সোমবার| এপ্রিল ০৬, ২০২০| ২২চৈত্র১৪২৬

টকিজ

আমরা, ক্যারিকেচার এবং ‘স্বজনঘাতী রেখা’...

রুবেল পারভেজ

শিল্পের দুনিয়া বড় বেশি বিচিত্র, অদ্ভুত আর কৌতূহলের আবরণে ঠাসা। শিল্পের মহিমা হয়তো এখানেই লুক্কায়িত যে, অজস্র রূপে সে নিজের বিকাশের মূর্ততা দিতে সক্ষম। প্রয়োজন, সময় আর পরিস্থিতিতে শিল্প তার মতো করেই সিদ্ধান্ত নেয় সে কোন অবয়ব নিয়ে হাজির হবে, কোন অবয়বে হাজির হওয়া তার জরুরি।

সমগ্র পৃথিবীর সাধারণ মানুষ আজ এমন এক বিক্ষুব্ধতা নিয়ে দিনযাপন করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ কারণে সাধারণ এ মানুষদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ বিপরীত স্রোতধারায় নিজেকে সমর্পণ করে, সৃষ্টি করে একের পর আশাজাগানিয়া অনুভূতি। আবার চিরাচরিত সরল ইঙ্গিত যখনভোঁতা হয়ে যায়, তখন কোনো কোনো শিল্পী মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন উসকানিমূলক আর তির্যক রসবোধসম্পন্ন মাধ্যমকে। যার সম্মিলনে তিনি শিল্প রচনা করেন, যা ক্ষমতাধরদের চেতন নাড়িয়ে দিতে কার্যকর বটিকা হিসেবে কাজ করে।

ক্যারিকেচার কার্টুন তেমনি এক হাতিয়ার, যার মধ্যে রয়েছে প্রত্যক্ষ করার প্রখর দৃষ্টি, চিন্তার বিশ্লেষণের সূক্ষ্মতা, উসকানিমূলক রসবোধ; যা দিয়ে সমাজের, রাজনীতির, শাসকের, শোষকের বিভিন্ন সংগতি, অসংগতি, ব্যক্তির চারিত্রিক গুণাবলি, দোষাবলিকে অতিরঞ্জিত করে, কিন্তু পরিমিত শ্রমে তুলে ধরেন একজন কার্টুন শিল্পী।

শিল্পী শেখ আফজাল তাদেরই একজন। সম্প্রতি তার আঁকা কার্টুনচিত্র নিয়েস্বজনঘাতী রেখা শীর্ষক এক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে রাজধানীর কলাকেন্দ্রে। গত শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ১৭ মার্চ পর্যন্ত।

ক্যারিকেচার প্রদর্শনীটি নিয়ে কথা হয় এর কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দেশে-বিদেশে এখন এ শিল্প উদযাপনের অবস্থার অবনতি হয়েছে। বিব্রতবোধে, বিরক্তি ও বিষাক্ত বিধ্বংসী হয়ে ওঠার প্রবণতা প্রবল হয়েছে। কার্টুনিস্টদের জন্য সময়টা ভালো নয়। যার শিল্পকর্ম নিয়ে পুরো আয়োজনটি সাজানো হয়েছে, তাকে নিয়ে ওয়াকিলুরের বক্তব্য, ‘করুণ এ সময়ে শিল্পী শেখ আফজাল স্বজনদের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন। স্বজনরা সহজভাবে নেবেন এ ভরসায়। এক্ষেত্রে শাসক, শোষক, সমাজ আর বিশ্বাসের বিব্রত হওয়ার কারণ নেই। কেননা এ একেবারেই নিজেকে নিয়ে, স্বজনকে নিয়ে রসাত্মক উদযাপন। তবে স্বজনরা যেহেতু সমাজেরই, তাই উৎসাহী অনুসন্ধিত্সু, ভাবুক, দর্শকরা ভাবতেও পারেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস কিছু পেয়েও যাবেন। এমনসব ভাবনা-চিন্তাকে উসকে দিতেই এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা।

সমাজ, সংসার, রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য রাখার একটি বহুল চর্চিত শক্তিশালী মাধ্যম। ক্যারিকেচার, কার্টুন ড্রইং মূলত ক্যারেক্টার ড্রইং। আধুনিক সমাজ সভ্যতার একজন কার্টুনিস্ট প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত, শৈল্পিকভাবে দক্ষ বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচিত।

প্রদর্শনীতে ঠাঁই পাওয়া শেখ আফজালের শিল্পকর্মগুলোও যেন তা গভীরভাবে তুলে আনে। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর কিংবা নর-নারীর আলাপন এবং তাদের কথোপকথনের শরীরীভঙ্গি, মুখের আকৃতি এমনকি হাতের আঙুলের দুরন্ত-বিচিত্র ভঙ্গিও এমন রসবোধের সৃষ্টি করে, যা আসলে ভিন্ন চিন্তার জোগান দেয়। শিল্পী তার সবগুলো চিত্রকর্মেই সাদা-কালো রঙ আর চিকন রেখা ব্যবহার করেছেন। এর ফলে কোনো রকমের বাহুল্য ছাড়াই একেবারে নিরেট ভাবনার প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম সেসব।

প্রদর্শনীর নানা দিক নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি শেখ আফজাল শুনিয়েছেন তার কার্টুন চর্চার শুরুর দিককার কথা। অনেকটা স্মৃতিচারণের ভাষায় তিনি বলেন, ‘জাপান থেকে ফিরে আসার পর ১৯৯৫ সালে চারুকলায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলাম। তখন বসে বসে একজন আরেকজনের কার্টুন আঁকতাম। দেখা গেল শিশির (শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য) আমার একটা কার্টুন করল, আমি মনে মনে বললাম, দাঁড়াও তোমাকে দেখাচ্ছি। তখন ওরও একটা কার্টুন করলাম। তারপর অবশ্য অনেক দিন কার্টুন আঁকা হয়নি। ২০১৫ সালের দিকে দোহা ভাইয়ের (শিল্পী সামসুদ্দোহা) একটা কার্টুন এঁকে তার মেইলে পাঠিয়ে দিলাম। দোহা ভাই ফেসবুক থেকে আমার একটা ছবি নিয়ে মাথার টুপিতে চান-তারা লাগিয়ে দিল। তার পর থেকে শুরু হয়ে গেল দোহা ভাইকে নিয়ে কার্টুন করা। এরপর ইউনুস ভাই (শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস) বললেন, ‘আফজাল আমারটা করতে পারবা না। চ্যালেঞ্জটা নিলাম। নবী স্যারেরটাও (শিল্পী রফিকুন নবী) করলাম। তবে তিনি স্যার তো, তাই বেশি ব্যঙ্গ করা যায় না।

গল্পের ছলে শেখ আফজাল জানিয়ে দিলেন তার প্রথম ছবি আঁকার কথাটাও।প্রথম ছবিটা এঁকেছিলাম সুন্দরবন যাওয়ার সময়। মোস্তাফিজ ভাইয়ের বাড়ি বাগেরহাটে। আমাদের একটা ওয়ার্কশপে নিয়ে গিয়েছিলেন। লঞ্চের ডেকে বসে সকাল-সন্ধ্যা গল্প করেছি। সেটাই আঁকলাম। দোহা ভাই সবার ফটো তুলছিল। নবী স্যার বসা ছিলেন মাঝখানে। সামনে নিসার, মোস্তাফিজ ভাই আর আমাকে রাখলাম। পেছনে শিশিরও ছবি তুলছিল।

জানা গেল, শেখ আফজাল অন্য অনেক কিছুর বাইরে সহকর্মীদের নিয়েও ব্যঙ্গচিত্র আঁকেন। এরই মধ্যে সেগুলো নিয়ে নাকি ফোল্ডারও প্রকাশিত হয়েছে। যার প্রথমটি প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালের জয়নুল উৎসবে। আর গেল জয়নুল উৎসবে আরো তিনটি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন