শুক্রবার | জুন ০৫, ২০২০ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

টকিজ

৭০তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

এবারের আশা-হতাশা-সম্ভাবনা

শাহীন দিল-রিয়াজ

বার্লিন উৎসবের আয়োজকরা গত বছরগুলোয় তাদের সাফল্য দেখতেন কয়টি হলিউড ব্লকবাস্টার মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে স্থান পেল, কয়জন তারকা লাল গালিচায় তাদের পদধূলি দিলেনতার মাঝে। এবার এসবের ব্যতিক্রম বিশেষভাবে লক্ষণীয়

 

টানা ১৮ বছর উৎসব পরিচালনার পর গত বছর অবসর নিলেন ডিটার কশ্লিক। অনেক দিন থেকেই তার কাজের সমালোচনা করে আসছেন ইউরোপের অনেক চলচ্চিত্র-সমালোচক আর নির্মাতারা। বার্লিন উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায় নিম্নমানের ছবি নির্বাচন করা হয়এ অভিযোগ বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিদ্যমান। সে কারণে এ বছর নতুন দায়িত্ব নেয়া পরিচালক ডুও কার্লো শাত্রিয়ান (লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের সাবেক পরিচালক) ও মারিয়টে রিজেনবেক যেন উৎসবটিতে কিছু আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন, এ আশা নিয়ে বসেছিলাম আমরা সবাই। একই সঙ্গে ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ দিক পরিবর্তন যেন উৎসবের দীর্ঘ ইতিহাসের আনন্দমুখর উদযাপন হয়ে ওঠে, এ প্রত্যাশাটাও আয়োজক আর শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে মনে যাপন করছিলেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেই আকাশে ঘন মেঘ জমতে শুরু করেছে কয়েক মাস আগেই। বছরের শুরুতে হঠাৎ করে এক ঐতিহাসিক গবেষণায় বেরিয়ে এল, বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম পরিচালক আলফ্রেড বাওয়ার নািস-জার্মান সরকারের সঙ্গে গণমাধ্যম-মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন এবং তাদের রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করতেন, যা তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় গোপন রেখেছিলেন। এ রকম একটা ভয়ংকর তথ্য ৭০ বছরেরও বেশি সময় কীভাবে গোপন থাকতে পারল, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব নতুন উৎসব পরিচালকদের না হলেও এ কলঙ্কের কালিমা তাদের বেশভূষণে লেগেছে। স্বভাবতই এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত তারা উৎসবের পক্ষ থেকে করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক আগের দিন রাতেই ঘটল আরেকটি ভয়ংকর ঘটনা, যার সঙ্গে উৎসবের কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারি : এক বর্ণবাদী জার্মানহানাও নামের একটি শহরে কয়েক ঘণ্টার ভেতর নয়জন বিদেশী বংশোদ্ভূত তরুণকে গুলি করে হত্যা করে। তার কিছুক্ষণ পর আঁততায়ী এবং তার মাকে মৃত পাওয়া যায় নিজ ঘরে। এ ঘটনায় আঁতকে উঠেছে সব দেশ। নিও-নািসদের উৎপাত কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে কিন্তু এ রকম কিছু হঠাৎ করে ঘটতে পারেএটা কেউ কল্পনা করেছে বলে মনে হয় না। এবারের বার্লিন উৎসব তাই শুরু হয় এ সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন দিয়ে। সাংস্কৃতিক মন্ত্রী তার উদ্বোধনী বক্তব্যে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদদের কঠোর সমালোচনা করেন, যার প্রতিক্রিয়ায় হলের প্রায় দুই হাজার দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ করতালির মাধ্যমে তার বক্তব্যের সমর্থন করেন। বিষণ্ন দিনটিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুটা হতাশা আর বেদনা ভারাক্রান্ত হলেও ঠিক সেই মুহূর্তে এত মানুষের বর্ণবাদবিরোধী এ স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ এ দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী করে তোলে।


বার্লিন উৎসবের আয়োজকরা গত বছরগুলোয় তাদের সাফল্য দেখতেন কয়টি হলিউড ব্লকবাস্টার মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে স্থান পেল, কয়জন তারকা লাল গালিচায় তাদের পদধূলি দিলেনতার মাঝে। এবার এসবের ব্যতিক্রম বিশেষভাবে লক্ষণীয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা গেছে একমাত্র সিগরনি উইভারকে। ম্যাই সালিঙ্গার ইয়ার ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। জনি ডেপ এসেছেন খুব অল্প সময়ের জন্য উৎসবের দ্বিতীয় দিনে তার অভিনীত মিনামাতা ছবি নিয়ে, যাতে তিনি বিখ্যাত আলোকচিত্রী উইলিয়াম অয়গেন স্মিথের চরিত্র চিত্রায়ণ করেছেন। এছাড়া তারকাদের হাঁকডাক নেই বললেই চলে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে ছবির তালিকাটাও এবার চোখে পড়ার মতোব্লকবাস্টার একটাও নেই। পরিচিত ইউরোপীয় বা মার্কিন ওল্ড মাস্টারদের কাউকেই এবার আর এখানে স্থান দেয়া হয়নি। তার বদলে জায়গা পেয়েছেন অনেক তরুণ নির্মাতা। বড় উৎসবে সচরাচর অবহেলিত কিছু নির্মাতাও অনেকদিন পর এসেছেন, যাদের কাজ অনেক বছর ধরে দর্শকদের নাড়া দিয়ে আসছে। এবার বার্লিনের প্রতিযোগিতা বিভাগে তারা তাদের প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়ার নির্মাতা রিতি পানের নতুন ছবি ইর্যাডিএটেড, তাইওয়ানের নির্মাতা সাই মিং-লিয়াংয়ের সম্পূর্ণ সংলাপবিহীন ছবি রিজি। সর্বমোট ১৮টি ছবি এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে। জুরি সদস্যদের মাঝে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা জেরমি আইরন্স কিন্তু বাকি সবাই তরুণ নির্মাতা কিংবা সমালোচক, যাদের পরিচিতি না থাকলেও কাজের বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। এই প্রথম বার্লিনের মতো প্রথম সারির ইউরোপীয় চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রিত হলেন একজন ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা আনে-মারি ইয়াসির। এর আগে কান চলচ্চিত্র উৎসবে তার দুটো ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।

সব মিলিয়ে এবারের উৎসবে বেশকিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে উৎসবের সমাপ্তির সময়ে বোঝা যাবে, এ পরিবর্তনের ফল কতটুকু দর্শক আর বিশ্ব চলচ্চিত্রের জন্য ফলপ্রসূ হলো।

 

লেখক: জার্মান প্রবাসী চলচ্চিত্র নির্মাতা

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন