বৃহস্পতিবার| এপ্রিল ০২, ২০২০| ১৮চৈত্র১৪২৬

সম্পাদকীয়

সময়ের ভাবনা

চরবাসীকে উন্নয়নের মূল প্রবাহে সম্পৃক্ত করা জরুরি

রুহিনা ফেরদৌস

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের যে ১০টি দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়বে দেশের ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ জিডিপি ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৭১ বিলিয়ন ডলার। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যেতে পারে। এমন বাস্তবতায় দেশের চরাঞ্চলের মানুষের পরিণতি কতটা নাজুক হবে তা অনুমেয়।

কেননা বাংলাদেশের যেসব অংশে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়বে, তার মধ্যে চরাঞ্চল অন্যতম। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় অঞ্চলগুলো। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের প্রায় ১০০টি উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা উপকূলীয় চরাঞ্চলে প্রায় এক কোটি মানুষের বসবাস। যাদের অধিকাংশই দরিদ্র বা অতিদরিদ্র। চরের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে হাজার টাকার নিচে গড় মাসিক আয় (মাথাপিছু দৈনিক আয় ডলারের নিচে) এমন পরিবারের উপস্থিতি উপকূলীয় চর উপজেলায় গড়ে ২৬ শতাংশ এবং নদীবিধৌত চর উপজেলায় ২৪ দশমিক শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের (২২ দশমিক শতাংশ) তুলনায় বেশি (সূত্র: সমুন্নয় ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্স সচিবালয়) স্বাস্থ্য খাতেরও শোচনীয় অবস্থা। জাতীয় পর্যায়ে উপজেলায় যেখানে পরিবারগুলোর স্যানিটারি বা পাকা শৌচাগার ব্যবহারের গড় হার ৩৯ দশমিক শতাংশ, সেখানে উপকূলীয় নদীবিধৌত চর উপজেলায় যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ৩১ দশমিক শতাংশ। এদিকে সারা দেশে গড় দারিদ্র্যের হার ১১ শতাংশের সামান্য বেশি হলেও কোনো কোনো চরাঞ্চলে তা দ্বিগুণের বেশি। একই রকম ব্যবধান দেখা যায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ সংযোগ, গড় আয় মজুরির ক্ষেত্রেও। এক কথায় তাই চরম দারিদ্র্য আর সুযোগ-সুবিধার অভাবসহ নানা রকম প্রতিবন্ধকতার মধ্যে টিকে থাকতে হচ্ছে অসহায় মানুষদের।

জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের সময়ও অঞ্চলটি অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়ছে এটি। উল্লিখিত সংস্থার গবেষণা অনুসারে, জাতীয় পর্যায়ে ৩৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ মানুষ আধুনিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করলেও উপকূলীয় নদীবিধৌত চর উপজেলায় তা গ্রহণ করে যথাক্রমে ৩০ দশমিক ৩৯ ৩৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এখানে বড় বাধা হয়ে আসে যোগাযোগ প্রতিবন্ধকতা। বাড়ি থেকে কিছুদূর হেঁটে গিয়ে নৌকায় এসে পুনরায় নতুন কোনো যানবাহনে চেপে উপজেলা শহরে পৌঁছাতে হয়। সময় পরিশ্রমের পাশাপাশি বেড়ে যায় পরিবহন খরচও। বড় ধরনের বিপত্তি বাধে প্রসূতি গর্ভবতী নারীদের বেলায়। জরুরি অবস্থায় হাসপাতালে যাওয়ার সময় তাদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। অথচ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের নাগরিকরা যেসব সুযোগ-সুবিধা পায়, চরের অধিবাসীদেরও সেসব পাওয়ার অধিকার আছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, চরের মানুষকে অবহেলা করে টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুপেয় পানি সমস্যা চরের অন্যতম সংকট। চরাঞ্চলে নলকূপের সংখ্যা জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা জলোচ্ছ্বাসের এখানকার অধিকাংশ নলকূপই তলিয়ে যায়। ফলে নদীর পানি খেয়ে থাকতে হয় তাদের। পাশাপাশি চরের মানুষ বঞ্চিত বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্তি থেকেও। জাতীয় পর্যায়ে উপজেলাগুলোয় গড়ে ৭২ দশমিক শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও চরাঞ্চলগুলোয় বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। শিক্ষা ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে তারা। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছে এমন শিক্ষার্থীর হার জাতীয় পর্যায়ে গড়ে ৪৯ দশমিক শতাংশ হলেও উপকূলীয় নদীবিধৌত চর উপজেলায় হার যথাক্রমে ৪১ দশমিক ৪৪ দশমিক শতাংশ। (তথ্যসূত্র: আলোকিত চর, ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্স)

আশার কথা, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২০-২১ সালের মধ্যে অতিদারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চরের প্রান্তিক মানুষের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয়েছে। এবারের জাতীয় বাজেটে চর, হাওড় অন্যান্য অনুন্নত এলাকার জন্য বিশেষ সহযোগিতা হিসেবে গত বছরের তুলনায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনায় বিশেষ হটস্পট হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে চরাঞ্চলকে।

তবে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখা হলেও সমস্যা দেখা যায় বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়ের বেলায়। বিভিন্ন প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অর্থ ছাড় হয় না। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে চর হাওড়াঞ্চলের জন্য ১০০ কোটি টাকা এবারের বাজেটে দ্বিগুণ বরাদ্দ দেয়া হলেও তা কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। একে তো বরাদ্দের অর্থ যথেষ্ট নয়, তার ওপর অর্থ ছাড় না করা সম্ভব হলে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর জীবনমান উন্নত করা সম্ভব হবে না। তাই চরের মানুষের অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি চর ফাউন্ডেশন বা চর বোর্ড গঠনের প্রয়োজন, যারা চরের উন্নয়ন দুর্যোগ মোকাবেলায় বিশেষ অথরিটি হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে জাতীয় চর নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়কেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।

চরের মানুষদের উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করার জন্য কৃষি অকৃষি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শামিলের বিকল্প নেই। এভাবে দেশের অর্থনীতিকে আরো বেশি বেগবান করা সম্ভব হবে। চরের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে কৃষি খাতকে। ৭০ শতাংশেরও বেশি চর অধিবাসী জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ৬২ শতাংশেরও বেশি চর অধিবাসীর বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়েই তাদের আরো উৎপাদনমুখী কৃষিতে যুক্ত করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, থেকে দশমিক শতাংশ হারে কৃষি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো গেলে খাত থেকে আশানুরূপ রফতানি আয় সম্ভব। তাছাড়া যদি এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হয়, তাহলে একরপ্রতি কৃষি উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, অকৃষি জিডিপি শতাংশ বাড়লে যতটা দারিদ্র্য হ্রাস পায়, কৃষি জিডিপি শতাংশ বাড়লে দারিদ্র্য হার তিন গুণ হ্রাস করা যায়। চরাঞ্চলে অনেক ধরনের রিসোর্স রয়েছে, যেগুলো কাজে লাগানো গেলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন যোগ হবে। চরের কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব রাখা সম্ভব হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে চরের কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সরকারের পাশাপাশি সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চরের মানুষের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন করতে হবে। চর, হাওড়াঞ্চলগুলোয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দেশের অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রধান সমস্যা চিকিৎসকদের গ্রামে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকতে না চাওয়া। ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসকরা যাতে কর্মস্থলে থাকেন, সেই পরিস্থিতিও তৈরি করতে অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে চরবান্ধব শিক্ষা স্বাস্থ্যকেন্দ্র।

বাংলাদেশ আজ টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের উদাহরণ হলেও চরাঞ্চলের ক্ষেত্রে ব্যত্যয় লক্ষণীয়। তাছাড়া ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি বা সরকার পরিচালিত সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিগুলো এখানে তুলনামূলকভাবে কম। সারা দেশ এগিয়ে গেলেও বিভিন্ন সামাজিক অর্থনৈতিক সূচকের বিচারে অঞ্চলগুলো এখনো পিছিয়ে আছে। এখানে যেমন পর্যাপ্ত উর্বর ভূমি রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানবসম্পদ। তাছাড়া পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে অঞ্চল। এভাবে নতুন কর্মসংস্থানের উৎস হতে পারে চর। তাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চরের বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণের বিষয়গুলোও বিবেচনা জরুরি।

 

রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন