শুক্রবার | সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ | ৯ আশ্বিন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

সাক্ষাৎকার

ব্র্যাক যেন তরুণদের প্রিয় সংগঠন হতে পারে

আসিফ সালেহ


[গতকালের পর]

ব্র্যাকের বর্তমান চ্যালেঞ্জ কী বলে আপনি মনে করেন?
বাংলাদেশ ছাড়া ব্র্যাক বিশ্বের প্রায় ১২টি দেশে কাজ করছে। কিন্তু সেখানে কাজ করা আরো চ্যালেঞ্জিং। ব্র্যাক বাংলাদেশ সফলতা পেয়েছে সত্য; কিন্তু ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল এখনো নতুন। ২০০২ সালে শুরু হয়েছে ব্র্যাকের প্রথম আন্তর্জাতিক কার্যক্রম। কিন্তু সেসব দেশে জটিলতা বেশি। বাংলাদেশী সংস্থার বাংলাদেশে কাজ করার সুবিধা অনেক। আফগানিস্তান বা উগান্ডায় কাজ করার অনেক অসুবিধা আছে। সেক্ষেত্রে ১৮ বছর তার জন্য বেশি নয়। তার পরও আমি বলব, অন্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আমরা ভালো করছি। এর একটি কারণ হলো আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিছু সংস্কৃতি বা মূল্যবোধের চর্চা করি। আরেকটি কারণ হলো আমরা এমন জায়গায় যাই, যেখানে কেউ যেতে চায় না।

বিদ্যমান উন্নয়নে দুটি চিন্তাধারা বিরাজমান। একটি পশ্চিমা এনজিও দ্বারা প্রভাবিত। পশ্চিমা এনজিওগুলোর অ্যাপ্রোচ গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রাধান্য পেয়েছে। সেটি হলো তাদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা আছে—‘আমরা ভালো জানি কীভাবে সমস্যার সমাধান করতে হয়। আমরা অর্থ দেব এবং ফর্মুলা নিয়ে আসব। তোমরা শুধু কপি করবে।তারা বেশি বোঝে রকম একটি ভাবভঙ্গি তাদের মধ্যে আছে। অন্যটি হলো দক্ষিণ গোলার্ধের এনজিওগুলোর অ্যাপ্রোচ। তার মানে সমস্যার কাছে থাকা এনজিওগুলোর অ্যাপ্রোচ। বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানে মাটির খুব কাছাকাছি থাকা এনজিওগুলো জানবে কোন ধরনের চিন্তা ভালো কাজ করবে। সেই চিন্তা থেকে দ্বিতীয় অ্যাপ্রোচের উন্নয়ন ঘটেছে। দক্ষিণ গোলার্ধের ছোট এনজিওগুলোর চিন্তা-অ্যাপ্রোচ উন্নয়ন ডিসকোর্সে ভাষাগত সমস্যা, আর্থিক সমস্যা প্রভৃতির কারণে ভালোভাবে জায়গা করে নেয়ার সুযোগ পায়নি। যেজন্য পশ্চিমা এনজিওগুলো উন্নয়ন ডিসকোর্সে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। ব্র্যাক সেটা চ্যালেঞ্জ করছে। আমাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ছে। দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে একটি এনজিও বাংলাদেশে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কাজ করছে এবং আরো বিশালতার উচ্চ বাসনা পোষণ করছে। আমরা এখন সারা বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের সমস্যার সমাধান করছি, করব এবং আমরা পশ্চিমের মতো ব্যয়বহুল সমাধানে যাব না। আমরা কাজটি করব উদ্ভাবনী পন্থায়। সামাজিক পুঁজিকে (সোস্যাল ক্যাপিটাল) নিয়ে জনগোষ্ঠীমুখী সমাধানে আমরা এগোব। এটিই টেকসই সাশ্রয়ী পথ।

অর্থায়ন ব্র্যাকের জন্য আগামীতে আরো চ্যালেঞ্জিং হবে। সেটা কীভাবে মোকাবেলা করবেন?
২০২৪ সালে টেকসইভাবে উন্নয়নশীল দেশে এবং ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে বাংলাদেশের এনজিওগুলোর বিদেশী দাতাদের অর্থপ্রাপ্তি কঠিন হবে। আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ, ফিন্যান্সিয়াল ডাইভারসিফিকেশন। এটা খুব জরুরি। আমাদের অর্থায়ন বিদেশী গ্র্যান্টনির্ভর ছিল। সেখান থেকে আমরা   কয়েক বছরে নির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়েছি। এখন আমাদের কর্মসূচিগুলোর ৭০ শতাংশ বাজেট   ব্র্যাকের নিজস্ব সাশ্রয়ী অর্থে হয়। এটা এখন ৯০ শতাংশে নিতে চাই আগামী দিনগুলোয়। সেক্ষেত্রে আমরা আগেও অনেক মডেল তৈরি করেছি। এখনো নতুন সোস্যাল এন্টারপ্রাইজ মডেল তৈরি করছি। বাংলাদেশে এখন মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত পণ্য সার্ভিস চায়। সেক্ষেত্রে আমরা এমন মডেল তৈরি করছি, যেখানে কিছুটা আমরা সাবসিডাইজড করব, কিছু ডোনার ফান্ডিং আসবে, কিছু আমাদের জনসাধারণ কন্ট্রিবিউট করবে। মোদ্দাকথা, বিভিন্ন ধরনের মডেলে আমাদের কাজ করতে হবে। সরকারের সঙ্গেও কাজ করতে হবে। বাজেট থেকে তার অনেক অর্থ আসছে। সরকারের অর্থায়নেও আমরা কাজ করতে পারি। মাল্টিপল মডেলে আমরা কাজ করব। আগামীতে এটিই হলো আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, ফিন্যান্সিয়াল ডাইভারসিফিকেশনে যেভাবে কাজ করা হচ্ছে তা আরো বাড়ানো। অর্থায়নের নতুন নতুন উৎস থেকে অর্থ জোগাড় করা। পাশাপাশি ইনোভেশনের নতুন মডেল তৈরির যে অব্যাহত গবেষণা উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) সংস্কৃতি, সেটি বজায় রাখা।

এসব চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে একজন তরুণ নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দুটি বিষয় উল্লেখ করব। এক. ফজলে হাসান আবেদকে প্রতিস্থাপন (রিপ্লেস) করা সম্ভব নয়। তিনি একজন স্বতন্ত্র মানুষ। তিনি নিজেও জানতেন প্রতিষ্ঠাতা যেভাবে চালাতে পেরেছেন, সেভাবে অন্যরা চালাতে পারবে না। তরুণ নির্বাহী পরিচালক হিসেবে আমি মনে করি, আমরা তার উত্তরাধিকার হিসেবে স্যার আবেদের মূলমন্ত্র-মূল্যবোধ-কর্মকৌশল কীভাবে বুকে ধারণ করতে পারি। কিন্তু আমাদের কর্মকৌশল হয়তো অনেক পরিবর্তন হবে। প্রযুক্তি আসবে। আমরা নতুন নতুন ক্ষেত্রে কাজ করব। ফিন্যান্সিয়াল ডাইভারসিফিকেশন হবে। জায়গাগুলোতে একটা বড় পরিবর্তন আসবে। প্রযুক্তি যেহেতু অনেক আসছে, সেহেতু আমার কাছে মনে হয় নতুন কাজ করে দেখানোর এটি একটি সুযোগও বটে। আমার কাছে আরেকটি বিষয় মনে হয়, সামনে তুলনা আসবে অনেক। তিনি থাকাকালে এভাবে হতো। এখন সেভাবে হয় না কেন। এটি হয়তো অনেকের কাছে তুলনা হিসেবে আসবে। তবে চূড়ান্তভাবে দেখতে হবে যে, মূল্যবোধগুলোয় অবিচল আছে কিনা, লক্ষ্য ঠিক আছে কিনা। কিন্তু কাজের ধরনে অবশ্যই পরিবর্তন আসবে, যেমন এসেছে গত কয়েক বছর।

তরুণ হিসেবে আমার মনে হয়, অভিজ্ঞতা অনেক বড় বিষয়। এখন মনে হয় যে, আমাদের সামষ্টিক নেতৃত্বেও বয়সের বৈচিত্র্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সময় এবং সবকিছু এত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছেনেতা হওয়ার জন্য তরুণ হওয়াটাও কিছু সুবিধাজনক। বিশ্বব্যাপী তরুণ নেতৃত্বের একটা প্রবণতা চলে আসছে। কারণ সময়টা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। আমি নয় বছর আগে ব্র্যাকে যোগ দিই। নয় বছর আগের বাংলাদেশ এবং এখনকার বাংলাদেশে যে গতিতে পরিবর্তন এসেছে, তার আগের নয় বছরের পরিবর্তনটা তার তুলনায় অনেক ধীরে হয়েছে। পরিবর্তনের গতি অনেক বেড়েছে। আগামী দিনগুলোয় আরো বাড়বে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।

আগামী ১০ বা ২০ বছর পর ব্র্যাককে কোথায় দেখতে চান?

আগামী ১০ বছরে আমরা ব্র্যাককে একটি স্থবির সংগঠন হিসেবে দেখতে চাই না, যেটি আমাদের প্রতিষ্ঠাতাও চাইতেন। আমরা দেখতে চাই ব্র্যাক হবে একটি গতিশীল সংস্থা, যেটি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। আকারে বড় হলেও এটি যেন দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। এর সামষ্টিক নেতৃত্ব আছে। এটি কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এখানে নতুন মানদণ্ড তৈরির একটা সংস্কৃতি আছে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ যাতে মনে করতে পারে ব্র্যাক সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান নিয়ে আসতে পারে। সরকার অনেক সময় তা পারে না। কারণ ইনোভেশনের ক্ষেত্রে সরকারের একটা দুর্বলতা আছে। সরকার অনেক বড় এনটিটি, সত্তা। আমলাতন্ত্র আছে। সেক্ষেত্রে আমরা যদি ইনোভেশনগুলো নিয়ে আসতে পারি। সেগুলো যদি আমরা সরকারের কাছে ট্রান্সফার করতে পারি, আমার কাছে মনে হয় সেটি হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য। তবে আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, তরুণদের নিয়ে অনেক বেশি কাজ করব। আমাদের ইয়ুথ ডিভিডেন্ড আর বেশি দিন নেই। ২০৩৩ সাল পর্যন্ত থাকবে। প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি বাড়ানোসহ নানা কারণে এখন তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। আমি মনে করি, তরুণরা যাতে মনে করে ব্র্যাক তাদের সংগঠন। তাদের ধারণাগুলো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাদের জন্য কাজ করে। ব্র্যাক তরুণদের যাতে প্রিয় একটা সংগঠন হতে পারে।

পরিচালনার বিষয়ে একটি বিষয় উল্লেখ করব, ব্র্যাক বাংলাদেশের সবসময় একটা বোর্ড ছিল। এখানে অনেকেই নতুন বোর্ড সদস্য হিসেবে এসেছেন। এখন নতুন চেয়ারপারসন এসেছেন। প্রতিষ্ঠাতার পর এটি প্রথম নতুন চেয়ারপারসন। সেক্ষেত্রে এখানে গভর্ন্যান্স ম্যানেজমেন্টের একটি পরিষ্কার পৃথকীকরণ থাকবে। নতুন চেয়ারপারসন ব্র্যাককে নেতৃত্ব দেবেন। তার কাজ হবে ব্র্যাক ঠিক দিকে আছে কিনা। আমাদের আর্থিক স্বচ্ছতা আছে কিনা। নিজেদের ভিশন-মিশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছি কিনা। যে লক্ষ্যগুলো ঠিক করেছি, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা। প্রধান নির্বাহী হিসেবে আমার দায়িত্ব হবে, বাস্তবায়ন ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা।

এখন একটি নতুন ডিন্যামিক্স তৈরি হয়েছে, সেটি হলো গ্লোবাল বোর্ড। গ্লোবাল বোর্ড তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দেশে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা। জায়গায় নতুন মাত্রা তৈরি হবে। প্রতিটি দেশের বোর্ডগুলোকে গ্লোবাল বোর্ডের সঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের প্রথমবারের মতো গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রতিটি দেশেরই একটি দায়িত্ব আছে। দায়িত্বটি ঠিকভাবে পালন করছি কিনা সেটি গ্লোবাল বোর্ড দেখবে। সেক্ষেত্রে জবাবদিহিতা আরো বেশি বাড়বে। আমার লক্ষ রাখতে হবে এটি করতে গিয়ে আমরা যেন একটি স্থবির, ধীর সংগঠনে পরিণত না হয়; উদ্ভাবনী সংস্কৃতি যাতে ব্যাহত না হয়। এক্ষেত্রে ঠিক ব্যালান্সটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। [শেষ]

আসিফ সালেহ: ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা
শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন