সোমবার| মার্চ ৩০, ২০২০| ১৫চৈত্র১৪২৬

টকিজ

সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে নতুন রহস্য

ফিচার প্রতিবেদক

পারিবারিক কলহের জেরে দেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেনদীর্ঘ সময় ধরে তদন্তের পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অভিনেতার আত্মহত্যায় যে বিষয়গুলো প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে, সেসব কারণও উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনটিতে। এর ফলে দীর্ঘ ২৩ বছর আগে ১৯৯৭ সালে সিআইডির দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন ২০১৪ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিফলন ঘটল পিবিআইয়ের প্রতিবেদনেও। ওই প্রতিবেদনগুলোতেও বলা হয়েছিল, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন। অবশ্য বরাবরের মতো পিবিআইয়ের করা প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছে সালমানের পরিবার।

পিবিআইয়ের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গতকাল সংস্থাটির প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় তাদের প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরেন। এতে অভিনেত্রী শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ, সন্তান না হওয়া, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা এবং আরো কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা, মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসা জটিল সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো সালমানকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচনা দিয়েছিল বলে জানানো হয়।

সালমান শাহ যে আত্মহত্যা করেছেন, এর সপক্ষে পিআইবি প্রধান সংবাদ সম্মেলনে বেশকিছু সূত্রকে উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা, যে বাসায় সালমান বাস করতেন সেখানকার বাড়িওয়ালা, দারোয়ান, বাড়ির ম্যানেজার, গৃহপরিচারিকা, দেহরক্ষী, বাড়ির প্রকৌশলী, ডাক্তারসহ বেশ কয়েকজনের সাক্ষ্য।


হস্তবিশারদ সমীর কুমার মুখার্জির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘সালমান শাহর সুইসাইডাল নোটটি সালমান শাহর হাতের লেখা। হাতের লেখা যখন মেলানো হয়, তখন আরো বিভিন্ন জায়গা থেকে স্বাক্ষরসহ সবকিছু মেলানো হয়। এটি একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।

শাবনূরের সঙ্গে সালমান শাহর সম্পর্ক নিয়ে রাঁধুনি মনোয়ার বেগমের সাক্ষ্য নিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, তিনি নাকি দেখেছেন সালমান শাবনূরকে নিয়ে ঝগড়া করতে করতে ঘরে ঢোকেন এবং ঝগড়া করতে করতেই ঘুমান। মনোয়ারা বলেছেন, সালমান তার স্ত্রী সামিরা শাবনূর দুজনকেই ভালোবাসতেন। সালমান নাকি চেয়েছিলেন শাবনূরকে বিয়ে করতে এবং তাদেরকে একসঙ্গে রাখতে। কিন্তু সামিরা সালমানের এমন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল। সালমান-সামিরা দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না।

পিবিআইয়ের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে সালমান শাহর সঙ্গে সামিরার সম্পর্ক, বিয়ে সালমান শাহ যে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন, তা উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনটিতে সামিরার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, তারা গোপনে বিয়ে করেছিলেন, সালমান শাহর মা তাকে মারধর করতেন। চিত্রনায়িকা শাবনূর তার বাসায় প্রায়ই আসতেন এবং যখন-তখন তাকে টেলিফোন করতেন, যা তার মোটেও পছন্দ ছিল না।


প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, সালমানের মৃত্যুর আগের দিন রাত সাড়ে ১১টায় তাকে শাবনূর দুবার ফোন করেন এবং সালমান দুবারই বাথরুমে চলে যান এবং চিত্কার করে বলেন, ‘তুমি (শাবনূর) আর কখনই বাসায় টেলিফোন করবে না।১২টার সময় আবার যখন টেলিফোনে কল আসে, তখন শাবনূরের উপহার দেয়া একটি টেবিল ফ্যান ভেঙে ফেলেন। এর পরের ঘটনা নিয়ে সামিরা বলেন, রাত ৩টার দিকে তারা ঘুমিয়ে পড়েন। সকাল ৯টায় তার শ্বশুর তাদের বাসায় আসেন এবং ৫০ হাজার টাকা দেন। এক পর্যায়ে তিনি শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিলেন। পরে দেখেন সালমান শাহ চলে গেছেন এবং যাওয়ার সময় দরজা খুলে তার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। সামিরার ভাষ্যমতে, এটাই ছিল সালমানের সঙ্গে তার শেষ দেখা। এরপর সবাই মিলে তাদের ড্রেসিং রুমের দরজায় ডাকাডাকি করেন এবং খুলে দেখেন সালমান ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছেন।

এদিকে সালমান শাহর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক এবং বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সালমান শাহ যে আত্মহত্যা করেছেন, সে সম্পর্কে পিবিআইয়ের প্রতিবেদন নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন শাবনূর। তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকে জানিয়েছেন, সালমান শাহর আত্মহত্যায় তিনি কোনোভাবেই ভূমিকা রাখেননি, এমনকি তার সঙ্গে তার কোনো প্রেমের সম্পর্কও ছিল না। সালমান শাহর সঙ্গে তার ভাইবোনের সম্পর্ক ছিল।

সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে তার মামা আলমগীর কুমকুমও পিবিআইর প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে পুনরায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। যুক্তি তুলে ধরে আলমগীর বলেন, ‘ মামলার যে রাজসাক্ষী রুবি সুলতানা, তিনি সামিরার মামি। তিনি তো বলেছেন, সালমানকে হত্যা করা হয়েছে। তার ছেলেকে দিয়ে সামিরা পুঁটলি সরিয়েছে। ওই পুঁটলিতে কী ছিল? তাকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো না? তার পর্যন্ত কি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে পিবিআই? আমরা পুনঃতদন্ত চাইব।১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যুর পর অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে, এমন অভিযোগ এনে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করার আবেদন জানান তিনি। ওই সময় অপমৃত্যুর মামলায় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করতে থানা পুলিশের পরিবর্তে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। তদন্তের পর ১৯৯৭ সালের নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে তারা। একই মাসের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে প্রতিবেদনটি গৃহীত হয়। কিন্তু সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। এর ফলে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। এরপর প্রায় ১৫ বছরে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল।

পরে ২০১৪ সালের আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। ওই প্রতিবেদনেও সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনটির বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন দাখিল করেন।

পরে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শুনানির পর সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা হত্যা না আত্মহত্যা, তা নির্ধারণের জন্য র্যাবের বদলে পিবিআইকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন