সোমবার | জুলাই ১৩, ২০২০ | ২৮ আষাঢ় ১৪২৭

শেষ পাতা

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন

জিতলেও ভোটার উপস্থিতি নিয়ে অস্বস্তিতে আ.লীগ

তানিম আহমেদ

সদ্য অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে একচ্ছত্র জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বড় জয় পেলেও নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ায় হতাশ দলটি। এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি মাত্র ২৭ শতাংশ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে আছেন দলের নেতারা।

আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, ভোট নিয়ে বিরোধীদের অপপ্রচার, ঢাকার নাগরিকদের স্থান পরিবর্তন, ভোটের দিন গণপরিবহন না থাকা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের আনতে সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং দলের সমর্থকদের কিছু অংশের ভোটে অনীহা থাকায় এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট কম পড়েছে।

এছাড়া রাজনীতি নিয়ে জনগণের মধ্যে এক ধরনের অনীহা কাজ করছে। আবার তাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, ভোট হলে আওয়ামী লীগ জিতবেই। তেমনি এ ধারণা আমাদের নেতাকর্মীর মধ্যেও জন্ম নিয়েছে। তাই এবারের সিটি নির্বাচনে দলের অনেক সমর্থকও ভোটকেন্দ্রে যাননি বলে জানান তারা।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, আমরা সিটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করছি। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব। কী কারণে ভোটার উপস্থিতি কমেছে, এটা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ও গবেষণা ছাড়া মন্তব্য করাটাকে যুক্তিসংগত নয় বলে মনে করি আমি। পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন পাওয়ার পরই আমরা জনগণকে ভোটমুখী করার জন্য আমাদের কার্যক্রম শুরু করব।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৪ লাখ ৬৬ হাজার ২৮৫ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১৪ লাখ ৭৫ হাজার ৮৩৮ জন, যা মোট ভোটের ২৭ শতাংশ। এর আগে ২০১৫ সালে দুই সিটিতে নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ঢাকা উত্তরের ৩০ লাখ ১২ হাজার ৫০৯ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭ লাখ ৬২ হাজার ১৮৮ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২১১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যা মোট ভোটারের ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণের ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৫৯ ভোটারের মধ্যে ৭ লাখ ১৩ হাজার ৫০ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। বিজয়ী আওয়ামী লীগ মনোনীত শেখ ফজলে নূর তাপস পেয়েছেন ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ ভোট, যা মোট ভোটারের ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ।

ঢাকাবাসী কেন এবার ভোটকেন্দ্রবিমুখ ছিলেন? এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তীর পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপীই সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া রাজনীতিতে এক ধরনের সুবিধাবাদী শ্রেণী গড়ে উঠেছে। এ কারণে যাদের ভাগবাটোয়ারার রাজনীতিতে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তাদের তেমন আগ্রহও নেই। এ কারণে দল সমর্থন করলেও তারা ভোটকেন্দ্রবিমুখ।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের জাতীয় ভোটার উপস্থিতির হার ছিল যথাক্রমে ৫০ দশমিক ৯, ৫১ দশমিক ৩, ৫৯ দশমিক ৩৮ ও ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেবল ক্ষমতাসীন বিএনপির অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার নেমে আসে ২১ শতাংশে। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপস্থিতির হার দাঁড়ায় ৭৫ শতাংশে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০০১ সালের অষ্টম এবং ২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭৪ দশমিক ৯৬ এবং ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশে। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার নেমে আসে ৪০ শতাংশে। বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এই ৮০ শতাংশ ভোটের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৭৭ শতাংশ ভোট। কিন্তু সম্প্রতি দেশের সবচেয়ে বড় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি এত কম হওয়াটাকে ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ওবায়দুল কাদের বলেন, মানুষের ভোটের প্রতি অনীহা গণতন্ত্রের জন্য ভালো না। তাই আওয়ামী লীগের এটা নিয়ে ভাবনার বিষয়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটাতে হবে। এ নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিতে হবে দলকে; ভবিষ্যতে নির্বাচনের জন্য এ নির্বাচনের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে।

আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, বিএনপি এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য অংশগ্রহণ করেছে, এটা তাদের নেতারা শুরু থেকেই বলে আসছিলেন। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বাদ দিয়ে পারিবারিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত দুজনকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাই আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে প্রতিপক্ষের শক্তির বিচার করে। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা মনে করেছেন, বিএনপি প্রার্থী দুর্বল, তারা নির্বাচনে সিরিয়াস না। তাই আমাদের নেতাকর্মীদের তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে তেমন মোবিলাইজ করা হয়নি। ভোটের দিন আমাদের নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগঠিতভাবে ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেননি।

দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রাজ্জাক বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক লোকও ভোট দিতে যায়নি। তারা মনে করেছে, আওয়ামী লীগ এমনিতেই জিতবে। ছুটির দিন একটু রিলাক্স করি। তবে এটা নিয়ে হতাশা বা চিন্তার কোনো কারণ নেই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন