রবিবার| মার্চ ২৯, ২০২০| ১৪চৈত্র১৪২৬

সম্পাদকীয়

নয় মাস ধরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি বন্ধ

দ্রুত অর্থ ছাড় করুক অর্থ মন্ত্রণালয়

গত কয়েক বছরে দেশে বিপ্লব ঘটে গেছে কৃষিতে। ডিজিটাল কৃষিসহ হাইব্রিড পদ্ধতি চালুর ফলে একেবারে বীজতলা থেকে শুরু করে সার, সেচ, কীটনাশক, আবহাওয়া, জলবায়ু, ফসল উৎপাদন, বাজার পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে খোলামেলা মতবিনিময়, পরামর্শ প্রতিকারের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে তাত্ক্ষণিকভাবে। এর অনিবার্য ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি ব্যবস্থাপনায়, বাড়ছে ফসল উৎপাদন। আবহমানকাল ধরে প্রচলিত গবাদিপশুচালিত লাঙল-জোয়ালের দিন শেষ হয়েছে অনেক আগেই। হাইব্রিড বীজ, জিএম বীজসহ আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ফসল, শাকসবজি, মত্স্য, পোলট্রি, ফলফলারির উৎপাদন বাড়িয়েছে বহুগুণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি। বগুড়ার সান্তাহারে নির্মাণ করা হয়েছে দেশের প্রথম সৌরশক্তিচালিত অত্যাধুনিক বহুতলবিশিষ্ট খাদ্যগুদাম। প্রতি বছর উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক খাদ্যগুদামের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অবস্থায় হতাশার খবর হলো, নয় মাস ধরে ভর্তুকি বন্ধ কৃষি যান্ত্রিকীকরণে। সন্দেহ নেই, এর প্রভাব পড়বে কৃষি ক্ষেত্রে।

আমাদের গ্রামাঞ্চলে এখন শ্রমিক সংকট বিদ্যমান। শস্য রোপণ কর্তনের মৌসুমে সংকট খুবই তীব্র আকার ধারণ করে। তাতে ক্রমাগতই বেড়ে যাচ্ছে শ্রমিকের মজুরি। তদুপরি ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে সময়ক্ষেপণ, অপচয় অদক্ষতার কারণে কৃষি উৎপাদন লাভজনক হচ্ছে না। অবস্থায় কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। একটি পাওয়ার টিলারের দাম এখন প্রায় লাখ ১৫ হাজার টাকা। ৪৫ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ট্রাক্টর কিনতে খরচ হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। এটা ছোট মাঝারি কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। ফলে তারা এসব যন্ত্র কিনতে পারছেন না। এর বিকল্প হিসেবে কৃষক ভাড়ায় ব্যবহার করছেন পাওয়ার টিলার ট্রাক্টর। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে যন্ত্রগুলোর খুবই অভাব। কিছু বড় কৃষক স্থানীয় ব্যবসায়ী ট্রাক্টর পাওয়ার টিলারের মাধ্যমে চাষ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং সরবরাহ সংকটজনিত মুনাফা লুটে নিচ্ছেন। অবস্থায় কৃষকদের দাবি পাওয়ার টিলার ট্রাক্টরের ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রদান। বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

কৃষক গ্রামীণ উদ্যোক্তারা সাধারণ হারে হলেও ঋণ পেতে চান। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নীতি আছে যে যান্ত্রিকীকরণে ঋণ দিতে হবে। কিন্তু সেখানে নজরদারি নেই। ভারতে ব্যাংকে নজরদারি করা হয়, ব্যাংকগুলো কত ঋণ দিল, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা আছে। প্রতি কোয়ারে তাদের রিপোর্ট দিতে হয়। তাদের ব্যাংক কৃষকের পেছনে ছোটে। আরেকটি বিষয় হলো, দেশে এখন প্রচুর তরুণ শিক্ষিত বেকার। তারা কৃষিকাজে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। আবার চাকরির বাজার ছোট। এক্ষেত্রে তরুণদের কৃষিযন্ত্র কেনায় ঋণ দিলে তাদের বেকারত্ব ঘুচতে পারে। এছাড়া যান্ত্রিকীকরণ মানে হলো জীবনযাত্রার মান বাড়ানো। এটা সরকারেরও লক্ষ্য। এক্ষেত্রে যারা কাজ করছেন, তাদের সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দিয়ে হলেও উৎসাহ দেয়া উচিত। কৃষককে নানা পুরস্কার দেয়া হয়। কিন্তু গ্রামে যেসব মানুষ যান্ত্রিক সহায়তা দিচ্ছে, তারাও তো স্বীকৃতি পেতে পারে। আমরা কৃষককে প্রচুর টাকা বাকি দিই। ধরনের কোম্পানিকে ঋণ দেয়া সুদহারের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত। যদিও কৃষি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন যন্ত্রে ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়। তবে সংখ্যার দিক দিয়ে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ হলেও কৃষি সেক্টরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর দেশে কৃষিপ্রযুক্তি যান্ত্রিকীকরণে স্বর্ণযুগের শুরু হয়। ওই বছর আমদানীকৃত কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর থেকেকৃষি যন্ত্রপাতির মান নিয়ন্ত্রণ কমিটি শর্তগুলো শিথিল করে দেশে পাওয়ার টিলার আমদানি বেড়ে যায়। পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষের পর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় বীজ বপন, গুটি ইউরিয়া সার প্রয়োগ, শস্য কর্তন, শস্য মাড়াই, শস্য ঝাড়াইসহ নানা কাজে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বড় কৃষকদের প্রতি পক্ষপাত নেয়ার ঝোঁক লক্ষণীয়। সত্তর আশির দশকে ভারতের পাঞ্জাব অন্যান্য রাজ্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রভাব খতিয়ে দেখা হয়েছে। তাতে গ্রামীণ আয়বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশে বড় কৃষকের সংখ্যা খুবই কম। ছোট মাঝারি কৃষকের সংখ্যা বেশি। তাদের আর্থিক সমর্থন দিয়ে যন্ত্রের মালিক করা হলে গ্রামীণ আয়বৈষম্য কমতে পারে। তাতে শহরের সঙ্গেও গ্রামের আয়বৈষম্য কমে আসতে পারে। তাছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণে খুদে মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রসার ঘটানো হলে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ বিভিন্ন কাজে কর্মসংস্থান বাড়বে। এজন্য বাজেটারি সহায়তা প্রয়োজন। সেদিকে আমাদের নীতিনির্ধারকদের খেয়াল রাখা উচিত। শুধু শস্য খাতেই নয়, হাঁস-মুরগির খামার স্থাপন, দুগ্ধ খামার প্রতিষ্ঠা এবং মত্স্য চাষ আহরণে যান্ত্রিকীকরণের প্রসার ঘটানো যেতে পারে। এক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের অর্থ বিনিয়োগের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করা যেতে পারে। তাছাড়া ছোট অনানুষ্ঠানিক গ্রুপ সমবায় গঠন করে গরিব চাষীদের যান্ত্রিকীকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এসব বিষয়ে নীতিগত সমর্থন থাকা প্রয়োজন।

টেকসই কৃষি উন্নয়ন তথা বিভিন্ন ফসল শস্যবহির্ভূত কৃষি খাতের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। আবহাওয়ার বৈরিতা, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা লবণাক্ততার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য এখন যথাযথ প্রযুক্তি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। এজন্য এগিয়ে আসতে হবে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানী যন্ত্র প্রকৌশলীদের। তাদের অগ্রসরমান কৃষিপ্রযুক্তির ওপর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের গবেষণার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এজন্য নীতিগত বাজেটারি সমর্থন দরকার।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন