মঙ্গলবার| ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০| ৫ফাল্গুন১৪২৬

শেয়ারবাজার

শেয়ারবাজার

শীর্ষ ১০ কোম্পানির ৬টিতেই বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে

মেহেদী হাসান রাহাত

গত বছর ১ হাজারের বেশি পয়েন্ট হারানোর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বড় মূলধনিসহ অধিকাংশ কোম্পানির দরপতনের মধ্য দিয়ে পার করেছে দেশের শেয়ারবাজার। ২০১০ সালের ধসের পর আর কখনই এতটা অস্থিরতা দেখা যায়নি শেয়ারবাজারে। আর বাজার পতনের অন্যতম একটি কারণ ছিল বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির হার বেড়ে যাওয়া। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছর শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে। এ সময় বিদেশী বিনিয়োগের দিক দিয়ে শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে ছয়টিতেই বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে। অন্যদিকে বাজার মূলধনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে পাঁচটিতেই বেড়েছে বিদেশীদের বিনিয়োগ।

দেশের স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোয় ২০১৮-এর ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডে বিদেশীদের সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটিতে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্র্যাক ব্যাংকে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়ে ৪৩ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিদেশী বিনিয়োগের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং লিমিটেড (ডিবিএইচ)। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ডিবিএইচে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটিতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ৪২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিস্কুট উৎপাদনকারী শীর্ষ কোম্পানি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশীদের বিনিয়োগ ছিল ৪০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এটি দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৪০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ হয়েছে।

দেশের ওষুধ খাতের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বিদেশীদের বিনিয়োগ ছিল ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। আর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটিতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশে। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটিতে বিদেশীদের বিনিয়োগ কমেছে ১ দশমিক ৮১ শতাংশ।

বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশীদের ২৪ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বিনিয়োগ ছিল। ২০১৯ সাল শেষে দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে ব্যাংকটিতে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ২৩ দশমিক ৫৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

ওষুধ খাতের আরেক কোম্পানি রেনাটা লিমিটেডে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ এক বছরে দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটিতে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে ২২ দশমিক ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বস্ত্র খাতের কোম্পানি এমএল ডায়িং লিমিটেডে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২১ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষেও অপরিবর্তিত রয়েছে।

ওষুধ খাতের শীর্ষ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটিতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে ২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। দেশের শেয়ারবাজারে গত বছর সূচকের পতনে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমার বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছে। অথচ কোম্পানিটির শেয়ারে এ সময়ে বিদেশীদের বিনিয়োগ বেড়েছে।

বস্ত্র খাতের কোম্পানি শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ২১ দশমিক ১০ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগ ছিল। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এসে কোম্পানিটিতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বস্ত্র খাতের আরেক কোম্পানি ভিএফএস থ্রেড ডায়িং লিমিটেডে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে কিছুটা কমে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের দিক দিয়ে শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে ছয়টিতেই বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ কমলেও বিপরীত চিত্র দেখা গেছে শীর্ষ মূলধনি কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে। বাজার মূলধনের দিক দিয়ে শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে পাঁচটিতে বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে। কমেছে চারটিতে আর অপরিবর্তিত রয়েছে একটিতে।

দেশের শেয়ারবাজারে বাজার মূলধনের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় কোম্পানি গ্রামীণফোন লিমিটেড। কোম্পানিটিতে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে ডিসেম্বর শেষে গ্রামীণফোনে বিদেশীদের বিনিয়োগ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কোম্পানিটিতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে রাজস্ব পাওনা নিয়ে দ্বন্দ্বের প্রভাবে গত বছর গ্রামীণফোনের শেয়ার ২২ শতাংশ দর হারিয়েছে। আর কোম্পানিটির শেয়ারের দরপতনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। গ্রামীণফোনে গত বছর বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণের পরিমাণ বাড়লেও এর বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণের পরিমাণ কমেছে।

তামাক খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেডে (বিএটিবিসি) ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটিতে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে ১৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।


বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে (ইউপিজিডিসিএল) ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল দশমিক ১৩ শতাংশ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটিতে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ সামান্য কমে দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

রঙ উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটিতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩০ শতাংশে। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটিতে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে দশমিক ১৬ শতাংশ।

এফএমসিজি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেডে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটিতে বিদেশীদের বিনিয়োগের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে দশমিক ৯৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

দেশের বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেডে ২০১৮ সাল শেষে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষেও অপরিবর্তিত ছিল।

তাছাড়া ২০১৮-এর ডিসেম্বরের তুলনায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে বাজার মূলধনের দিক দিয়ে অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মায় ২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, রেনাটায় দশমিক ২৮ ও  ব্র্যাক ব্যাংকে ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে।

দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোয় বিদেশীদের শেয়ার ধারণের পরিমাণ কমার পাশাপাশি তাদের লেনদেনের পরিমাণও কমে এসেছে। ২০১৯ সাল শেষে শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিট লেনদেন দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪ কোটি ৪৮ লাখ ডলারে। আর এ সময়ে শেয়ার কেনা-বেচা মিলিয়ে তাদের মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৯২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ২০১৮-এর তুলনায় ২০১৯ সালে শেয়ারবাজারে বিদেশীদের মোট লেনদেনের পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা একটি নির্দিষ্ট সময় পর তাদের বিনিয়োগের অর্থ এক দেশ থেকে আরেক দেশে কিংবা এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে স্থানান্তর করে থাকেন। তাছাড়া মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেও তারা শেয়ার বিক্রি করে পুঁজি উঠিয়ে নিয়েছেন। অবশ্য গত বছর বিদেশীরা যে শুধু শেয়ার বিক্রি করেছেন, তা নয়। এ সময়ে তারা ব্র্যাক ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোনের মতো বড় মূলধনি ও ভালো কোম্পানির শেয়ারে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়িয়েছেন। সার্বিকভাবে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ কিছুটা কমলেও বেশকিছু ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারদর বর্তমানে কম থাকায় এগুলোয় বিদেশীদের বিনিয়োগ বাড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন