সোমবার| এপ্রিল ০৬, ২০২০| ২২চৈত্র১৪২৬

সম্পাদকীয়

শিক্ষা

প্রাথমিকের সময়সূচিতে অভিন্নতা আসুক

মো. সিদ্দিকুর রহমান

আনন্দ, বেদনা ও ক্ষোভের মাঝে চলছে প্রাথমিক শিক্ষা। বৈষম্যের বেড়াজালে অস্থিরতার মাঝে সময় কাটাচ্ছে শিশু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজ। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঊষালগ্নে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেন। সে সময় চারদিকে ছিল ভয়াবহ অভাব। অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ শিক্ষার চরম সংকট।৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার শাহাদতবরণের পরে সোনার বাংলা গড়ে তোলার অগ্রযাত্রা পেছনে ছুটতে শুরু করে। সে সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের নীতি পরিবর্তন করে ১৯৮১ সালে স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়। তিন মাস ১০ দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে এবং ঐতিহাসিক মহাবিক্ষোভ করে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের অস্তিত্ব বিপন্নের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষকদের এত দীর্ঘ সময় আন্দোলন আজকের দিনে শুধু কল্পনায় বা স্বপ্নে ভেসে বেড়ায়। আজকের দিনে তিন লাখ শিক্ষক পরিবারের ঐতিহাসিক মহাবিক্ষোভ আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে শুধু বিস্ময়। প্রত্যেক শিক্ষককে পরিবারের একজন বা একাধিক সঙ্গীসহ শুকনা খাবার নিয়ে মহাবিক্ষোভে আসার নিদের্শনা ছিল। তত্কালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার শিক্ষকদের পানি ক্রয় করে খাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিল। সে সময় আমার ওপর ঢাকা ওয়াসা থেকে পানি কেনার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষা তথা শিক্ষকদের অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আজকের এ অবস্থা। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। ফলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাননীয় শেখ হাসিনার সরকার দেশ-বিদেশে শিক্ষাবান্ধব হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। প্রাথমিক শিক্ষার বিশাল অর্জনের পরেও বৈষম্য নিরসনে ইতিবাচক উদ্যোগ তেমন দৃশ্যমান নয়। প্রাথমিক শিক্ষকদের ২০১৪ সাল থেকে বেতনবৈষম্যের দাবি শুধু আশ্বাস, হুমকি-ধমকি দিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। বর্তমানে সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম স্কেল মনের আগুন নেভানোর পরিবর্তে দাউ দাউ করে জ্বলছে। বেতন নির্ধারণে অধিকাংশের পিপি হয়ে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি থমকে দাঁড়াচ্ছে। এ যেন শুভংকরের ফাঁকি। সময়সূচি কমানোর নামে সৃষ্টি করা হচ্ছে এক অভূতপূর্ব বৈষম্য। একই কাজ, পদবি, বেতন স্কেল, সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষক অথচ কারো ছুটি ৩টা ১৫ মিনিটে আর কারো ছুটি ৪টায়। এ বৈষম্য কত বছর চলবে? তাও কোনো সঠিক নিদের্শনা নেই। অবকাঠামো নির্মাণসহ পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সময়সূচি ৩টা ১৫ মিনিট করার সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের। এ আরেক সময়ক্ষেপণের পালা। বিদ্যালয়ে শ্রেণীর কার্যক্রমে প্রতি পিরিয়ড শেষে ১০ মিনিট বিরতি। শিশুরা বিরতির সময় শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে দৌড়াদৌড়ি বা হইচই করে। এতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। স্বাভাবিকভাবে এর দায়ভার প্রথমে শিক্ষকের ওপর বর্তাবে। সংশ্লিষ্টরা স্বাভাবিকভাবে দুর্ঘটনার জন্য শিক্ষকদের দায়ী করতে একটুও কার্পণ্য করবেন না। বর্তমানে ২০২০ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশে বৈষম্যমূলক ঘণ্টা চালু হলেও ঢাকা শহরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এর ছোঁয়া লাগেনি। সংশ্লিষ্টদের কার্যক্রম দেখে মনে হয়, ঢাকা শহরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে অবস্থান করছে। অনতিবিলম্বে ঢাকা শহরের সমূয়সূচি নির্ধারণ করা দরকার। ঢাকা শহরের প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে কিন্ডারগার্টেন, সরকারি-বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখার সময়সূচির সামঞ্জস্য রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। সকাল ৭টা ৩০ থেকে বেলা ১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে সময়সূচি নির্ধারণ করা বাঞ্ছনীয়। ঢাকার বাইরের বিদ্যালয়গুলোর সময়সূচি এক ও অভিন্ন রেখে নতুন বৈষম্য দূর করা জরুরি। প্রতি পিরিয়ডের মাঝে ১০ মিনিট বিরতি না দিয়ে দুই-তিন পিরিয়ড পর শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম যেমন খেলাধুলা, নাচ, বিতর্ক, গান, আবৃত্তি, গল্প বলা, কোরআন প্রতিযোগিতাসহ নানা ধরনের কার্যক্রম চালু করা হোক। এতে শিশুরা বিদ্যালয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে। ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। বিদ্যালয় হয়ে উঠবে শিশুর বিনোদনের আবাস।

বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। অথচ প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন নতুন বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে চলেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনন্দঘন পরিবেশে শিশুদের শিক্ষার কথা বলে বলে অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রুটিনে সহপাঠ্যক্রম পাঠের কোনো সুযোগ না থাকা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপন্থী।

কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুর ওপর বইয়ের বোঝা কমানো, খেলাধুলা, বিনোদনের সুযোগ না রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে সব শিশুর জন্য অভিন্ন (বই, কর্মঘণ্টা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি) আজকে শিশুশিক্ষার জন্য অতি জরুরি। শিশুশিক্ষায় বৈষম্য দূর হলে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের মহান নেতা জাতির জনকের স্বপ্ন পূরণ হবে। তাই ঢাকাসহ সারা দেশে সময়সূচি এক ও অভিন্ন কর্মঘণ্টা হোকএটাই মুজিব বর্ষের প্রত্যাশা।

 

মো. সিদ্দিকুর রহমান: সভাপতি

বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ

[email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন