শনিবার| ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০| ৯ফাল্গুন১৪২৬

সাক্ষাৎকার

ট্রাস্ট ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অর্জন করপোরেট গভর্ন্যান্স

ফারুক মঈনউদ্দীন ২০১৮ সালের শুরু থেকে দায়িত্ব পালন করছেন ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে। ব্যাংকিংয়ের বাইরে লেখক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। অর্থনীতি, ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার, সাহিত্য, ভ্রমণসহ বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন ২০টির মতো বই। ট্রাস্ট ব্যাংকসহ দেশের অর্থনীতি ব্যাংকিং খাতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাছান আদনান

২১তম বর্ষে পদার্পণ করল ট্রাস্ট ব্যাংক। দুই দশকের পথচলা কেমন ছিল?

ট্রাস্ট ব্যাংকের যাত্রা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। দুই দশকে দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম সারির ব্যাংক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে ট্রাস্ট ব্যাংক। ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো করপোরেট গভর্ন্যান্স। ব্যাংকিংয়ের সব রীতি-নীতি পরিপালন করেই ট্রাস্ট ব্যাংক পথ চলছে। করপোরেট, এসএমই রিটেইল ব্যাংকিংয়ে সমান গুরুত্ব দিয়ে আমরা সামনে এগোচ্ছি। পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণেও জোর দেয়া হচ্ছে। ২০১৯ সাল শেষে ট্রাস্ট ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানত ছিল ২৪ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। একই সময়ে ২১ হাজার ৭৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ১১২টি শাখা এসএমই সেন্টারের মাধ্যমে ট্রাস্ট ব্যাংক সারা দেশে বিস্তৃতি লাভ করেছে। ২২২টি এটিএম বুথ, ২০ হাজারের বেশি পে-পয়েন্টের মাধ্যমে আমরা গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছি। ডিজিটাল আধুনিক ব্যাংকিংয়ের প্রায় সব সেবাই ট্রাস্ট ব্যাংক চালু করেছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠার ২০ বছরে ট্রাস্ট ব্যাংক দেশের মানুষের হূদয়ে স্থান করে নিতে পেরেছে। তবে মুহূর্তে সম্প্রসারণের তুলনায় ভিত মজবুতের দিকেই আমরা সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছি।

ট্রাস্ট ব্যাংকের শক্তির জায়গা কোনটি?

ট্রাস্ট ব্যাংকের শক্তিমত্তার জায়গা হলো এটিআর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। ফলে ব্যাংকের কোনো ব্যক্তিমালিকানা নেই। পদাধিকারবলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ট্রাস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান। অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল ভাইস চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার র্যাংকের সেনা কর্মকর্তারা ব্যাংকের পরিচালক মনোনীত হন। এটিই ট্রাস্ট ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা।

ট্রাস্ট ব্যাংকের মালিকানা সেনাবাহিনীর হওয়ার কারণে ব্যাংক সেনাসদস্য তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিপুল আমানত পায়। ব্যাংকের মাধ্যমে সেনাসদস্যদের বেতন-ভাতা পরিশোধ হয়। এছাড়া সেনাবাহিনী পরিচালিত বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ট্রাস্ট ব্যাংকে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে বিভিন্নভাবে সাবসিডিয়ারিও প্রদান করা হয়। কেননা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা বড় অংকের ফান্ড পাই। ফলে অন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মতো ট্রাস্ট ব্যাংককে আমানতের জন্য দৌড়াতে হয় না। একটি ব্যাংকের জন্য এটি অনেক বড় সুবিধা।

এছাড়া ব্যক্তিমালিক না থাকায় ট্রাস্ট ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন কার্যকরভাবে পরিপালন করা যায়। অনৈতিক কোনো তদবির পরিচালনা পর্ষদ থেকে হয় না। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও আমাদের কাছে কোনো চাপ নেই। ফলে ব্যাংক পরিচালনায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ স্বাধীন।

এতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হওয়ার পরও ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রায় ১০ শতাংশ ঋণই খেলাপি। এটি কেন হলো?

গ্রাহক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৮-পরবর্তী সময়ে পুরো ব্যাংকিং খাতই বড় ধরনের দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে। ওই সময় অনেক ব্যাংকারই ভুল সিদ্ধান্তের কারণে হাত পুড়িয়েছেন। ট্রাস্ট ব্যাংকও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। ব্যাংকের সব খেলাপি ঋণই যে পাশ কাটানো যেত, তা- নয়। ভালো ব্যবসায়ীদের একসময় আমরাও ঋণ দিয়েছি। তবে ট্রাস্ট ব্যাংকে যোগদানের পর আমি দেখলাম, এমন কিছু গ্রাহককে ঋণ দেয়া হয়েছে, যাদের অন্য ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে আমি ঋণ দিইনি। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর পরিচালনা পর্ষদের পূর্ণ আস্থার সুবিচার করতে না পারার কারণেই কিছু মন্দ ঋণ তৈরি হয়েছে। তবে এখন ট্রাস্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ঋণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জামানতে জোর দিয়েছে। এজন্য জামানত ছাড়া পরিচালনা পর্ষদ কোনো ঋণ অনুমোদন দিচ্ছে না। এর আগে বিতরণ করা যেসব ঋণের জামানত পর্যাপ্ত নয়, সেগুলোর জামানতও নিশ্চিত করা হচ্ছে।

বড় খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?

ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে আমরা আইনি পদক্ষেপে জোর দিচ্ছি। তবে বড় গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে মামলাই সমাধান নয়। কেননা আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে মামলা ঝুলে যাচ্ছে। মামলা না করে বুঝিয়ে-শুনিয়ে টাকা আদায়ের পথও উন্মুক্ত রেখেছি। ঋণখেলাপিদের অবারিত ছাড় দিয়ে পুনঃতফসিল করা ভালো প্র্যাকটিস নয়। এজন্য আমরা নগদ আদায়ে বেশি জোর দিচ্ছি।

ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রডাক্টে বৈচিত্র্য কেমন?

ট্রাস্ট ব্যাংক দেশের অন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মতোই একটি প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর যেসব প্রডাক্ট রয়েছে, সেগুলো ট্রাস্ট ব্যাংকেও আছে। আমরা সব ব্যাংকিং সেবায় সমান গুরুত্ব দিয়ে ব্যালান্সশিটে ভারসাম্য আনছি। করপোরেট, এসএমই, রিটেইল ব্যাংকিং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকিংয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। টি-ক্যাশ নামে আমরা একটি মোবাইল ব্যাংকিং সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন পেয়েছি। সেলফোন অপারেটর রবির সঙ্গে যৌথ মালিকানায় কোম্পানিটি তৈরি হচ্ছে। এতে ট্রাস্ট ব্যাংকের মালিকানা থাকছে ৫১ শতাংশ। বাকি অংশের মালিকানা রবির। এছাড়া ট্রাস্ট ব্যাংকের সব সেবাকে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার জন্য একটি অ্যাপ উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে।

মানি মার্কেটের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

আমাদের দেশের মানি মার্কেট পরিপক্ব নয়। দেশের সব উদ্যোক্তাই ব্যাংকমুখী। ফলে ব্যাংকগুলোর কর্মকাণ্ড ঋণ বিতরণসহ গতানুগতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ। মানি মার্কেটের নতুন কোনো প্রডাক্টের বিকাশ হচ্ছে না। আমাদের বন্ড মার্কেটের যাত্রাই হয়নি। নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। যদিও বাস্তবায়ন শূন্যের কোঠায়। বন্ড মার্কেট তৈরি হলে মানি মার্কেট চাঙ্গা হতো। বাজারে বৈচিত্র্য আনার জন্য সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জে কমিশনসহ অন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু কেন এটি হচ্ছে না তা আমার বোধগম্য নয়।

ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিচ্ছে। শিল্প খাতে ঋণ দেয়া ব্যাংকের কাজ নয়। কিন্তু মানি মার্কেটের অপরিপক্বতার কারণেই ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে দেশের সব ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে বড় ধরনের মিসম্যাচ আছে। বড় ধরনের অসামঞ্জস্যতা নিয়েই ব্যাংকগুলো পথ চলছে।

মানি মার্কেটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুঁজিবাজারেও বিপর্যয় চলছে। বিপর্যয় থেকে উত্তরণের উপায় কী?

আমাদের দেশে পুঁজিবাজার নেই বললেই চলে। যেটুকু আছে সেটিও বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত। কেন এমনটি হচ্ছে, তার কোনো ব্যাখ্যাও আমার কাছে নেই। ব্যাংকের সুদহার নয় ছয় করার পক্ষে যারা কাজ করছে, তাদের একটি যুক্ত হলো ব্যাংক ঋণ দেয়া কমালে উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারে যেতে বাধ্য হবেন। কিন্তু যুক্তি কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ দেশের বড় করপোরেটগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। সরকার এক্ষেত্রে আইন করতে পারে, কোনো কোম্পানির টার্নওভার এত হলে বাধ্যতামূলকভাবে পুঁজিবাজারে যেতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়লে পুুঁজিবাজার কিছুটা হলেও সুস্থ হবে।

ব্যাংকিং খাত নিয়ে আপনার আশাবাদ কী?

দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি, এটি আমি অনেকদিন আগে থেকেই বলে আসছি। তবে আশাবাদের কথা হচ্ছে, যত দিন যাচ্ছে আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো করপোরেট সুশাসন নিশ্চিতের জন্য তত বেশি জোর দিচ্ছে। আমরা যদি ব্যাংকিং খাতে ব্যাসেল- পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য ভালো হবে। তবে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হলে সুশাসন নিশ্চিত করা যায় না। আরেকটি আশাবাদ হলো, প্রযুক্তির উত্কর্ষের ফলে ব্যাংকগুলোর বিকল্প ডেলিভারি চ্যানেল তৈরি হচ্ছে। গ্রাহকরা ভবিষ্যতে টাকা তোলা বা জমা দেয়ার জন্য ব্যাংকে যাবেন না। ব্যাংকগুলোর নতুন শাখা খোলারও দরকার হবে না। ফলে ব্যাংকাররা বাধ্য হয়ে মৌলিক কাজে গুরুত্ব দেবেন। একই সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিতে মনোযোগী হবেন।

দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী দেখছেন?

দেশের অর্থনীতির যেসব ইতিবাচক দিক ছিল, তা ২০১৯ সালের শেষের দিকে কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। আমদানি-রফতানি কমে যাওয়া, শিল্পঋণ কমা কিংবা খাতে কাঁচামাল আমদানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি শুভ লক্ষণ নয়। এসব নেতিবাচক সূচকের ফলাফল এক-দুই বছর পর দেখা যাবে। শিল্পায়ন ব্যাহত হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। তবে আশার কথা হলো, সরকারি উদ্যোগে বেশকিছু মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নাধীন আছে। এগুলো যথাসময়ে চালু হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফলাফল দেখা যেতে পারে।

২১তম বর্ষে পদার্পণ করা ট্রাস্ট ব্যাংক নিয়ে আপনার বিশেষ পরিকল্পনা কী?

সম্প্রসারণের তুলনায় ২১তম বর্ষে আমরা ট্রাস্ট ব্যাংকের ভিত মজবুতে বেশি জোর দিচ্ছি। খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছি। নতুন ঋণ বিতরণে আরো বেশি সতর্ক হয়েছি, যাতে নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি না হয়। ঋণের ক্ষেত্রে জামানতের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এর কিছু ভালো ফলও পাচ্ছি। এটি করতে গিয়ে ব্যাংকের ব্যবসা কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে। তার পরও আমরা ব্যাংকের শক্তিমত্তা বাড়ানোতেই মনোযোগ রাখতে চাই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন