শনিবার| ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০| ৯ফাল্গুন১৪২৬

প্রথম পাতা

একের পর এক দুর্ঘটনা

রেলকর্মীদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

শামীম রাহমান

সিলেট থেকে ঢাকায় আসার পথে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় দুর্ঘটনায় পড়ে আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস। গত বছরের ২৩ জুনের ওই দুর্ঘটনায় চারজন নিহত অন্তত ৬৪ জন আহত হয়। দুর্ঘটনার পর রেলওয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে রেলকর্মীদের অদক্ষতার কথা।

কুলাউড়া দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরো বড় দুর্ঘটনা ঘটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। গত ১২ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী তূর্ণা-নিশীথার সঙ্গে সিলেট থেকে চট্টগ্রামের দিকে যাওয়া উদয়ন এক্সপ্রেসের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১৫ ট্রেনযাত্রী। পরে মারা যান আরো দুজন। আহত হন শতাধিক। দুর্ঘটনার জন্য তূর্ণা-নিশীথার দুই চালক (লোকোমাস্টার) গার্ডকে (পরিচালক) দায়ী করা হয়েছে রেলের তদন্ত প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, প্রতি বছর যত ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে, তার ৭২ শতাংশই হয় মানব ভুলে। সিংহভাগ দুর্ঘটনা মানবসৃষ্ট হওয়ায় রেলকর্মীদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। রেলওয়ের কর্মকর্তারাও বলছেন, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ রেলকর্মীদের দক্ষতায় ঘাটতি।

২০১৯ সালে সব মিলিয়ে ১২৯টি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে দেশে। এসব দুর্ঘটনায় ৩৯ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি দেড় শতাধিক নিহত হয়। এর মধ্যে ১৮ জন লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে বলে দাবি রেলওয়ের। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ঘটেছে লাইনচ্যুতির ঘটনা।

রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানির কথা বললেও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। এআরআইয়ের হিসাবে গত বছর (২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত) লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২১৭টি। আর এসব দুর্ঘটনায় ২৩৯ জন নিহত ৪৭০ জন আহত হয়েছে। তবে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার দায় রেলওয়ের নয় বলে দাবি করে থাকেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

কুলাউড়ায় উপবন এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে রেলপথ যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ার কথা বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, সেখানে রেলপথটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন দুজন কর্মী। তারা ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল এবং জেনারেল অ্যান্ড সাবসিডিয়ারি রুল অনুযায়ী রেলপথটি সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রতিবেদনের সুপারিশে ট্র্যাক (রেল লাইন) কোচ রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের কথাও বলা হয়।

রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক . সামছুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্বব্যাংক এডিবির সুপারিশে নব্বইয়ের দশকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে রেলে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই হয়। ওই সময় যেসব কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়, তাদের বেশির ভাগই ছিলেন কারিগরিভাবে বেশ দক্ষ। পরবর্তী সময়ে সেই দক্ষ জনবলের ঘাটতি আর পুষিয়ে উঠতে পারেনি রেলওয়ে। নতুন জনবল এলেও তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতি, কর্মীদের প্রয়োজনীয় নজরদারি জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে রেলকর্মীদের দক্ষতায় বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। রেল দুর্ঘটনা কমানো সংস্থাটি লাভজনক করতে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি শূন্য থাকা কারিগরি পদগুলো দ্রুত পূরণের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন অধ্যাপক সামছুল হক। 

রেলকর্মীদের দক্ষতার ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামানও। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, গত বছর ট্রেন দুর্ঘটনা আগের দুই বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি হয়েছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর পরই আমরা কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করি এবং কমিটি যেসব সুপারিশ করে, সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করি।

তিনি আরো বলেন, মানবসৃষ্ট ভুলে ট্রেন দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। এজন্য প্রধানত দায়ী আমাদের জনবলস্বল্পতা। রেলপথ সুরক্ষিত রাখার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় জনবল নেই। স্টেশন মাস্টারের অভাবে অনেকগুলো স্টেশন বন্ধ। ট্রেন পরিচালনার জন্যও পর্যাপ্ত জনবল আমাদের নেই। দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণও জরুরি বলে মত দেন তিনি।

প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ট্রেনচালকদের প্রশিক্ষণের জন্য কিছুদিন আগেই অত্যাধুনিক সিমুলেটর উদ্বোধন করা হয়েছে। দক্ষতা বাড়াতে মাঠ পর্যায়সহ সর্বস্তরের কর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, চলতি বছরই এসব উদ্যোগের মাধ্যমে রেল দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন