রবিবার | আগস্ট ০৯, ২০২০ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

কৃষি গবেষণা

খাদ্য-পুষ্টিনিরাপত্তা টেকসই ও শস্য বহুমুখীকরণ নিশ্চিতে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে

একসময় দেশের নীতিনির্ধারণী মহল তথা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিটি মানুষের অন্ন জোগানো ক্ষুধামুক্তি। কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা, কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয়তা এবং সর্বোপরি কৃষকের নিরন্তর পরিশ্রমে কৃষিতে মোট উৎপাদন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে দানাদার খাদ্যশস্য, প্রধানত চালে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। সেই অর্থে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। সন্দেহ নেই, এটি একটি ইতিবাচক চিত্র। কিন্তু অন্যদিক  থেকে বিচার করলে দেখা যায়, সময়ান্তরে দেশে জনসংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সেই হারে কৃষি প্রবৃদ্ধি বাড়েনি। তার মানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে কৃষি প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক নয়। এখন আমাদের জনসংখ্যা ক্রমবর্ধিষ্ণু। তার সঙ্গে সংগতি রেখে উৎপাদন তথা কৃষি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো না গেলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে বৈকি। নিকট অতীতে এমনটাই দেখা গেছে। ২০১৭ সালে হাওড়ে আগাম বন্যা দেশে খাদ্য সংকট সৃষ্টি করেছিল, পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করতে হয়েছিল, উচ্চদামের কারণে দুর্ভোগে পড়েছিল নিম্ন আয়ের মানুষ। কাজেই শুধু খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন নয়, তার স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিতই সরকারের প্রাধিকার হওয়া উচিত।

তবে দেশের কৃষি খাতকে পরবর্তী ধাপে উন্নীতের ক্ষেত্রে বাস্তবিক কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্যতম চ্যালেঞ্জ ক্রমসংকুচিত কৃষিজমি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের কারণে কৃষিজমি অব্যাহতভাবে কমছে। সেক্ষেত্রে অল্প জমিতে কীভাবে অধিক উৎপাদন বাড়ানো যায়, তার উপায় অন্বেষণ করতে হবে। আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো, শস্য বহুমুখীকরণের ঘাটতি। আমরা চাল উৎপাদন, কিছুটা গম সবজি উৎপাদন বাড়াতে সমর্থ হয়েছি বটে, কিন্তু ডাল, মসলা তৈলজাতীয় খাদ্যপণ্য উৎপাদনে অনেক পিছিয়ে রয়েছি। ফলে আমদানির মাধ্যমেই এসব পণ্যের বেশির ভাগ চাহিদা মেটানো হচ্ছে। এক হিসাবে উঠে এসেছে, উল্লিখিত পণ্যগুলো আমদানি বাবদ প্রতি বছর গড়ে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। কৃষিতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে হঠাৎ তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া। সারা বছর কোন সময় কতটা তাপমাত্রা থাকবে, জলবায়ুর অভিঘাতগুলো কেমন হবে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে ফসল উৎপাদন জরুরি। তা না হলে বড় ধরনের ফলন বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হবে। অবস্থায় উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো আমলে নিয়ে কৃষি খাতে গবেষণা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ বেশ অপ্রতুল। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সিস্টেমভুক্ত (নার্স) ১০টি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের  মোট বরাদ্দ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ৬৮৮ কোটি টাকা; মোট দেশজ উৎপাদন অনুপাতে যা মাত্র শূন্য দশমিক থেকে শূন্য দশমিক শতাংশের নিচে। অথচ চীন, আমেরিকা উন্নত দেশগুলোয় হার শতাংশের উপরে। আর প্রতিবেশী ভারতেও হার শূন্য দশমিক শতাংশের উপরে। সুতরাং কৃষি গবেষণায় আমাদের বরাদ্দ কতটা অপর্যাপ্ত, তা সহজেই অনুমেয়।

এতদিন সীমিত সামর্থ্যে গবেষণা করে সংশ্লিষ্ট খাতের অগ্রগতি সাধন করেছেন কৃষি গবেষকরা। প্রযুক্তি প্রবর্তন কিছু উন্নত জাত উন্মোচনের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তবে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো ভিন্নতর জটিল। এর মধ্যে ক্ষুধা নিবৃত্তিতে তুলনামূলক সাফল্যের সুবাদে উন্নয়ন ডিসকোর্স জন আলোচনায় পুষ্টিনিরাপত্তা একটি বড় ইস্যু হিসেবে হাজির হয়েছে। শুধু ক্ষুধামুক্তি নয়, পুষ্টিকর খাদ্য পরিভোগ নিশ্চিত বর্তমানে অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। তদুপরি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন বাড়ায় সামনের দিনে মানুষের খাদ্য চাহিদা হবে বহুমুখী। বাড়বে পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা। সেক্ষেত্রে বৈরী পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো ঘাতসহিষ্ণু পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করা না গেলে সর্বশ্রেণীর জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার জোগান দেয়া সহজ হবে না। আর সেটি করতে হলে গবেষণা বাড়াতে হবে। এজন্য চাই বাড়তি অর্থ। বর্তমানে গবেষণায় প্রধান প্রতিবন্ধক অর্থায়ন। প্রতিবন্ধকতা দূরে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাতের গবেষণায় অর্থায়নে উৎসাহিত করা যেতে পারে। উপরন্তু বিদেশী অর্থায়ন সংস্থান বাড়ানোর প্রচেষ্টা নেয়া যেতে পারে। সম্মিলিত প্রয়াসে কৃষি গবেষণায় অর্থায়নের ঘাটতি নিরসন হবে, এটিই প্রত্যাশা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন