শুক্রবার | আগস্ট ১৪, ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

টকিজ

‘প্রেক্ষাগৃহ বাঁচাতে সরকারের পরিষ্কার ভাবনা থাকতে হবে’

নির্মাতা শামীম আখতার; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে ওতপ্রোতভাবে নিজেকে যুক্ত রেখে চলেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনকে বেগবান করতে যারা প্রাণপণ লড়াই শুরু করেছিলেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। শামীম আখতার চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও নিজেকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত রেখেছেন; নির্মাণ করেছেন পূর্ণদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। গতকাল টকিজের মুখোমুখি হয়ে এ নির্মাতা কথা বলেছেন বাংলাদেশের স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক গতিপথ, চলচ্চিত্র নির্মাণে নারী নির্মাতাদের অংশগ্রহণসহ আরো কিছু বিষয়ে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রুবেল পারভেজ

বাংলাদেশে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী সংগঠক হিসেবে কাজ করছেন বর্তমানে চলচ্চিত্রে মূল ধারা বিকল্প ধারার পথচলা নিয়ে জানতে চাই...
একজন নির্মাতা যেকোনো ধরনের ছবিই নির্মাণ করতে পারেন কিন্তু চলচ্চিত্রটি বানিয়ে যদি সেটিকে এন্টারটেইনমেন্ট আখ্যা দেয়া হয়, সে জায়গাটি নিয়ে আমার আপত্তি আছে আসলে একটি ছবি বাণিজ্য করবে কী করবে না, তা আগে থেকে নির্ধারণ করা যায় না আমার মনে হয়, এটা পুঁজিবাদীদের এক ধরনের স্লোগান এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রের সমষ্টিগত জগেক বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়

আসলে যেকোনো চলচ্চিত্রই শিল্পের সংস্পর্শ নিয়ে পৃথিবীতে আসার অধিকার রাখে তাই সিনেমাকে উত্কর্ষতা লাভের সুযোগ দিতে হবে এমনকি বিনোদনের অন্যতম উপাদান নাচ, এর উপস্থাপনও পরিমিতিবোধের দাবি রাখে ভারতের ছবিতে যে ধরনের নৃত্য থাকে, খেয়াল করলে দেখা যায় সেখানেও অনেক যত্নের ছাপ একটি দৃশ্যায়নও ওখানকার নির্মাতারা না বুঝে করেন না দীর্ঘদিন ধরে চর্চার ফলে বলিউডের নাচের মধ্যেও সৌন্দর্যের দেখা পাওয়া যায় আমার মতে, জায়গাগুলোর দিকে নজর দিয়ে বিদ্যমান বিনোদনপ্রথাকে পুনঃআখ্যায়িত করতে হবে এবং দর্শককেও সেখানে উপনীত করতে হবে এজন্য বুঝেশুনে কাজ করার বিকল্প নেই আসলে গণতান্ত্রিক মতাদর্শ মানতে হলে মতাদর্শ বুঝতে হয় আমরা না বুঝে দর্শক হয়ে যাই এবং না বুঝে আশা করি আমার ছবি আমাকে বিনোদন দেবে জায়গায় আমরা হেরে যাচ্ছি বারবার

স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিসর বাড়াতে এবং শিল্পমানসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন নির্মাতাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের যখন সূচনা হয়, তখন থেকেই কিন্তু স্বাধীন নির্মাতাদের জন্ম হয় নিজেকে বিকিয়ে না দেয়ার ফলে ধীরে ধীরে তাদেরও একটা অবস্থান গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় হয়তো পরিস্থিতির কারণে স্বাধীন নির্মাতাদের কেউ কেউ মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত হন তবে এর মানে এই নয় যে তারা নিজেকে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে বিচ্যুত রাখেন তারা মনে মনে ঠিকই লড়াইটা চালিয়ে যান, হয়তো মুখে প্রকাশ করেন না ফলে এখন সময়ে দাঁড়িয়ে কারো বলা ঠিক নয় যে ওমুক ছবিটি যেহেতু বাণিজ্যিক, তাই দেখব না এজন্য স্বাধীন নির্মাতা যারা আছেন, তাদের নতুন ধারা সৃষ্টির নিমিত্তে আসতে হবে, ছবি বানাতে হবে তাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে পুরনো ধারার একই জিনিস ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে হাজির করা যাবে না অবশ্যই নতুন চিন্তা নিরীক্ষা এখানে যোগ করতে হবে

ছবির প্রদর্শনী নিয়ে সংকটের সমাধান না হওয়ার দায় কার ওপর বর্তাতে চান?
সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন হলওয়ালা, প্রদর্শকরা ছবি প্রদর্শনীর প্রাপ্য অর্থ তারা না দেয় পরিবেশক, না দেয় প্রযোজকদের আবার তারাই হুটহাট প্রদর্শনের খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং নানা অজুহাতে প্রযোজকদের কাছ থেকে টাকা নেয় প্রবণতা বন্ধ করতে হবে একই সঙ্গে বিনোদন ট্যাক্স কমানোর ব্যাপারে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রেক্ষাগৃহ বাঁচাতে হলে সরকারের পরিষ্কার ভাবনা থাকতে হবে সরকার সিনেমা খাতে প্রণোদনা ঠিকই দিচ্ছে, কিন্তু তারা কোনো গাইডলাইন দিচ্ছে না এবং সংকট নিরসনেও ব্যর্থ হচ্ছে

ইতিহাস কন্যা ছবিটি নিয়ে সংকট হয়েছিল...
ইতিহাস কন্যার প্রেক্ষাপটটা ছিল ভিন্ন আমি ভীষণ বাঁধন ছাড়া মানুষ সুতরাং ছবিটি বানানোর পর আমি বলেছিলাম দরকার হলে রাস্তায় রাস্তায় দেখাব আসলে ১৯৯৮ সালে যখন ছবিটি বানাই, তখন কিন্তু ছবি দেখার অনেক বিকল্প মাধ্যম ছিল না রাস্তায়, মাঠে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দেখিয়েছি এবং বিপুল সাড়া পেয়েছি

তবে হ্যাঁ, শীলালিপি ছবিটি নিয়ে সংকটে পড়েছিলাম ছবিটিতে বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি ছিল, যা কিনা একেবারেই পত্রিকার পাতা থেকে তুলে ধরা হয়েছিল তার পরও ২০০১ সালে যখন সরকার বদল হলো, তখন দেখা গেল ছবিটি কেউ নিচ্ছে না যে কারণে ছবিটি দর্শকের কাছে পৌঁছানো নিয়ে যত প্রত্যাশা ছিল, তার কিছুই পূরণ হয়নি এমনকি এর সাবটাইটেলও করতে পারিনি তখন আমার মনে হয়, সাবটাইটেল যুক্ত করে ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরা উচিত ছবিটি

নারী নির্মাতা হিসেবে আপনার যাত্রা ছিল কঠিন এখন সে রকম সংকট কম তার পরও দেশে নারী নির্মাতাদের সংখ্যা নাজুক কেন?
ঠিক, আমার কাছেও খুবই নাজুক মনে হয় এখন আরো বেশি করে নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্রে কাজ করা উচিত যেমন আমি কিন্তু রুবাইয়াতের (নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন) ভক্ত আমি মনে করি, রুবাইয়াত একটা লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করছে ওর উত্কর্ষতা ধরে রেখে গল্পকে সুন্দর করে উপস্থাপন করছে এবং তাতে নিজস্ব চিন্তার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে কারণেও আমার মনে হয়, ওর মতো করে আরো অনেক নারীকে পথে আসতে হবে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন