শুক্রবার| ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২০| ১৫ফাল্গুন১৪২৬

শেষ পাতা

মেট্রোরেল

মানহীন বিয়ারিং প্যাড সরবরাহ ইতাল-থাইয়ের

শামীম রাহমান

মেট্রোরেলের উড়ালপথ নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ বিয়ারিং প্যাড বিশেষ ধরনের রাবার দিয়ে তৈরি প্যাড বসাতে হয় পিয়ার ভায়াডাক্টের (উড়ালপথ) সংযোগস্থলে। নির্মীয়মাণ উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পেও এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে বুয়েটের ল্যাবে পরীক্ষা চালিয়ে উত্তরা-আগারগাঁও অংশের দুটি প্যাকেজের জন্য আমদানি করা বিয়ারিং প্যাডের মান খারাপ পাওয়া গেছে। এসব বিয়ারিং প্যাড সরবরাহ করেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতাল-থাই।

মানোত্তীর্ণ না হওয়ায় নতুন বিয়ারিং প্যাড আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে শুধু বিয়ারিং প্যাড সরবরাহ কার্যক্রমেই সময়ক্ষেপণ হচ্ছে অনেক। এতে বেকার থেকে যাচ্ছে চলতি অর্থবছরে বাবদ বরাদ্দকৃত বৈদেশিক সহায়তা খাতের টাকাও।

মেট্রোরেল প্রকল্পে নিম্নমানের বিয়ারিং প্যাড সরবরাহের ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরা-আগারগাঁও অংশের প্যাকেজ -এর নির্মাণকাজে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করছে ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (ইতাল-থাই)

উত্তরা-আগারগাঁও অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। পিয়ার-ভায়াডাক্টের সংযোগস্থলে বিয়ারিং প্যাড বসিয়ে এরই মধ্যে প্রায় আট কিলোমিটার উড়ালপথ বসানো হয়ে গেছে। ইতাল-থাইয়ের আনা বিয়ারিং প্যাডগুলো বাকি অংশে ব্যবহূত হওয়ার কথা ছিল।

মেট্রোরেলে ব্যবহারের আগে বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে এসব বিয়ারিং প্যাডের কারিগরি মান পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, একাধিক বিয়ারিং প্যাডের মান যথাযথ নয়। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগের এক সভায়ও বিষয়টি উঠে আসে।

সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগ বলছে, বিয়ারিং প্যাড নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পের সময়ক্ষেপণ হয়েছে। পাশাপাশি কারণে বরাদ্দকৃত টাকার একটা অংশ অব্যবহূত থাকছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) চন্দন কুমার দে বণিক বার্তাকে বলেন, বিয়ারিং প্যাডের বিষয়টি নিয়ে আমরা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে চেয়েছি। কোথায়, কবে, কয়টি বিয়ারিং প্যাড কারিগরি মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তা জানতে চেয়েছি। পাশাপাশি মানহীন বিয়ারিং প্যাড সরবরাহের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ আমাদের এসব প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিতভাবে দেয়নি।

সাধারণত বড় সেতু বা ফ্লাইওভারে ব্যবহার করা হয় বিয়ারিং প্যাড। পিয়ারের সঙ্গে উপরের কাঠামো জোড়া দেয়ার সংযোগস্থলে বসানো হয় এটি। প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, বিয়ারিং প্যাড অনেকটা কুশনের মতো কাজ করে। সেতু বা ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যখন কোনো গাড়ি বা যানবাহন চলে, তখন এর চাপ সরাসরি পিয়ারে না এসে পড়ে বিয়ারিং প্যাডের ওপর। বিয়ারিং প্যাডের কাজ হলো ভার পুরো পিয়ারের ওপর ছড়িয়ে দেয়। ফলে সেতু বা ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে গাড়ি চলাচলের সময় কোনো ধরনের ঝাঁকুনি হয় না বা হলেও খুব কম।

ঝাঁকুনি প্রতিরোধের পাশাপাশি সেতু বা ফ্লাইওভারকে টেকসই করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিয়ারিং প্যাড। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সেতু বা ফ্লাইওভারের অবকাঠামোর যে ক্ষয় হয়, বিয়ারিং প্যাড সেটিকেও প্রতিরোধ করে। নির্মীয়মাণ মেট্রোরেলের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ মানহীন হলে তা গোটা অবকাঠামোটিকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে বলে মনে করছেন বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালট্যান্টের (বিআরটিসি) পরিচালক . সামছুল হক।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সেতু, ফ্লাইওভারের মতো অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ বিয়ারিং প্যাড। এটির মান খারাপ হলে কাঠামোগত ত্রুটি দেখা দেবে। এর প্রভাবে চলাচলের সময় ঝাঁকুনি অনুভূত হতে পারে। এমনকি এটা পিয়ারের ফাউন্ডেশনেরও ক্ষতি সাধন করতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এটি ব্যবহারের দিকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না।

বনানী ফ্লাইওভারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ফ্লাইওভার দিয়ে চলার সময় গাড়িগুলো অন্তত ১৮টি স্থানে ঝাঁকুনির মধ্যে পড়ছে। বিয়ারিং প্যাড কাজ না করার কারণেই সেখানে এমনটি হচ্ছে। মেট্রোরেলে নিম্নমানের প্যাড ব্যবহার হলে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হবে। পাশাপাশি অবকাঠামোরও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে।

নির্দিষ্ট সময় পরপর বিয়ারিং প্যাড বদলানোর নিয়ম রয়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এর একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। মেয়াদ শেষ হলে সেটি বদলে নতুন প্যাড বসাতে হয়। কিন্তু আমাদের এখানে চর্চা নেই বললেই চলে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আফতাবউদ্দিন তালুকদারের সেলফোনে গতকাল একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তারা কেউই ফোন ধরেননি। তবে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ডিএমটিসিএলের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বুয়েট যেসব বিয়ারিং প্যাড মানহীন পেয়েছে, অন্য জায়গার পরীক্ষায় সেগুলো ভালো মানের পাওয়া গিয়েছিল। তাই এগুলোকে মানহীন বলাটা ঠিক হবে না। তার পরও প্যাডগুলো বদলে ফেলা হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন