বৃহস্পতিবার| ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০| ১৪ফাল্গুন১৪২৬

সিল্করুট

উপমহাদেশীয় সংগীতে গজলের ইতিহাস ও শিল্পরূপ

আলি আদনান, অনুবাদ: মুহাম্মাদ হাসান রাহফি

গজল তার জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে ১৫ শতকের বেশি সময় ধরে। গজল একই সঙ্গে কবিতা ও সংগীত হিসেবে এ উপমহাদেশে বিকশিত হয়েছে। উর্দু ও ফারসি ভাষায় কবিতার ধরন হিসেবে গজল সবচেয়ে জনপ্রিয়। গজল একই সঙ্গে সংগীতেরও অন্যতম জনপ্রিয় ধারা। গজলের গোড়াপত্তন সপ্তম শতাব্দীতে আরবের মাটিতে হলেও ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ফারসি কবি রুমি ও হাফিজের রচনার মধ্য দিয়ে এ কাব্যধারা বিকশিত হয়। ভারতীয় কবিরাও উর্দু ও ফারসি ভাষায় ব্যাপকভাবে গজল চর্চা শুরু করেন। 
ভারতে গজল সংগীতের চর্চা শুরু করেন হজরত আমির খসরু। ভারতীয় সংগীতে একটি স্বতন্ত্র গঠনরীতি আছে, যাকে বলা হয় ‘বান্দিশ’। এটি পাকিস্তান ও উত্তর ভারতের সংগীত ধারা হিসেবে পরিচিত। বান্দিশের একটি নির্দিষ্ট রাগ ও তাল আছে। বান্দিশের প্রথম ভাগকে বলা হয় ‘আস্থাই’ এবং দ্বিতীয় ভাগকে বলা হয় ‘অন্তরা’। গজলে মাতলা গাওয়া হয় আস্থাই হিসেবে এবং বাকি শ্লোক অন্তরা হিসেবে। এ আয়োজন গায়কদের গজল গাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা করে দেয়। গজলের রাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা একজন গায়ককে তার গানের মাধ্যমে আবেগ প্রকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গজলের রাগগুলো পরিচিত ভৈরবী, কাফি, খাম্মাজ, পাহারি ও পিলু নামে। গজলের ছন্দময় চক্র প্রায় সবসময় ছয়, সাত ও আট তালে সীমাবদ্ধ থাকে, যা মূলত দাদরা, রুপাক ও কেহেরবা নামে পরিচিত। সপ্তম তাল সময়-চক্রের চর্চা মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সময় অনেক বেশি জনপ্রিয়তা পায়, ফলে রুপাক তালটি পরবর্তীতে মোগলাই নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করে। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর রচিত কবিতা গজল হিসেবে রুপাক তালে পরিবেশিত হতো।
মেহের আফরোজ ও নুসরাত খাতুন প্রথম গজল সংগীতশিল্পী হিসেবে গজল রেকর্ড করেন। এ দুজন জনপ্রিয় গজল সংগীতশিল্পী খিলজি দরবারে আমির খসরুর রচনা করা গজল পরিবেশন করতেন। খিলজি সুলতানিয়াতের দ্বিতীয় শাসক সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির দুই দশকের শাসনামলে এ গজলের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। হিন্দুস্তানি সংগীতে গজলের অন্তর্ভুক্তি হয় উনিশ শতকের প্রারম্ভে। সংগীত ধারায় গজলের অন্তর্ভুক্তি আরো চারটি বিষয়কে এ উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করে—
* পার্সি থিয়েটারের গোড়াপত্তন
* লক্ষেৗ দরবারের জনপ্রিয়তা  
* উঁচুতলার নর্তকীদের জীবন ব্যবস্থার পরিবর্তন
* রেকর্ডিং সংস্থাগুলোর আবির্ভাব
১৮৫৩ থেকে ১৮৬৯ সাল সময়কালে ভারতের পার্সিরা ২০টির বেশি নাট্য সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এগুলোর মধ্যে পার্সি নাটক মণ্ডলী, জরোথুস্ত্রিয়ান থিয়েট্রিক্যাল ক্লাব, ভিক্টোরিয়া নাটক মণ্ডলী, নাটক উত্তেজক কোম্পানি, ইমপ্রেস ভিক্টোরিয়া থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানি ও আলফ্রেড নাটক মণ্ডলী জনপ্রিয় ছিল। তারা প্রাথমিকভাবে উর্দু, হিন্দুস্তানি, গুজরাটি ও ইংরেজি—এ চারটি ভাষায় নাটক রচনা করত। সংগীত পার্সি থিয়েটারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল এবং গজল ছিল নাট্য সংস্থাগুলোর সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পার্সি থিয়েটারের জনপ্রিয়তা গজলের জনপ্রিয়তা তৈরিতে সরাসরি অবদান রেখেছে। নাট্য সংস্থাগুলোর সাফল্য আঞ্চলিক ভাষায় নাট্য মঞ্চের উন্নয়নে কাজ করে, বিশেষত আধুনিক গুজরাটি থিয়েটার, মারাঠি থিয়েটার ও হিন্দি থিয়েটার, পরবর্তী সময়ে হিন্দি চলচ্চিত্রের বিকাশে ভূমিকা রাখে। অনেক বছর গজল ভারতীয় থিয়েটার এবং সিনেমা উভয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছিল। 
নওয়াব ওয়াজিদ আলী শাহ ছিলেন অওধের দশম ও সর্বশেষ নওয়াব। তিনি তত্কালীন সময়ে শিল্পের একজন পৃষ্ঠপোষক বলেই পরিচিত ছিলেন। তিনি নিজে ছিলেন একজন কবি, নাট্যকার, নির্দেশক ও নৃত্যশিল্পী। তিনি দুটি কবিতার সংকলন বের করেছিলেন হুসেন-ই-আখতার ও দিওয়ান-ই-আখতার নামে। সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল আখতার পিয়া ছদ্মনামে। তার রচনা অওধসহ ভারতের আরো কিছু অংশে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। কত্থক নৃত্য ছিল তার ব্যক্তিগত পছন্দের। কত্থক উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ছিল নাচের একটি সাধারণ রীতি। বিন্দাদিন ও কলকা প্রসাদ মহারাজ তখনো এ নাচের ধারাটিকে পূর্ণাঙ্গ নৃত্যের শাখায় রূপান্তর করেননি। কত্থকের দুটি ধরন তোড়া ও টুকরা প্রাথমিকভাবে গল্প বলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। নাচটি নান্দনিকভাবে উচ্চমার্গীয় ও মার্জিত ছিল এবং জটিল ছিল না। নওয়াব ওয়াজিদ আলী শাহ কত্থকের সঙ্গে গজলের মিশ্রণের মাধ্যমে এ নাচের ধরনকে উন্নত করেন। তার রচিত গজলে কত্থক পরিবেশন করতেন নর্তকীরা। দরবারের সংগীতশিল্পী সানাদ পিয়া ও কাদির পিয়া কত্থকের জন্য শখানেকের বেশি বান্দিশ কি ঠুমরি ও গজল রচনা করেন। গজল হয়ে ওঠে কত্থকের পরিপূরক আর লক্ষেৗয়ের দরবার তার আঁতুড়ঘর।
উনিশ শতকে গ্রামোফোন এবং ফোনোগ্রাফের আবির্ভাবের ফলে ঘরে ঘরে সংগীত পৌঁছে গিয়েছিল। সর্বোচ্চ ৩ মিনিট গান রেকর্ড করা যেত এবং এক্ষেত্রে গজল অন্যান্য ধ্রুপদী সংগীত ধারাগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম সংগীত ধারা হিসেবে বিবেচিত হতো। সেক্ষেত্রে বলা যেতেই পারে গ্রামোফোন এবং ফোনোগ্রাফের প্রচলনের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে গজল সংগীত।
ভারতীয় সংগীত প্রথম রেকর্ড করা হয় লন্ডনে ১৮৯৮ ও ১৮৯৯ সালে। ৭ ইঞ্চি সিঙ্গেল সাইড ডিস্কে রেকর্ড করেছিলেন ফ্রেডেরিক উইলিয়াম গিজবার্গ।
লন্ডন রেকর্ডিংসের ব্যানারে কিংবদন্তি মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব, হাফিজ সিরাজি ও জহির ফারিয়াবির গজল প্রথম প্রকাশ করা হয়।
ফ্রেডেরিক উইলিয়াম গিজবার্গ ১৯০২ সালে জর্জ ডিলনাটের সঙ্গে ভারতে আসেন। তারা ২১৬ সাত ইঞ্চি ওয়াক্স ম্যাট্রিসেস এবং ৩৩৬ সাত ইঞ্চি ওয়াক্স ম্যাট্রিসেস ডিস্ক রেকর্ড করেন কলকাতায়। সে সময়ে রেকর্ডিংয়ে প্রচুর গজল ছিল। গওহর জান ১৯০২ সালের ২ নভেম্বর রাগ জোগিয়া রেকর্ড করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি ভারতে রেকর্ড হওয়া প্রথম শিল্পীতে পরিণত হন। তার রেকর্ডগুলো খুব দ্রুত ভারত এবং অন্যান্য অনেক দেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তার পাঁচটি গজল ছিল সে সময়ের সবচেয়ে বড় হিট।
অভিনয় গজল গানের অপরিহার্য একটি অঙ্গ। পারফরম্যান্স আর্ট বিষয়ে টিকে থাকা প্রাচীনতম ভারতীয় রচনা ভারত মুনি’র নাট্য শাস্ত্র অভিনয়কে চারটি ভাগে ভাগ করেছে—আঙ্গিক অভিনয়, বাচিক অভিনয়, আহার্য অভিনয় ও সাত্বিক অভিনয়। গজলের বিভিন্ন ভাগ বোঝার জন্য অভিনয়ের এ চারটি বিভাগ অপরিহার্য।    
গজল দক্ষিণ এশিয়ার কবিতা ও সংগীতের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ধরন। এটিকে বিভিন্নভাবে পরিবেশন করেন এর অগণিত শিল্পীরা।
গজলের প্রধান ধরনগুলো হলো— 

  • পার্সি থিয়েটার স্টাইল
  • ঠুমরী স্টাইল
  • রাগ ঘরানার গজল স্টাইল
  • গীত স্টাইল
  • মুজরা স্টাইল
  • কাওয়ালি স্টাইল
  • বাতারান্নুম মুশায়েরা স্টাইল


ভারত ও পাকিস্তানে অনেক স্বনামধন্য গজল শিল্পীদের আবির্ভাব হয়েছে। এ শিল্পীদের চার ভাগে বিভক্ত করা যায়—
অগ্রদূত: আখতারি বাই ফাইজাবাদি, উস্তাদ বারকাত আলী খান, গওহর জান, ইনায়েত বাই ধিরু ওয়ালি, যুঁথিকা রয়, কামলা ঝারিয়া, কুন্দন লাল সাইগাল, মালিকা পোখরাজ, মাস্টার মদন ও মুখতার বেগম।
গুরু: আশা ভোঁসলে, সিএইচ আতমা, কাজ্জান বেগম, কানন দেবী, খুরশিদ বানো, লতা মুঙ্গেস্কর, মুহাম্মাদ রফি, মুনির হুসেন, মুন্নাওয়ার সুলতানা, নাসিম বেগম, নূরজাহান, পংকজ মালিক, রাজকুমারী, সালিম রাজা, তালাত মাহমুদ ও জাহিদা পারভিন।

তারকা: আবিদা পারভিন, আমজাদ পারভেজ, আসাদ আমানাত আলী খান, ওস্তাদ আমানাত আলী খান, বিলকিস খানম, এজাজ হুসেন হাজারভি, এজাজ কায়সার, ফরিদা খানম, ফিদা হুসেন, গুলাম আব্বাস, গুলাম আলী হাবিব, ওয়ালি মুহাম্মাদ, হামিদ আলী খান, হুসেন বক্স বুল্লো, ইকবাল বানো, মেহেদি হাসান, মেহনাজ, মুন্নি বেগম, নাহিদ আখতার, নায়ারা নূর, পারভেজ মেহেদি, রুনা লায়লা, শাহিদা পারভিন, শওকত আলী, তাহিরা সাইদ, তাসাউর খানম ও তিনা সানি।
আধুনিক: আহমাদ হুসেন, অনুপ জালোটা, ভুপিনদর সিং, ছায়া গাঙ্গুলী, চিত্রা সিং, ফারিহা পারভেজ, হরিহরণ, জগজিৎ সিং, মিতালী সিং, মুহাম্মাদ হুসেন, নুসরাত ফতেহ আলী খান, পঙ্কজ উদাস, রাহাত ফতেহ আলী খান ও তালাত আজিজ।
গজল সংগীতের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য গায়করা হলেন ওস্তাদ বরকত আলী খান, মালিকা পোখরাজ, আখতারি বাই ফাইজাবাদি, নূরজাহান, মেহেদি হাসান, ফরিদা খানম, ইকবাল বানো, গুলাম আলী, মুন্নি বেগম, জগজিৎ সিং, নুসরাত ফতেহ আলী খান ও নায়ারা নূর।
গজলের ইতিহাস ১ হাজার ৫০০ বছরের এবং উর্দু কবিতার অন্যতম অংশ। গজল একটি অভিনয়নির্ভর কাব্যিক রীতি এবং তখনই এটি উপভোগ করা যায়, যখন এর মধ্যে দক্ষতা, অনুভূতি, বোঝাপড়া এবং জ্ঞান স্থান পায়। ১ হাজার ৫০০ বছরেও গজলের জনপ্রিয়তা এতটুকুও কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে গজলের বিবর্তন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কবিতা ও সংগীতের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধারা হিসেবে গজল টিকে থাকবে।


আলি আদনান: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইতিহাস-সংস্কৃতি বিষয়ক লেখক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন