শুক্রবার | জুন ০৫, ২০২০ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সাক্ষাৎকার

আগামীতে বীমা খাতকে সবচেয়ে শক্তিশালী খাত হিসেবে দেখতে চাই

শেখ কবির হোসেন

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট। সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান। তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মেম্বার অব গভর্নরস বাংলাদেশ প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সদস্য। কর্মরত ছিলেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান পদে। জাতীয় বীমা দিবস উপলক্ষে বিআইএর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. বেল্লাল

> জাতীয় বীমা দিবস চালু করা বিআইএর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। দাবি পূরণ হয়েছে। বিষয়টি বীমা খাতে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

জাতীয় বীমা দিবস পালন বীমা খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই আমি মনে করি। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন থেকে দীর্ঘদিন ধরে আমরা বঙ্গবন্ধুর বীমা পেশায় যোগদানের দিনটিকে বীমা দিবস করার দাবি করে আসছিলাম। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে অনুমোদন নিয়ে সরকার বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে তা পাঠাই। আমাদের সরকার যথেষ্ট ইতিবাচক। দিবসটি আমাদের মনের দাবি ছিল। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে জাতীয় বীমা দিবস পালন হচ্ছে। তাছাড়া এটি পালিত হচ্ছে মুজিব বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে, যা আমাদের বড় ধরনের গর্ব অর্জন।

বর্তমানে বীমা খাতের চ্যালেঞ্জগুলো কী?

মানুষের আস্থা আনাএটাই হলো বড় চ্যালেঞ্জ। আইডিআরএ সবসময় বলে, আইন-কানুন মেনে যথাযথ তাত্ক্ষণিকভাবে মানুষের বীমা দাবিটা পূরণ করতে হবে।

খাতটিকে সুব্যবস্থাপনায় আনার জন্য কী করা উচিত?

আইডিআরএ যেমন বীমা কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা তাদের কার্যগতি স্বয়ংক্রিয় করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, আমার মনে হয় সার্ভেয়ারদেও এক ধরনের নিয়ম-নীতি বা ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। বিষয়ে আইডিআরের কাছে আমরা অনুরোধ করতে পারি, যাতে সার্ভেয়াররা কোনো ধরনের অপকর্ম করতে না পারে। বীমা দাবি পরিশোধের ব্যাপারে কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি সার্ভেয়ারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সার্ভেয়াররা অনেক সময় বিষয়গুলো অন্য রকম করার চেষ্টা করে। তারা এমনটা যাতে করতে না পারে, সেজন্য সরকার আইডিআরএর পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়া হলে তা ফলপ্রসূ হবে।

৭০-৭২টি বীমা কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ১০-১২টি ভালো করছে। বাকি কোম্পানিগুলোর জন্য বীমা খাতের বদনাম হচ্ছে। অবস্থায় কী করণীয়?

আইডিআরএ কিন্তু কাজ করছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন থেকে আমরা তাদের সহযোগিতা করছি। যেভাবে খাতসংশ্লিষ্ট সবাই অগ্রসর হচ্ছে, বিষয়গুলো যদি এভাবে চলতে থাকে, অচিরেই সমস্যার সমাধান হবে।

সরকারি প্রকল্পের বীমা করা হয় সাধারণ বীমা করপোরেশন থেকে। এটি বেসরকারি খাতে যাওয়ার বিষয়কে আপনি কীভাবে দেখেন?

আমার মনে হয় এটি ঠিকই আছে। সরকারি বীমাগুলো থেকে যে কমিশন আসে, তা কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমান ভাগে ভাগ করে দেয়া হয়। মূল অসুবিধাটা হলো সরকারের যত বীমা, বিশেষ করে মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে, দেখা যায় তা বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বা অন্যান্য দাতাগোষ্ঠী যখন সরকারকে কোনো প্রকল্পের জন্য অনুদান দেয়, তখন দেখা যায় তাদের শর্তগুলোর মধ্যেই দেশের বাইরে বীমা করার কথাটি উল্লেখ রয়েছে। কিংবা যে দেশ অর্থ সহযোগিতা করছে, সেখানে বীমা করার বাধ্যবাধকতা থাকে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময় আপত্তি করছি যে সব বীমা বাংলাদেশেই হতে হবে। নইলে বীমার অর্থটা বাইরে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া সরকারও ট্যাক্স ভ্যাট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশে কিছু কোম্পানি আছে, যারা বাইরের দেশে বীমা করে। এটি বন্ধের জন্য আমরা সবসময় অনুরোধ করে আসছি। প্রয়োজনে রিইন্স্যুরেন্স ইন্স্যুরেন্সকে দুই ভাগে ভাগ করতে হবে। একটা সরকারের, অন্যটা বীমা কোম্পানির। একইভাবে বেসরকারি খাতে যদি কোনো কোম্পানি বা গোষ্ঠী এগিয়ে আসে, তবে সেক্ষেত্রেও এটা করা উচিত। তাহলে রিইন্স্যুরেন্সের বিষয়টি আরো উন্নত হবে। বর্তমানে বাইরের দেশ থেকে রিইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো এসে আমাদের দেশ থেকে অর্থ নিয়ে যাচ্ছে। যখন আমাদের দেশে রিইন্স্যুরেন্স শক্তিশালী হবে, তখন কিন্তু অন্য দেশের রিইন্স্যুরেন্সগুলো আমরা করতে পারব। আমাদের আয় হবে।

বীমার প্রিমিয়াম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও খরচ বেশি বলে অভিযোগ আছে। এখানে কি কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় বলে মনে করেন?

আমাদের সেন্ট্রাল রেটিং কমিটি (সিআরসি) আছে, যারা প্রিমিয়ামের সঠিক হারটা নির্ধারণ করে দেয়। বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তারা ঠিক প্রিমিয়ামটাই নির্ধারণ করে।

বীমা খাতে দক্ষ জনশক্তির অভাব বিদ্যমান। বিষয়টিকে কীভাবে চিহ্নিত করবেন?

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা সবসময় দাবি করে আসছি, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমিকে আইডিআরএ কিংবা বিআইএর কাছে দিয়ে দেয়া হোক। বিশেষ করে আইডিআরএর কাছে এর কার্যক্রম আরো ভালোভাবে চলবে বলে আমার ধারণা। একইভাবে এটিকে শক্তিশালী করার জন্য, এর নীতিমালাগুলোকে আবার পরিবর্তন পরিবর্ধন করে আইডিআরএর অধীনে দিয়ে দিলে বীমা খাতের দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে। অ্যাকচুয়ারি সংকটের কারণে অনেক সময় নতুন পণ্য উদ্ভাবন করতে সময়ক্ষেপণ হয়। কেননা দক্ষ জনবল না থাকলে কোনো শিল্পের উন্নতি হয় না। যেকোনো শিল্প কিংবা ব্যাংকের ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের প্রয়েজন।

বীমা খাত কর্মী ধরে রাখতে পারছে না। কর্মীর পদ বিন্যাস নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

আমরা মনে করি, আইডিআরএ থেকে সব বীমা কোম্পানির জন্য পদ বিন্যাসের ধাপগুলো নির্ধারণ করে দিতে হবে। সব কোম্পানিতে ধাপগুলো একই থাকবে। কোথাও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তো কোথাও সিনিয়র ম্যানেজার, ধরনের নয়। আমরা আইডিআরএর কাছে অনুরোধও করেছি। আমরা মনে করি, আইডিআরএ আমাদের সঙ্গে আলাপ করে অচিরেই বিষয়গুলো ঠিক করে দেবে।

আগামীতে স্বল্পোন্নত থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় প্রবেশ করবে। তখন বীমা খাতকে কী অবস্থায় দেখতে চান?

বীমা খাতকে সবচেয়ে শক্তিশালী খাত হিসেবে দেখতে চাই। আমি প্রত্যাশা করি, জিডিপিতে বীমা খাতের অংশগ্রহণটা সবচেয়ে বেশি থাকবে। কেননা যে দেশের বীমা খাত যত শক্তিশালী, সে দেশের অর্থনীতিও তত শক্তিশালী। যখন সবকিছু বীমার আওতায় আসবে এবং সব নাগরিক বীমা করবে, তখন জনগণ এক ধরনের নিরাপত্তা অনুভব করবে, জনসম্পদও সুরক্ষিত থাকবে। কেননা ইন্স্যুরেন্স সেক্টর জনগণের জন্য। অন্যান্য শিল্প বীমা শিল্প কিন্তু ভিন্নতর। বীমা খাত সব খাতের শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তা সবার সুরক্ষা দিচ্ছে। অতএব, ভবিষ্যতে বীমা খাতের বড় ধরনের অংশগ্রহণ থাকবে এবং খাতটি দেশ, জাতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণিত হবে বলেই আমি মনে করি।

বীমায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?

দরিদ্রদের অংশগ্রহণের জন্য জীবন বীমা, স্বাস্থ্য বীমা, শিক্ষা বীমা কৃষি বীমার উন্নতি ঘটানো দরকার। এটি কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে করা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে এগুলোকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে হবে। যেখানে সরকার, কোম্পানি, বিদেশী দাতা সংস্থার অংশগ্রহণ নিয়েই এর উন্নয়ন করতে হবে। এভাবে বীমা খাতের ওপর জনগণের আস্থা আসবে।

ভারতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হয়ে যেমন সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ দেয়া হচ্ছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এমনটি করা উচিত কিনা?

বিআইএর পক্ষ থেকে আমরা কিন্তু এরই মধ্যে আরডিআরএর কাছেবঙ্গবন্ধু সামাজিক সুরক্ষা বীমাকরার প্রস্তাব দিয়েছি, যেখানে সাধারণ মানুষের সুরক্ষার বিষয়টিকে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি।

 

শ্রুতলিখন: রুহিনা আকতার

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন