শনিবার| ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০| ১৫ফাল্গুন১৪২৬

ফিচার

জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপ

যেভাবে দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচিয়েছিল বিষাক্ত সাইকাস বৃক্ষ

বণিক বার্তা অনলাইন

লাঠিতে ভর দিয়ে চলেন ৭৯ বছর বয়সী ইকো কাওয়াউচি। তবে এখনো তার অর্ধেক বয়সী নারীদের চেয়েও জোরে কুঠার চালাতে পারেন তিনি। অবশ্য এটা তাকে পারতেই হয়। কারণ তিনি ও তার আগের  প্রজন্মটিকে বাঁচতে হয়েছে ক্রমাগত দুর্ভিক্ষের সঙ্গে লড়াই করে। দাদা-দাদির কাছ থেকেই তিনি এটি শিখেছেন। ওই সময় তাদের প্রধান খাদ্য ছিল সাইকাস জাতীয় এক বিষাক্ত উদ্ভিদ।

গল্পটি জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপের একটি উপকূলীয় প্রত্যন্ত গ্রাম ইকেগাচির। জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রান্ত কাইউশু এবং ওকিনাওয়া থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত এ ওশিমা দ্বীপটি ঐতিহাসিকভাবেই আলাদা। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশের কারণে এখানে বিপুল পরিমাণে সাইকাড জন্মে। পাম গাছের সঙ্গে যথেষ্ট মিল থাকলেও এটি আসলে সাইকাস জাতীয় উদ্ভিদ।প্রজাতির সাইকাড ২৮ কোটি বছর ধরে টিকে আছে । এ কারণে একে বলা হয় জীবন্ত জীবাশ্ম। নগ্নবীজী এ উদ্ভিদ ওশিমা দ্বীপের লোকদের কাছে ‘সোতেৎসু’ নামে পরিচিত।

জুরাসিক যুগে এ ধরনের উদ্ভিদ প্রচুর পরিমাণে জন্মাতো। এ কারণে ২০ কোটি ১৩ লাখ থেকে ১৪ কোটি ৫৫ লাখ বছর আগের এ সময়কে বলা হয় ‘সাইকাডের যুগ’ । ডাইনোসর সাইকাড হজম করতে পারতো। তবে মানুষের জন্য এটি মারাত্মক ক্ষতিকর । কাঁচা সাইকাড খেলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।  

তবে আমামি ওশিমার প্রায় ৬৭ হাজার বাসিন্দার জন্য সাইকাড ছিল দুর্ভিক্ষের সময়ে প্রধান খাদ্য। কয়েক শতাব্দী ধরে এই দ্বীপবাসী অভাবের সময় সাইকাড খেয়ে জীবনধারণ করেছে। চার সপ্তাহের শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষমুক্ত করা হতো। কাণ্ডটি থেকে পাউডার তৈরি করা হতো। সেই পাউডার বারবার পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে খাওয়ার উপযোগী করা হতো।  এটি স্থানীয়ভাবে ‘নারি’ নামে পরিচিত। নারি নুডলস তৈরি করে বা ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া হতো। 

ইকো কাওয়াউচিসহ হাতেগোনা কয়েকজন প্রবীণ বর্তমানে এ সাইকাড প্রক্রিয়া করতে জানেন।  কাওউচি বহু বছর আগে তা দাদা দাদির কাছ থেকে সাইকাড কাটা শিখেছিলেন। কাওয়াউচির বন্ধু তোশি ফুকুনাগা বলেন, এটা কঠোর পরিশ্রমের কাজ। 

সত্তরোর্ধ্ব ফুকুনাগা এবং কাওয়াউচির গ্রাম ইকেগাছিতে এখন মাত্র ৫৫ জন বাস করছেন। গ্রামের শেষ সীমানায় সাইকাড প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি পায় । জাপানের অনেক জায়গার মতো, ইকেগাছিতেও বয়স্ক মানুষ বেশি। বেশিরভাগ তরুণ কাজের সন্ধানে জাপানের রাজধানী বা বড় শহরে চলে গেছে। 

ইকেগাছির একমাত্র তরুণ বাসিন্দা কেনশি ফুকুনাগা (২৫)। তিনি সোতেৎসু সংগ্রহে চেষ্টা করেন। 

আমামি জাদুঘরের কর্মকর্তা নবুহিরো হিশাশি বলেন, অতীতে মানুষ অর্থনৈতিক মন্দার সময় সাইকাড খেত। সামন্ততান্ত্রিক এদো শাসনামলে (১৬০৩-১৮৬৮) আমামি ওশিমা ছিল সাৎসুইমা রাজবংশের অধীনে। দ্বীপটিতে প্রায়শই টাইফুন আঘাত হানতো। এখানে চিনি উৎপাদন করা হতো।

জাপানের যে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় আখ চাষ হতো আমামি তার মধ্যে অন্যতম। শাসকরা কেবল লাল চিনির বিনিময়ে এ দ্বীপে ধান পাঠাত। তবে আখ ফসল নষ্ট হলে আমামি ওশিমার লোকদের অনাহারে দিন কাটাতে হতো। ওই সময় তাদের জীবন বাঁচাতে সাইকাড খাওয়া ছাড়া উপায় থাকতো না। ১৮৬৮ সালে এদো যুগের শেষ সময়ে এসে সাৎসুইমা রাজবংশের পতন ঘটে। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের মূল ভূখণ্ডে খাদ্য সরবরাহ সঙ্কট দেখা দিলে দ্বীপটিতে আবার সাইকাড থেকে খাদ্য উৎপাদনের জ্ঞান ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

সাইকাড এখন আর আমামি ওশিমায় প্রয়োজনীয় খাদ্য উত্স হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে দ্বীপের একটি রেস্তোঁরায় সাইকাডের খাবার পাওয়া যায়। তারা দ্বীপটির এ প্রাচীন ঐতিহ্যকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে।

বিবিসি অবলম্বনে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন