রবিবার| মার্চ ২৯, ২০২০| ১৪চৈত্র১৪২৬

সম্পাদকীয়

পরিবেশ

জলবায়ু কার্যক্রমের জটিল সমীকরণ

মাইকেল স্পেন্স

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো ঘিরে সর্বোচ্চ গুরুত্ব  দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ অংশগ্রহণকারীরা, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবেশবাদী গ্রেটা থানবার্গের নাম, তিনি পরিবেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর এক শক্তিশালী বক্তব্য দেন। আমাদের মনে রাখা জরুরি গ্রেটারা কিন্তু মোটেই সংখ্যালঘু নয়। তাছাড়া প্রথমবারের মতো বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ঝুঁকি জরিপে -সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে শীর্ষ পাঁচটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত নতুন বোধগুলোকে আমরা এমন একটা সময় উপলব্ধি করছি যখন করপোরেট সম্প্রদায়গুলো ব্যাপকভাবে বহু অংশীদারিত্ব মডেলের দিকে সম্প্রসারণের নিশ্চয়তা দিয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ধরনের রূপান্তর ব্যাপকভাবে জলবায়ুবিষয়ক সচেতনতার জায়গা তৈরি করবে। যদিও বৈশ্বিক টেকসই অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো যথেষ্ট ভয়াবহ। 

প্রতি বছর বিশ্ব থেকে ৩৬ বিলিয়ন টন কিংবা ৩৬ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়। পরিমাণটি পরিবেশ বিজ্ঞানীদের হিসাবকৃত নিরাপত্তা স্তরের তুলনায় প্রায় দশমিক গুণ বেশি। গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পস্তরের ওপরে দশমিক ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো প্রশমন করা প্রয়োজন। তাই আগামী দুই দশক ধরে বার্ষিক ১৪ গিগাটন কার্বন নির্গমন হ্রাস করতে হবে। বর্তমানে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরিত হয়, উল্লিখিত সংখ্যাটি তার তুলনায় অনেক অনেক কম, বিশেষ করে আমরা যদি উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণের সঙ্গে এটিকে তুলনা করি।

তবে অবস্থার উন্নতি লক্ষণীয়। ২০০০-এর দশকের আগে থেকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা যুক্তরাষ্ট্র তাদের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করতে সমর্থ হয়েছে। তবে তাদের সংখ্যাপ্রতি কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বেশি। আমেরিকায় যা বর্তমানে ১৫ থেকে ১৬ টন। ইউরোপে এক দশক আগে এর পরিমাণ ছিল ১০ টন, যদিও বর্তমানে তারা ভালো করেছে। অনেক দেশ তাদের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ মাথাপিছু পাঁচ টনে কমিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে, যা বড় ধরনের অর্জন; কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা এখনো দ্বিগুণেরও বেশি।

উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো যদিও কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমিয়ে এনেছে, তবে বৈশ্বিক মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কিন্তু বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১৫ বছরে নিঃসরিত কার্বনের পরিমাণ মোট থেকে গিগাটন, যা জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। উদীয়মান উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো বিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বাড়ছে। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুসারে, আসছে বছরগুলোয় বৈশ্বিক অর্থনীতি যদি শতাংশ বা এর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়, সেক্ষেত্রে আগামী ২০ বছরে সংখ্যাপ্রতি কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ দশমিক টনে নেয়ার জন্য বার্ষিক নিঃসরণের পরিমাণ দশমিক শতাংশে হ্রাস করতে হবে। শূন্য বৃদ্ধিসহ, বার্ষিক দশমিক শতাংশ হারে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমাতে হবে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। কারণ কার্বন নিঃসরণের প্রক্রিয়াটিকে পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। আমরা একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছি। অবস্থায় মধ্যম মাত্রায় বা বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে লক্ষ্যটির দিকে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে আমরা উপকৃত হব, এমনকি আমরা যদি লক্ষ্যে পৌঁছতে বা তা পুরোপুরি অর্জন করতে না- পারি।

বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের কারণ দুটিশক্তির তীব্রতা (জিডিপির এককপ্রতি প্রাথমিক শক্তি ব্যয়ের পরিমাণ) এবং মিশ্রিত শক্তিগুলোর মধ্যে কার্বনের ঘনত্ব (ব্যবহূত শক্তির মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ) এর মানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তির তীব্রতা প্রশমন দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: শক্তির কার্যকারিতার উন্নতি এবং পরিশোধিত শক্তির (জ্বালানি) ব্যবহার বৃদ্ধি। এতে উভয় ক্ষেত্রেই আমরা উপকৃত হব, আর তা বিশ্বাস করার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে।

প্রথমত, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যয় অনেকটা নাটকীয়ভাবেই হ্রাস পেয়েছে। এক দশক আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে নোংরা উৎস কয়লার দামও খুব কম ছিল। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের খরচ বর্তমানে দামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণমূল্যবিচারে সস্তাতাছাড়া পরিবেশ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাবের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। উপরন্তু, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে ব্যাপক হারে নতুন শক্তি অবকাঠামোর চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য শক্তি কতটা ব্যয়সাশ্রয়ী কিংবা পরিবেশের জন্য মঙ্গলকরএক্ষেত্রে তা নতুন করে যাচাইয়েরও প্রয়োজন নেই।

উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে যেখানে দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে, তাদের অবশ্যই ধরনের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ জরুরি। একই সঙ্গে উচ্চদক্ষতার মান ধরে রাখতে আধুনিক প্রযুক্তি এর অনুশীলনের পাশাপাশি যথাযথ প্রণোদনা এবং অর্থায়নে জোর দিতে হবে। বেসরকারি মূলধনকে আকর্ষণ করে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা কার্যক্রম চালু করতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। 

একইভাবে যোগাযোগ খাতেও বড় ধরনের সাফল্য আনা সম্ভব। বৈশ্বিক জ্বালানির সঙ্গে সম্পর্কিত মোট কার্বন নিঃসরণের মধ্য থেকে প্রায় ১৫ শতাংশের জন্য দায়ী খাতটি। যুক্তরাষ্ট্রে পরিমাণটি ২৯ শতাংশ। দেশটির বিদু্যুৎ খাতের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণের থেকে কিছুটা বেশি। বৈদ্যুতিক যানবাহনের অগ্রগতি সাধন সঠিক নকশার মাধ্যমে শক্তিসাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা গ্রহণের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে খাতের সামগ্রিক কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানো যেতে পারে।

বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ যুক্তি তুলে ধরেন অর্থনৈতিক কাঠামোতে কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত সব প্রান্তিক ব্যয়ের হিসাব নিয়ে আসা হলে তা অগ্রগতির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। কেননা এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, কৌশল উৎপাদন সমতা রক্ষা সম্ভব হবে। এর সঙ্গে কার্বনের ওপর মূল্য বসানোর বিষয়টিও জড়িত, তাই হয় করারোপ করতে হবে অথবা ট্রেডেবল কার্বন ক্রেডিট বা লেনদেনযোগ্য আর্থিক সুবিধা (উন্নত দেশ কর্তৃক নির্গত গ্যাসের ভর কত হতে পারে, তার ওপর ভিত্তি করে এবং ওই পরিমাণ গ্যাস নির্গমনের ফলে উন্নয়নশীল দেশের কী পরিমাণ পরিবেশগত, সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে কার্বনের মূল্য নির্ধারণ করা এবং তা  উন্নত দেশের পক্ষ থেকে উন্নয়নশীল দেশকে প্রদান করা) ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা।

তবে এটি বাস্তবায়নের গুরুতর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রয়াত পরিবেশবাদী অর্থনীতিবিদ মার্টিন ওয়েটজম্যান যেমনটা দেখিয়েছিলেন, যেহেতু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রান্তিক ব্যয়ের পরিবর্তে কতটা পূরণ করা দরকার, সে সম্পর্কে আমরা অনেক বেশি জানি, তাই আমাদের উচিত প্রথম উল্লিখিত বিষয়টির (লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রান্তিক ব্যয়) দিকে মনোযোগী হওয়া। 

উল্লিখিত যুক্তি অনুসারে, আমাদের বাজি ধরার সেরা বিষয় হতে পারে বিশ্বব্যাপী কার্বন লেনদেন ব্যবস্থাটি। কেননা এখানে কার্বন ক্রেডিট (আর্থিক সুবিধা) প্রদানের বিষয় রাতারাতি হ্রাস পাচ্ছে। তাই যতক্ষণ না পর্যন্ত সর্বসম্মতিক্রমে বা সবাই একমত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলো পূরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত একে ঘিরে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি। এটি কার্বনের একটি অভিন্ন বৈশ্বিক মূল্য নির্ধারণ করবে, যা লক্ষ্যগুলোকে দৃঢ়ভাবে স্থাপনের পাশাপাশি বিশ্বকে কার্বন প্রশমনের কার্যকর সাশ্রয়ী ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।

তবে ধরনের একটি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য দেশগুলোয় অর্থ কিংবা লাইসেন্স বরাদ্দের প্রয়োজন পড়বে; মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়াটা সম্ভবত সবচেয়ে শোভন উপায় হবে। এর মাধ্যমে যে দেশগুলোয় মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ অনেক বেশি, তারা মাথাপিছু কম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ অথবা ধনী থেকে গরিব দেশগুলোকে বড় অংকের অর্থ প্রদানের বিষয়টি পরোক্ষভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। 

যদিও এটি একটি অনিবার্য বাধা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, বিশেষত এমন একটা সময়ে, যখন অনেক ধনী দেশই আয়, সম্পদ, সুযোগ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রগুলোয় ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

মোটাদাগে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনের কৌশলগুলো যথাযথ বণ্টনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা মোটেই উপেক্ষা করা যাবে না। চ্যালেঞ্জগুলোকে যদি চিহ্নিত করা না যায়, তবে -জাতীয় প্রভাবগুলো জলবায়ু টেকসই পরিবর্তন কর্মসূচির মাথাব্যথার ইন্ধন জোগাবে।  

মূল বিষয়টি হলো প্রবল সক্রিয়তা, ব্যাপক অঙ্গীকার, তাত্ক্ষণিক বোধ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিশীল প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও সম্মিলিত প্রভাবগুলো এখনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিরুদ্ধে যাওয়া কিংবা কার্বন নিঃসরণ প্রবণতা কমানোর পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাই যত দ্রুত কাজে নামা যায় ততই মঙ্গল।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

মাইকেল স্পেন্স: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন