমেদ নাদিম, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের মাশরুর অনিক, পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের আকিব জাবেদ, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের রুম্মান ও হায়দার, বিজয় উপগ্রুপের কর্মী ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের জিন্নাত মজুমদার ও কনকর্ড গ্রুপের জিসান। হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, 'আটককৃত সন্দেহভাজনদের মধ্যে আটজনকে রেখে বাকীদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত সোমবার আলাওল হলের একটি কক্ষ নিয়ে উপগ্রুপ বিজয় ও কনকর্ডের অনুসারীদের মধ্যে ঝামেলা হয়। মঙ্গলবার রাতে বিজয়ের এক কর্মীকে মারধর করেন কনকর্ডের নেতাকর্মীরা। এর রেশ ধরে বুধবার বিকালে আবারো সংঘাতে জড়ায় পক্ষ দুটি। তখন কনকর্ড উপগ্রুপের সঙ্গে মেয়র নাছিরের অনুসারী উপগ্রুপ সিক্সটি নাইন, ভার্সিটি এক্সপ্রেস (ভিএক্স), একাকার, রেড সিগন্যালও (আরএস) যোগ দেয়। রাত ১টার দিকে শাহজালাল হলে থাকা মেয়র নাছিরের অনুসারী সবগুলো উপগ্রুপ এক হয়ে সোহরাওয়ার্দী হলে থাকা শিক্ষা উপমন্ত্রী নওফেলের অনুসারী উপগ্রুপ বিজয়ের নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ চালায়। এ খবরে এএফ রহমান ও আলাওল হলে থাকা বিজয় উপগ্রুপের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বের হয়ে সোহরাওয়ার্দী হলের দিকে যায়। তখন মেয়র নাছিরের অনুসারীরা বিজয়ের অনুসারীদের ধাওয়া দিয়ে এএফ রহমান হলে চলে আসেন এবং ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।

বিদ্যুৎ বন্ধ করে আবাসিক হলে হামলা, ৮৭টি কক্ষ ভাঙচুর: রাত সোয়া ১টার দিকে মেয়র নাছিরের অনুসারী প্রায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী বিজয়ের নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেয়। এসময় এএফ রহমান হলের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করার পাশাপাশি লাউটগুলো ভেঙে হামলা চালানো হয়। আবাসিক হলটির ১৫৯টি কক্ষের মধ্যে ৮৭টি কক্ষ, টয়েলেটগুলোও ভাঙচুরের কবলে পড়ে। এসময় কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আবাসিক হলে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এসময় প্রতিবন্ধীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কক্ষগুলোতেও ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। কক্ষগুলো থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল, নগদ টাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিশপত্র লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। হলের নিচে থাকা চারটি মোটক বাইক ভাঙচুর করা হয়।

ভাঙচুর শুরুর প্রায় আধঘন্টা পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এসময় আবাসিক হলের বিভিন্ন কক্ষ থেকে ৫৯ জনকে আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্য থেকে আট জন বাদে বাকীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পরে হলটি পুরোপুরি দখলে নেয় বিজয় উপগ্রুপের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

আবাসিক হলটির ৪০৮ কক্ষে থাকেন সমাজতত্ত্ব বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে অধ্যয়নরত প্রতিবন্ধী শিহাব বিশ্বাস। তিনি বলেন, 'আমি বারবার প্রতিবন্ধী পরিচয় দিলেও তারা আমাকে ছাড়েনি। আমার কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।'

আবাসিক হলটির প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. কাজী এসএম খসরুল আলম কুদ্দুসী বলেন, 'এভাবে রাতে আধারে আবাসিক হলে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা মর্মান্তিক। এখানে সাধারণ শিক্ষার্থী এমনকি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদেরও রেহাই দেয়া হয়নি। হলের ৮৭টি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। লুটপাটের অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা। কার কি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে- তা লিখিত আকারে দিতে বলেছি শিক্ষার্থীদের। এরপর বিস্তারিত বলতে পারবো।'

এদিকে হামলা-সংঘাতের ঘটনায় ছাত্রলীগের উপগ্রুপগুলো একে-অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করেছেন। বিজয় উপগ্রুপের নেতা শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, 'রাতের আধারে ককটেল ফুটিয়ে, গুলি বর্ষণ করে ঘুমন্ত ছাত্রলীগ কর্মীদের ওপর সাধারণ সম্পাদক টিপুর নেতৃত্বে শিবিরীয় কায়দায় ন্যাক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এছাড়া আমরা বারবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলে আসছি, কিন্তু প্রশাসন বিচার করছে না।'

শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, 'ইলিয়াসতো হিজবুত তাহরীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার নেতৃত্বে এক সহকারী প্রক্টরের সহায়তায় অন্তত ১৫-২০ বার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। রাতেও প্রশাসনকে বারবার বলেছি, যারা হলে যেতে পারছে তাদের হলে তুলে দিতে। কিন্তু প্রশাসন কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। আর ছাত্রলীগের সিনিয়র কর্মী ফাহিমের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।'

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এসএম মনিরুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, 'ছাত্রদের দুটি পক্ষের মধ্যে চলমান সংঘাতটির কোন আদর্শিক দিক নেই, এটি স্বার্থের কারণে হচ্ছে। গত রাতে দুপক্ষকে বুঝিয়ে হলে পাঠিয়ে দিয়ে পুলিশ এবং আমরা রাত ১১টার পর বাসায় আসি। এরপর সংঘর্ষের খবর শুনে আমরা পুলিশসহ প্রস্তুতি নিয়ে আসতে একটু সময় লেগেছে। আমরা তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপও নেব।'

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন