বৃহস্পতিবার| ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০| ১৪ফাল্গুন১৪২৬

সম্পাদকীয়

সাম্প্রতিক

গণমাধ্যম আক্রমণের শিকার না হোক

ফিরোজ আহমেদ

জগদ্বিখ্যাত এক দার্শনিক আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রকে কল্পনা করেছিলেন দড়ি টানাটানি খেলার সঙ্গে। তার রূপকটার চরিত্রদের সামান্য বদলে দিয়ে বিষয়টা ফুটিয়ে তুলতে পারি এভাবে: দাগের এক পাশে থাকে রাষ্ট্র, অন্য পাশে জনগণ। দুই দলই দড়িটা টেনে অন্য পক্ষকে নিজের অর্ধে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। যখন যে পক্ষ প্রতিপক্ষকে যতদূর টেনে নিজের পাশে আসতে পারছে, তত দূর তার জিত। রাষ্ট্র জনতাকে দাগের অন্তত যত দূর কাছে নিয়ে আসতে পারবে, তত দূর তার রাষ্ট্রবাদিতা, তত দূর আমলাতান্ত্রিকতা, তত দূর স্বেচ্ছাচারিতা কায়েম করতে পারবে, নির্বাচন হবে না কিংবা হলেও হবে প্রহসন মাত্র। আর রাষ্ট্র যদি জনগণকে হিঁচড়ে দাগের নিজের পাশে পুরোপুরি নিয়ে আসতে পারে, তাহলে কায়েম হবে পূর্ণ ফ্যাসিবাদ, তখন আর কোনো আওয়াজ কোনো দিকে হবে না। আর উল্টো দিকে, জনতা রাষ্ট্রকে যত দূর নিজের দিকে টেনে নিয়ে আসতে পারবে, তত দূর সমাজে কায়েম হবে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, সম্পদের স্বচ্ছ ব্যবহার, আমলাতান্ত্রিকতা কমে আসবে, নির্বাচন হতে থাকবে সুষ্ঠু। জীবনের বিকাশ হতে থাকবে, সংস্কৃতি ঋদ্ধ হবে, চিন্তা সমৃদ্ধ হবে। আর জনগণ যদি হেইয়ো টানে রাষ্ট্রকে হিঁচড়ে দাগের নিজের পাশে নিয়ে আসতে পারে, কায়েম হবে সত্যিকারের গণতন্ত্র। সেটা হয়তো একটা কল্পরাজ্য, রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটারই প্রয়োজন ফুরোবে তখন।

দড়ি টানাটানির খেলায় রাষ্ট্রের সুবিধাই বেশি: প্রতিষ্ঠানগুলো তার হাতে। রাশিয়ায় যেমন আমলাতন্ত্র থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থা হয়ে বিচার বিভাগসবগুলোকেই তার সুবিধামতো করে মাঠে সাজাতে পারে। কাকে কীভাবে ধরতে হবে, কার জন্য কী দাওয়াই আদর্শ, কার কী আমলনামাসব সাজানো-গোছানো থাকে। আতঙ্কিত করা থেকে শুরু করে উৎকাচে বশীভূতকরণ সবই তার নিয়মে সিদ্ধ।

অন্যদিকে রাজনৈতিক দল, শ্রেণী-পেশার সংগঠন, বুদ্ধিজীবী সমাজসহ জনতার আরো অনেক শক্তির উৎসের মাঝে অন্যতম একটি হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। এমন গণমাধ্যম, সরকারকে তোয়াজ কিংবা তার প্রশংসা করা যার কাজ নয়, ক্ষমতাধরদের সঙ্গে নিজের ছবি তুলে নৈকট্য জ্ঞাপন করা যার জীবনের মোক্ষ নয়; বরং কর্তৃত্বকে ক্রমাগত প্রশ্নের মাঝে রাখা, তার জবাবদিহিতাকে নিশ্চিত করা এবং তার দুর্নীতি কিংবা অপচয়কে জনগণের সামনে উন্মোচন করাকে যে আপন কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। একটা গণমাধ্যম যত দূর নিজেকে আস্থাভাজন করে তুলতে পারবে, তত দূর তার বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হবে, তত দূর সে দড়ি টানাটানির খেলায় নৈর্ব্যক্তিক ভূমিকা রেখেই রাষ্ট্রকে দাগের অন্য পাশে টেনে নিয়ে যাওয়ার বেলায় ভূমিকা রাখতে পারবে।

গণমাধ্যমের শক্তির কথা জানতেন দুনিয়ার সব স্বৈরশাসকের আরাধ্য সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, তিনি নাকি বলেছিলেন: চারটে বিরুদ্ধমতের পত্রিকা সহস্র সঙ্গিনের চেয়ে বেশি সমীহ জাগায়।

দুই. ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন যখন ক্ষমতা নেন, প্যারিসে তখন ৭২টি পত্রিকা ছিল। অচিরেই তিনি ১৩টি বাদে বাকিগুলোকে বন্ধ করে দেন। এরপর ১৮১১ সালে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়া হয়: চারটে মাত্র পত্রিকা প্যারিসে প্রকাশ হতো, চারটিই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

সত্যি বলতে কি, আজকের যুগটা ঠিক নেপোলিয়নের যুগ নয় কিংবা আমাদের সমাজটা নেপোলিয়নের সমাজ নয়। সংবাদপত্রের ওপর অমনই একচেটিয়া রাজত্ব স্থাপনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এত কম সময়ে বিফল হয়েছে যে রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণটাকে আড়াল করে সঙ্গে আরো অজস্র নতুন নতুন ফন্দি আবিষ্কার করেছে। তার মাঝে একটা হলো বিজ্ঞাপন।

কিছুদিন আগে সংবাদপত্রেরপ্রচার সংখ্যা বৃদ্ধির নেপথ্যে কী শীর্ষক বিডিনিউজ২৪- এমন একটি প্রতিবেদনে একটি জাতীয় দৈনিকের লাখ ৯০ হাজার প্রচার সংখ্যা দেখে পাঠকরা অবাক হয়েছিলেন, আদতে এটি কয়েকটি দেয়াল ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না, সংবাদকর্মীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা না দেয়ায় গণমাধ্যমটির কর্তৃপক্ষ ব্যাপক নিন্দারও সম্মুখীন হয়েছে। স্পষ্টত অসামঞ্জস্যের কারণ প্রচার সংখ্যা বেশি দেখালে বিজ্ঞাপনে টাকার হারটা বেড়ে যায়। এছাড়া আছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করা, যেন কোনো নির্দিষ্ট গণমাধ্যমে তারা বিজ্ঞাপন না দেয়। এটা খুবই কার্যকর একটা পদ্ধতি: কোনো পত্রিকার রক্তসঞ্চালন বন্ধ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। বাধ্য হয়েই গণমাধ্যম তখন সরকারের কাঙ্ক্ষিত আচরণ করে কিংবা তার সমালোচনাকে একটা সীমার মাঝে নিয়ন্ত্রণ করে। দুনিয়ার বহু দেশেই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, রুশরা বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছে গোয়েন্দা সংস্থা এবং কর বিভাগ দুই হাতিয়ারকেই ব্যবহারের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনদাতাদের বাধ্য করতে, যেন তারা সরকারের অপছন্দের গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন না দেয়।

তিন. যেকোনো মৃত্যুই মর্মান্তিক। অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার কারণে কারো মৃত্যু হলে অভিযুক্তকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা উচিত। নাইমুল আবরারের মৃত্যুর দায়ও কাউকে না কাউকে নিতে হবে। সেটার জন্য সবার আগে দরকার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। কিশোর আলোর দায়িত্বে অবহেলার জন্য প্রথম আলোকে শূলে চড়ানো যাবে কিনা, কিশোর আলোর দায়িত্বহীনতার পরিমাণটা কতখানি নাকি এটা ইভেন্ট ব্যবস্থাপকদের দায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কোনো ভূমিকা আছে কিনা, সবকিছু দেখে নির্ধারণ করতে হবে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় কাকে কতখানি দায় নিতে হবে। সেটা নির্ধারণ করে যার যা শাস্তি পাওনা, সেটা তাকে দিতেই হবে। সেটা কারাদণ্ড হতে পারে, হতে পারে জরিমানা বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ, যদিও মৃত্যুর কোনো ক্ষতিপূরণ আসলে হয় না।

কিন্তু কোনোভাবে কি অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে যে ঘটনার সঙ্গে কোনো দুর্নীতিও জড়িত নেইকোনো মৃত্যু কিংবা দুর্ঘটনা ঘটলে তার সঙ্গে আমরা দুর্নীতি, মাস্তানি বেপরোয়া লুণ্ঠনের রানা প্লাজার সাদৃশ্য টানব? বুয়েটে ঘণ্টা পিটিয়ে আবরার ফাহাদকে হত্যার তুলনা টানব? দুই অপরাধের মাত্রার বীভত্সতার সঙ্গে কিশোর আলোর অনুষ্ঠানের দুর্ঘটনার তুলনা টানা মানে সমাজে রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে যারা নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি করে আছেন, তাদের রেহাই পাওয়ার একটা সোজা রাস্তা বানিয়ে দেয়া।

প্রথম আলো নিয়ে আমার ব্যক্তিগত উদ্বেগ যেটা, মৃত্যু কেন্দ্র করে হয়তো তাকে আটকানোর একটা পথ ক্ষমতাসীনরা বের করে ফেলতে চাইবে। একটা মর্মান্তিক মৃত্যু কেন্দ্র করে রাষ্ট্রে প্রতিনিয়ত যে মৃত্যুকূপ তৈরি করেছে, তাতে আলো ফেলা একটা পত্রিকা নিজেও পিছু হটুক সেটা চাই না। প্রথম আলোর রাজনীতিবিমুখতা কিংবা জিএম ফসলের গুণ গাওয়ার চর্চার বিরুদ্ধে আমাদের কথাও চলুক। কিন্তু কথা বলার যে ন্যূনতম পরিসর প্রথম আলো তৈরি করেছে, সেটাকে গুঁড়িয়ে দেয়ার অভিসন্ধি দেখে উত্কণ্ঠা বোধ করছি।

পত্রিকা বন্ধ হয়তো হবে না, হয়তো সম্পাদক মতিউর রহমান তার সঙ্গে দূরবর্তী সম্পর্কহীন কিশোর আলোর কারণে কারাবাসও করবেন না, কিন্তু তাদের ওপর চাপ পড়বে। তাদের নাজেহালের চেষ্টা চলবে। এবং সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হবে, এভাবে একটি পত্রিকাকে আপসের পথে এনে বাকি সবার জন্যও একটা নেতিবাচক শিক্ষা হাজির করা হবে। সেলফ সেন্সরশিপ বলে যে ভয়াবহ ব্যাধিটি সমাজে অন্ধত্ব আর অবক্ষয়ের এবং দুর্নীতির সূতিকাগার, তাকে আরো প্রবলতর করবে গণমাধ্যমের নিজেকে গুটিয়ে রাখার সংস্কৃতি পাকাপোক্ত হলে। আমাদের চেষ্টা থাকুক কথা বলার পরিসরটা বিস্তৃত করার, নিজেরা যেন সেটাকে গুটিয়ে আনার পাঁয়তারার গুটি না হই। বাকস্বাধীনতার পরিসরকে ছোট করার যে ভয়াবহ চাপ ক্ষমতা-অন্ধদের দিক থেকে আছে, তারা যেন সুযোগটা ব্যবহার করে গণমাধ্যমে অন্ধ আনুগত্য প্রতিষ্ঠা না করতে পারে।

কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনায় নাইমুল আবরারের মৃত্যুতে প্রথম আলোর সম্পাদকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা গেলে বুয়েটের আবরার ফাহাদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান হুকুমের আসামি কার হওয়ার কথা? এমন অজস্র প্রশ্নই তো বাতাসে কান পাতলে শোনা যাবে।

আমার নিশ্চিত বিশ্বাস ন্যায়বিচার নয়, গণতন্ত্রের সেই চিরকালের দড়ি টানাটানির খেলায় গণমাধ্যমকে নিজের পক্ষভুক্ত করাটাই সরকারের আসল আগ্রহ। গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ রেষারেষি কিংবা প্রতিযোগিতা যা- থাকুক, একটি দুর্ঘটনা উপলক্ষ করে গণমাধ্যমকে দমনের দুঃসময়ে সব গণমাধ্যম কর্মীরই কর্তব্য আজ বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো।

 

ফিরোজ আহমেদ
রাজনৈতিক পরিষদের সদস্যগণসংহতি আন্দোলন
সাবেক সভাপতিবাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন
[email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন