শনিবার| ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০| ১৫ফাল্গুন১৪২৬

সিল্করুট

‘দিভান দেল তামারিত’

হাফিজে মুগ্ধ লোরকার গজল

মনজুর শামস

স্পেনে ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার দুই বছর আগে ১৯৩৪ সালে স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা তার গজল ঘরানার কাব্যগ্রন্থ দিভান দেল তামারিত রচনা শেষ করেন। তিনি তার এ কাব্য সংকলনে দুই ধরনের কাব্যধারার সমাবেশ ঘটিয়েছেন—গ্যাসলা (গজল) ও কাসিদা। এ দুটি কাব্যধারা তিনি আত্মস্থ করেছিলেন উচ্চমার্গীয় আরবি ও ফার্সি সাহিত্য থেকে। বলে রাখা ভালো প্রাচ্যের কবিতায় দিভান তথা দিওয়ান বলতে গজল ও অন্যান্য ঘরানার কাব্য সংকলনকেই বোঝায়।

লোরকা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন স্পিনের ভাষা ও সংস্কৃতির শেকড় গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে আল-আন্দালুস বা মুসলিম স্পেনে।

গজলের ক্লাসিক্যাল গঠনরীতির সঙ্গে লোরকার পরিচয় না থাকলেও আল-আন্দালুসের মুসলিম সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। আল-আন্দালুস বা ইসলামী ইবেরিয়ার গোড়াপত্তন হয়েছিল ৭১১ সালে, উত্তর আফ্রিকার বারবার গোষ্ঠী যখন হিস্পানিয়ার ভিজিগথ এলাকাগুলো দখল করে নিয়েছিল। ইবেরিয়া যখন তার ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান করছিল, তখন পর্তুগাল এবং স্পেনের উত্তরাঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুসলিম শাসন ইবেরিয়ায় স্বর্ণযুগ এনে দিয়েছিল। স্পেন বিজয়ী আরবরা মুর নামে পরিচিত।

সাম্প্রতিককালে বিশ্ব সাহিত্যে বহুল পঠিত ও প্রশংসিত পুয়ের্তো রিকোর কবি ভিক্টর হার্নান্দেজ ক্রুজ ২০১১ সালে প্রকাশিত তার ইন দ্য শ্যাডো অব আল-আন্দালুস কাব্যগ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছেন, ‘মুর-শাসিত আল-আন্দালুস মানব সভ্যতায় এক পরম উন্নতির প্রতীক।’ আল-আন্দালুসের রাজধানী কর্দোভা ইউরোপের অন্যতম প্রগতিশীল শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল, যেখানে মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিরা পরস্পরের সহযোগী ছিল এবং একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করছিল।

স্পেনের লোকসংগীতের ওপর লোরকা তার বক্তৃতায় বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন ‘নিমগ্ন সংগীত’-এর ওপর, যা থেকে উত্সারিত হয়েছিল স্পেনের আন্দালুসিয়ার ফ্লামেংকো গীতনৃত্যকলা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের সংগীত যখন বেদনা ও ভালোবাসার তুঙ্গ স্পর্শ করে, তখন তা সুস্পষ্টভাবেই আরবি ও ফার্সি কবিদের মহান কাব্যরীতির প্রকাশরীতিকে ধারণ করে।’

এটাই সত্য যে কর্দোভা ও গ্রানাডার বাতাসে এখনো সুদূর আরবের নিশানা ও পঙিক্তমালা খুঁজে পাওয়া যাবে এবং মুসলমান শাসনামলের গ্রানাডার আলবাইসিনের অস্পষ্ট পাণ্ডুলিপি থেকে এখনো উঠে আসে বিলুপ্ত এ নগরীগুলোর স্মৃতি।

দিভান দেল তামারিত কাব্যগ্রন্থে লোরকার কবিতা সত্য ও নিমগ্ন সংগীতের ভাবালুতায় নিমগ্ন হয়েছে। তার সময়ের বিদগ্ধ ফ্লামেংকো নৃত্যশিল্পী ও ষাঁড়-লড়িয়েরা এটিকেই বলত ‘দুয়েন্দে’। এটি একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার মানে আবেগ, অভিব্যক্তি ও সত্যের উচ্চমার্গীয় অবস্থা। দুয়েন্দের ওপর লোরকা যখন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, তখন তা একেবারেই স্পেনীয় নান্দনিকতা ও নৈতিকতায় ভাস্বর হয়ে ওঠে। লোরকার এ স্প্যানিশ তত্ত্ব প্রকাশ করে কীভাবে এবং কেন সব ধরনের সাচ্চা ললিতকলা-শিল্প বণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সীমানাকে অতিক্রম করে যায়, এমনকি যখন তা বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক—দুটোই।

বিস্ময়কর কাব্য প্রতিভা লোরকা বিশ্বসাহিত্যে বোধকরি চিরপ্রাসঙ্গিক হয়ে বিরাজ করবেন। তার মতো মহান নাম উচ্চারণ করার সময় খুব স্বাভাবিকভাবেই ‘বিশিষ্ট’, ‘অনন্য’ ইত্যাদি গতানুগতিক শব্দ ব্যবহার করার লোভ সামলাতে পারেন না অনেকেই। বস্তুত আদিখ্যেতা করে এমন প্রশংসা করার প্রলোভন গতানুগতিকতা ও নবধারার ভেতর পার্থক্য নিরূপণকারী সীমারেখা নির্ধারণের তাগিদ জোরালো করে তোলে। যদিও গতানুগতিকতা নিছকই পুনরাবৃত্তি নয়, একইভাবে নবধারা মানে নিছকই নবধারা প্রবর্তন নয়। লোরকা, হাফিজ, আলী-শের নাভই বা ইব্ন হাজেমর মতো মহান প্রতিভাকে মূল্যায়নের সময় এসব বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন।

দৃশ্যত আন্দালুসিয়া-তামারিতের ছবির মতো উেস উদ্যান ও মাঠ, সিয়েরা নাভাদার বরফে ঢাকা পর্বতমালার শিখরে আর আলহামব্রার লাল মিনারে ঘুরে ঘুরে লোরকা তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ দ্য জিপসি ব্যালাড রচনা করেছিলেন। কিন্তু তারপর ১৯২৮ সালে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে না পারার হতাশায় ভুগছিলেন। সে সময়ে এক মন্তব্যে তিনি লিখেছিলেন, ‘আন্দালুসিয়া বিস্ময়জাগানিয়া! এটি হচ্ছে বিষহীন পশ্চিম ও কর্মহীন পূর্ব।’ এখানে ইউরোপে মুরদের শেষ রাজধানীতে তিনি তখন মুসলিম কবিদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। বিমুগ্ধ-বিস্ময়ে ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন হাফিজের প্রেমের তুঙ্গস্পর্শী গজলে। অভিভূত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার কবিতা উড়াল দেয়ার জন্য ডানা মেলেছে!’

এভাবেই অঙ্কুরোদ্গম হয়ে ডানা মেলেছিল লোরকার জীবনের শেষ গ্রন্থ, গজলকাব্য দিভান দেল তামারিত। লোরকার দিভান দেল তামিরাত-এ রয়েছে ১২টি গজল এবং ৯টি কাসিদা। অবশ্যই লোরকা তার দিভানের প্রথাগত অনুশাসনের তোয়াক্কা করেননি। তবে তিনি অবশ্যই কিছু প্রথাগত প্রকাশভঙ্গি অনুসরণ করেছেন, যা অন্যান্য ঘরানার কবিতা থেকে গজল ও কাসিদাকে পৃথক করে দেয়।

যতদূর জানা যায়, কাব্যরীতি হিসেবে গজলের উন্মেষ ঘটেছিল নবম ও দশম শতকে আরবের কবিতায়। আর এটি পূর্ণতা পেয়েছিল বরং বলা যায়, শুদ্ধ হয়ে উঠেছিল হাফিজের কৃতিত্বে, হাফিজের গোলাপ ফোটানো মেধার ছোঁয়ায়। হাফিজ যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার পরই কেবল কড়াকড়ির ঘেরাটোপে আটকে দেয়া হয় গজলের রচনাশৈলী। স্তবক, গঠন, শব্দার্থিক ইত্যাদির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। যেমন—

* বায়েতের সাহায্যে গজল রচনা বা দ্বৈত পঙিক্তর গজল

* ক-ক, খ-ক, গ-ক ইত্যাদি গাঠনিক বিন্যাসে বায়েতের পদ্য রচনা করা

* রাদিফের ব্যবহার, পঙিক্তর শেষে কয়েকটি বা একটি শব্দের   পুনর্ব্যবহার

* তাখাল্লুস বা কবি-নামের সঙ্গে গজল রচয়িতার উপাধি ব্যবহার ইত্যাদি।

গজলের নানা গঠনরীতি বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গজল হচ্ছে মূলত এক ধরনের গীতিকবিতা। এভাবে আমরা যদি গোটা গজল দুনিয়াকে আমলে নিই, তাহলে রীতি হিসেবে এর রূপতত্ত্বটা দাঁড়ায় এ রকম: এক পাশে থাকে ‘আমি’ অর্থাৎ গীতিকবিতার নায়ক বা মুখ্য চরিত্র, অন্য পাশে থাকে ‘তুমি’ বা ‘সে’—প্রেমিকা বা প্রেমিক ও তাদের মাঝে থাকে দয়া, সহানুভূতি, কূটনামি এবং মুখ্য চরিত্রকে প্রস্ফুটিত করে তোলার জন্য আরো অনেক কিছু। প্রায় সব ধ্রুপদ গজলেরই শাঁস বিষয়বস্তু প্রেম।

এবার প্রাচ্যের আদর্শ গজলের কাঠামোর সঙ্গে লোরকার দিভান দেল তামিরাত-এর গজলের তুলনা বিশ্লেষণ করা যাক। লোরকার গজলগুলোর শিরোনামগুলো প্রত্যাশিত প্রেম সম্পর্কে, আশাহীন প্রেম সম্পর্কে, নিজেকে দেখতে না পাওয়া প্রেম সম্পর্কে, তেতো শিকড় সম্পর্কে, অদৃষ্টপূর্ব প্রেম সম্পর্কে এবং এ রকম আরো কয়েকটি।

স্প্যানিশ ভাষায় প্রাজ্ঞ কয়েকজন পণ্ডিত মনে করেন, লোরকা হয়তো মারা যাওয়ার আগে এ কাব্যগ্রন্থের প্রুফ দেখে গেছেন। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের আগেই কবি মারা গেছেন বলে গজল রচনার বিষয়ে লোরকার ধারণাটা জেনে নেয়া খুবই দুরূহ।

‘অদৃষ্টপূর্ব প্রেম সম্পর্কে’ গজলটি একটি মনোরাইম, যার প্রতিটি লাইন শেষ হয়েছে একই শব্দে, স্তবকের বিচারে এটি চারটি চতুষ্পদী স্তবকে বিভক্ত। গজলের রূপতাত্ত্বিক পাঁচটি উপাদানই এতে উপস্থিত। ‘সে’ শব্দটি প্রাথমিকভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে পরোক্ষভাবে উপলব্ধির অসম্ভাব্যতার মাঝ দিয়ে, নঞার্থকভাবে—অন্যরা যা উপলব্ধি করতে পারে: (প্রথম স্তবক) তার সুন্দর শরীর (একটি পেট, দাঁত, একটি কপাল, যার জ্যোত্স্না রাতে পারস্যের হাজার হাজার ঘোড়সওয়ারি ঘুমিয়ে পড়ে)। এখানে মনোনিবেশ করা উচিত রঙ মেশানোর মিটমিটে গঠনের দিকে, যা বাস্তব ও বৈপরীত্যের লুকানো বোধে: অন্ধকার—একটি পেট, একটি প্রেমের উড়ন-অক্ষমতা—একটি দাঁত, চাঁদের আলোয় একটি চত্বর—একটি  কপাল এবং অন্যান্য।

দ্বিতীয় স্তবকটি অব্যাহত থাকে এক ধরনের ওয়াসফ্-এ—প্রেমিক বা প্রেমিকার বর্ণনা—একই সময়ে তাকে গীতিকবিতার প্রেমিকের সঙ্গে যোগসূত্রে বেঁধে দেয়, তবু এই চিত্র দ্ব্যর্থকতার কারণেই (পারস্যের এক হাজার ঘোড়সওয়ার চত্বরে ঘুমায় তোমার কপালের চাঁদ সঙ্গে নিয়ে) বিপরীত ‘স্বপ্ন-বাস্তবতা’র মাঝ দিয়ে এটিকে বাস্তব ও কাল্পনিক উভয়ভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। ‘চার রাত’—‘বরফের প্রতিপক্ষ’-এর তুলনার মাঝ দিয়ে সত্যের এক অনুপুঙ্খ বর্ণনা—একটি কোমর—এক হাতে পেটের ম্যাগনোলিয়ার অন্ধকারের সঙ্গে এক হাজার পারস্যবাসীকে বাস্তব করে তোলে এবং তাদের এই যোগ দেয়াকে একটি স্বপ্নে পরিণত করা হয়, যখন অন্য হাতে ওই একই দ্ব্যর্থকতাকে প্রেম সময়হীনতার সঙ্গে ‘চার রাত’কে জুড়ে দেয়া হয়।

লোরকার গজল রচনাশৈলী সমান্তরাল বৈপরীত্যে ভাস্বর এবং এ বৈপরীত্য লোরকা যথার্থ দক্ষতার সঙ্গেই প্রতিভাত করে তুলেছেন।

 

মনজুর শামস: লেখক ও অনুবাদক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন