সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

সাক্ষাৎকার

দক্ষতাসম্পন্ন লোকবলের ঘাটতি রয়েছে

সৈয়দ শাহরিয়ার আহসান

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাধারণ বীমা করপোরেশন। সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ বীমা সমিতি বাংলাদেশ বীমা একাডেমিতে। দায় গ্রহণ, পুনর্বীমা, হিসাব, বিপণন, দাবিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জটিল বিষয়ে তার রয়েছে দীর্ঘকালীন বাস্তব অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি বীমা দিবস উপলক্ষে খাতের সংকট, সম্ভাবনা ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুসা মিয়া

প্রথমবারের মতো উদযাপন হওয়া বীমা দিবসকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আমি এটিকে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন বলব। কারণ বীমা এমন একটি খাত, যা ছাড়া অর্থনীতি অচল। কিন্তু আমাদের দেশে বীমা যে অবদান রাখছে, তা খুব একটা স্বীকৃত নয়। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহ করে বীমা কোম্পানিগুলো বৃহত্তর খাতগুলোয় বিনিয়োগ করছে। ফান্ড মবিলাইজারের কাজ করছে। সেক্ষেত্রে বীমার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই গুরুত্বটা সাধারণ জনগণের মাঝে তেমন পৌঁছেনি। বাইরে কোনো নাগরিক স্বাস্থ্য বা বাড়ি বীমা ছাড়া নিজের জীবন চিন্তাই করতে পারে না। এসব বীমা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে আমাদের এখানে এখনো তা হয়নি। এখন বীমা দিবসটি স্বীকৃতি পেয়েছে। শিল্পে আমরা যারা রয়েছি, তাদের কর্মকাণ্ডের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। এখন বীমা শিল্পের স্বীকৃতি আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বীমা দিবস ঘোষণা করেছেন এবং নিজেই এর উদযাপন উদ্বোধন করতে আসছেন। সুতরাং এটি জনগণের কাছে বীমা শিল্পের গুরুত্ব অনেকখানিই বাড়িয়ে দেবে। অনেক দিবসই আছে, কিন্তু বিশ্বের কোথাও বীমা দিবস বলে কোনো দিন আছে বলে জানা নেই। সেদিক থেকেও আমরা বোধহয় প্রথম।

পুরনো শিল্প হলেও বীমা খাত তেমন এগোতে পারেনি কেন? এক্ষেত্রে বাধাগুলো কী?

বীমা শিল্পে যেভাবে কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে, সেভাবে আমাদের কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন (টেকনিক্যাল) লোকবল বাড়েনি। সুতরাং এক্ষেত্রে টেকনিক্যাল লোকজনের প্রচণ্ড দরকার রয়েছে। ধরনের জনশক্তির ঘাটতি থাকলে সচেতনতা বৃদ্ধি কিন্তু সহজেই হবে না। একজন টেকনিক্যাল লোক বীমা বিষয়টি যেভাবে ব্যাখা করতে পারবেন, বুঝিয়ে বলতে পারবেন; অন্য কেউ পারবে না। এছাড়া আমরা ট্র্যাডিশনাল কিছু বীমা পলিসি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছি। বিশ্বে নতুন নতুন অনেক পলিসি এসেছে। কিন্তু আমরা সেদিকে যেতে পারিনি। স্বাস্থ্য, অগ্নিবীমাসহ কিছু বীমা বাধ্যতামূলক করা উচিত। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের দেশে বীমা যেহেতু বাধ্যতামূলক নয়, সেহেতু অনেকেই বীমা কাভারেজ নিতে উৎসাহী নয়। একটা হলো জনগণের সচেতনতা, আরেকটি হলো তাদের আর্থিক সামর্থ্য। দেশ যেভাবে এগিয়ে চলছে, তাতে মানুষের আর্থিক সামর্থ্য অনেক বেড়েছে। চাইলে মানুষ বীমার আওতায় আসতে পারবে। এখন বীমা দিবসকে কেন্দ্র করে সরকার যদি উদ্যোগ নেয় প্রতিটি লোকের একটি ব্যক্তিগত পলিসি রাখতে হবে, স্বাস্থ্য বীমা পলিসি রাখতে হবে, তাহলে সরকারের অনেক দায়ভার কমে যাবে। লোকজনও অনেক উপকৃত হবে।

ভারত সরকার বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জনগণকে বীমার আওতায় আনছে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রিমিয়াম দিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশেরও ওই রকম প্রক্রিয়ায় যাওয়া উচিত কিনা?

আমার তো মনে হয় এটি খুবই দরকার। সচেতনতা সৃষ্টির জন্যই এটি প্রয়োজন। যেমন শস্যবীমা। বীমায় দেশটিতে সরকারের তরফ থেকে প্রিমিয়াম দেয়া হয়। তাদের অনুকরণে আমরা সম্পর্কিত একটি পাইলট প্রকল্প নিয়েছি। এতে কৃষকরা উপকৃত হবেন। আমাদের দেশে প্রায়ই কিন্তু খরা, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যায় কৃষকের ফসলহানি ঘটে। শস্যবীমা কৃষকের ক্ষতি পোষানো দারিদ্র্য বিমোচনে সাহায্য করবে।

আমাদের দেশে বীমাপণ্যে বৈচিত্র্য নেই কেন?

আগেই বলেছি, বীমা শিল্পের অগ্রগতিটা সেভাবে হয়নি। আমাদের টেকনিক্যাল জ্ঞান খুব কম ছিল। এখন সাধারণ বীমা করপোরেশন কিন্তু বেশ কয়েক বছরের মধ্যেই বেশকিছু নতুন বীমা নিয়ে এসেছে। আমরা এখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল অল রিস্ক ইন্স্যুরেন্স চালু করেছি। এতে সব ধরনের একটা প্যাকেজ কাভারেজ দেয়া হচ্ছে, যা আগে ছিল না। আবার ইরেকশন অল রিস্ক ইন্স্যুরেন্স প্রবর্তন করেছি। কোনো কারখানা স্থাপনে প্রয়োজনীয় মেশিনারি, উপকরণ আমদানি থেকে শুরু করে কনস্ট্রাকশন শেষ হয়ে মেইনটেন্যান্স পর্যন্ত সম্পূর্ণ কাভারেজ আমরা দিচ্ছি। এগুলো কিন্তু নতুন ধরনের বীমা। আমরা অপারেশনাল প্লান্ট ইন্স্যুরেন্স চালু করেছি পাওয়ার প্লান্টগুলোর জন্য। আগে হয়তো ফায়ার নিয়ে বসে থাকত। সেটি দিয়ে সবকিছু কাভার করত না। এখন যাবতীয় সব বিষয়ই কাভারেজ করে যায়। অনেক পলিসিকে আমরা একটা কাভারেজে নিয়ে এসেছি।

চলমান মেগা প্রকল্পগুলোকেও দেশের ভেতরে বীমার আওতায় আনা হচ্ছে। আমরা এগুলোর পুনর্বীমা করছি বিশ্বের টপ রেটেড কোম্পানিগুলোর সঙ্গে। আমাদের সেই এক্সপার্টাইজ আছে এবং আমাদের সেই যোগাযোগ আছে। এমনটি হলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। অর্থনীতির গতিময়তার স্বার্থেই বীমার উন্নয়ন জরুরি। বর্তমানে জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান শতাংশেরও কম। আমাদের লক্ষ্য হলো এর অবদান অন্তত শতাংশে নিয়ে যাওয়া।

মুজিব বর্ষের ভেতরেই আমরা কিডনি ক্যান্সার রোগীদের জন্য একটি বীমা পলিসি করার চেষ্টা করছি। এর জন্য আমরা সব রকম অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছি। রি-ইন্স্যুরারও ঠিক হয়েছে। এতেও আমরা ন্যূনতম প্রিমিয়াম ধার্য করছি। এখানে সরকারের সহযোগিতা চাইছি। এক্ষেত্রে একটাই শর্ত, গ্রাহক ন্যূনতম চার কোটি হতে হবে। এমনটি হলে প্রিমিয়ামের পরিমাণ অনেক বাড়বে। এটি আমরা করতে চাইছি। আশা করি, আমরা করতে পারব। আমরা টার্গেট করেছি মোবাইল কোম্পানিগুলোর সাবস্ক্রাইবারদের। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে, বিষয়টি যেন বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়। মোবাইল সাবস্ক্রাইবাররা মাসে ২৫ টাকা করে দেবে। এটা অপারেটররা কালেক্ট করবে।

অভিযোগ আছে, খাতে দক্ষ জনশক্তির অভাব আছে। অ্যাকচুয়ারিস্ট নেই। সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়?

বীমার যত প্রসার বাড়বে, আমাদের দেশে বীমার রিকগনিশন যত বাড়বে, তখন কিন্তু ভালো ভালো ছেলেমেয়েরা এগিয়ে আসবে মাঠে। বাইরের দেশে কিন্তু বীমা এজেন্টের অনেক গুরুত্ব আছে। এখন বিশ্বে যেসব নতুন নতুন বীমা আসছে, আমরা কিন্তু এখানে নিয়ে আসতে পারছি। আমাদের সাধারণ বীমার সে দক্ষতা আছে। সাধারণ বীমা যদি গতিতে এগিয়ে যায়, তাহলে পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে আমাদের অবস্থা অনেক পরিবর্তন হয়ে যাবে।

বীমা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহারকে কীভাবে দেখেন?

খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই দরকার। বর্তমান সময়ে অটোমেশন ছাড়া চলা মুশকিল। প্রপার রেকর্ডিং, কুইক সার্ভিসিংএসবের জন্য প্রযুক্তি প্রয়োজন। অটোমেশন হলে আপনার দাবি কতটা এগিয়েছে, সেটি রেগুলেটরও দেখে নিতে পারছে, আপনিও দেখতে পাচ্ছেন। সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্প নেয়ার কথা। তবে প্রকল্পটি খুবই ধীরে এগোচ্ছে। মূলত সাধারণ বীমা করপোরেশন, জীবন বীমা করপোরেশন, ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমিকে শক্তিশালী করার জন্য। এটি বাস্তবায়ন হলে বীমা খাতে অনেক পরিবর্তন আসবে।

২০৪১ সালে সাধারণ বীমা এবং খাতকে কোথায় দেখতে চান?

গত কয়েক বছরে সাধারণ বীমার বেশ অগ্রগতি হয়েছে। এটি বীমা অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০৪১ সালের দিকে আমার মনে হয় সাধারণ বীমা পুরোপুরি অটোমেটেড হয়ে যাবে। অর্গানোগ্রাম নতুন করে সাজানো হয়েছে। ভারতের জেনারেল ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন অব ইন্ডিয়া আজকে বৈশ্বিক পর্যায়ে চলে গেছে। তারা পুনঃবীমা গ্রহণ করছে। আমাদের সাধারণ বীমাও সেই পর্যায়ে চলে যাবে।

এদিকে সার্বিক বীমা খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটবে। বর্তমানে খাতে দাবি নিষ্পত্তির সামর্থ্য অনেক বেড়ে গেছে। প্রচুর দাবি নিষ্পত্তি হচ্ছে। তাতে জনগণের ভেতরে বীমা সম্পর্কে যে একটা বিরূপ ধারণা ছিল, সেটি দূর হচ্ছে। সেদিক থেকে এটি ভবিষ্যতে খুবই সম্ভাবনাময় শিল্প হবে।

 

শ্রুতলিখন: অরুণীমা

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন