শনিবার| ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০| ১৫ফাল্গুন১৪২৬

সম্পাদকীয়

আলোকপাত

কল্পনা করুন পুঁজিবাদহীন একটি বিশ্ব

ইয়ানিস ভারোফাকিস

পুঁজিবাদবিরোধীদের জন্য গত বছরটি ছিল যাচ্ছেতাই একটা সময়। অথচ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যে জেরেমি করবিনের লেবার পার্টির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মৌলিক বাম ধারার গতিবেগ খানিকটা হুমকির মুখে পড়েছে। তবে আমেরিকায় যখন প্রথম দিকে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য অনেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন পুঁজিবাদের শরীরে অপ্রত্যাশিতভাবেই অন্য মহলের উষ্ণ আঁচ এসে লেগেছে। কোটিপতি ব্যক্তিরা আর প্রধান নির্বাহী থেকে শুরু করে এমনকি আর্থিক সংস্থাগুলোও তখন বুদ্ধিজীবী আর বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে ভাড়াটে পুঁজিবাদের বর্বরতা, ত্রাস অস্থিতিশীলতাগুলো তুলে ধরে মাতম করেছেন। তবে ব্যবসা কখনো একইভাবে চলে না, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংস্থাগুলোর সভাকক্ষেও মাঝে মধ্যেই কিন্তু বড় ধরনের সংবেদন অনুভূত হয়।

এদিকে ক্রমবর্ধমান চাপ বৃদ্ধি এবং ন্যায়সংগত অপরাধবোধের শিকার হয়ে অতি ধনীরা কিংবা আমি যদি এভাবে বলি, এদের মধ্যে ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানধারীরা নিরাপত্তাহীন নিষ্পেষণের মধ্য দিয়ে এক ধরনের হুমকি বোধ করছেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠরা বুঝি তলিয়ে যাচ্ছে। মার্ক্স যেমনটা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘তারা একটি চূড়ান্ত শক্তিশালী সংখ্যালঘু শ্রেণী গঠন করে, যারা মেরুকৃত সমাজ পরিচালনার যোগ্য নয় এবং যারা সম্পদের মালিক নয়এমন ব্যক্তিদের শোভন জীবনধারণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

তারা বরং নিজেদের অদৃশ্য এক বেষ্টনী দিয়ে আলাদা করে। তাছাড়া ধনিক শ্রেণীর মধ্যে সবচেয়ে চতুর চৌকস ব্যক্তিরা নতুনস্টেকহোল্ডার ক্যাপিটালিজমচালুর পরামর্শ দেয়, এমনকি তাদের ওপর উচ্চকর আরোপের কথাও বলে। তারা গণতন্ত্রের সম্ভাব্য সেরা বীমা নীতি এবং পুনর্বিতরণকেও স্বীকৃতি দেয়। তবে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হচ্ছে, শ্রেণী হিসেবে তারা বীমা প্রিমিয়াম এড়িয়ে চলার নিজেদের সহজাত প্রকৃতি নিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে।

তাই তাদের প্রস্তাবিত প্রতিকারগুলো স্রেফ অকেজো আর হাস্যকর। তাছাড়া শেয়ারহোল্ডাররা পরিচালনা পর্ষদের বেতন মেয়াদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেননেপথ্যে ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিপ্রায় যদি কাজ না করে, তবে শেয়ারহোল্ডারদের মূল্যের বাইরে গিয়ে বিবেচনার জন্য পরিচালনা পর্ষদের আহ্বানটি দুর্দান্ত হবে। একইভাবে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশির ভাগ শেয়ার ধারণ করে, করপোরেশনগুলো তাদের জবাব দেয়বিষয়টি যদি সত্য না হয়, তবে অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করার আবেদনটিও জুতসই হবে। ভাড়াটে পুঁজিবাদ আর ফ্যাশন ফার্মগুলোর কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি কেবলই বাজার কৌশল মাত্র, তাই এক্ষেত্রে নতুন করে করপোরেট নীতি নির্ধারণ করা জরুরি।

উপযোগের ক্রমবিন্যাস বুঝতে এটি আমাদের ইতিহাসের ওই মুহূর্তে ফিরে যেতে সহায়তা করে, যখন বিক্রয়যোগ্য শেয়ারগুলো (ট্রেডেবল শেয়ার) পুঁজিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয় এবং আমাদের সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় যে আমরা কি ত্রুটিগুলো সংশোধনে প্রস্তুত?

ঘটনাটি ঘটেছিল ১৫৯৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। মুরগেট শহরে কাঠের তৈরি বিশাল পার্শ্বদ্বার নির্মাণের সময়ে শেক্সপিয়ার তারহেমলেট’-এর যবনিকা টানতে যেখানে বসে রীতিমতো গলদ্ঘর্ম হচ্ছিলেন, জায়গাটি তার থেকে খুব বেশি দূরে নয়; সে সময় একটি নতুন ধরনের কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে পরিচিত নতুন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যাতে অবাধে ক্রয় বিক্রয় করা যায়, সেজন্য একে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হয়েছিল।

বিক্রয়যোগ্য শেয়ার ব্যক্তিমালিকানাধীন সংস্থাগুলোকে খোদ রাষ্ট্রের চেয়ে বৃহৎ শক্তিশালী হতে দেয়। উদার নীতির মারাত্মক ভণ্ডামি হচ্ছে, এটি মুক্ত বাজারের সবচেয়ে ক্ষতিকর শত্রুকে রক্ষার জন্য পাড়ার ধর্মচারী কসাই, রুটিওয়ালা আর সুরা কারবারিকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যাদের কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় নেই, যারা কোনো নৈতিকতার ধার ধারে না, বরং একটি নির্ধারিত মূল্য আরোপ করে, প্রতিযোগীদের গোগ্রাসে গিলে ফেলে আর সরকারকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি স্বাধীনতার বিষয়টিকে রীতিমতো হাস্যকর করে তোলে।

পরবর্তী সময়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে এডিসন, জেনারেল ইলেকট্রিক, বেলসহ প্রথম বৃহৎ নেটওয়ার্কভিত্তিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাজারজাতযোগ্য শেয়ারের দৈত্যটি এগিয়ে যায় আরো এক ধাপ। কেননা ব্যাংক কিংবা বিনিয়োগকারীদের হাতে ওই বৃহৎ নেটওয়ার্কগুলোকে ঝাঁকি দেয়ার মতো যথেষ্ট অর্থ ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক ছায়া তহবিলের বৈশ্বিক জোট হিসেবে বৃহত্তর ব্যাংকের আবির্ভাব হয়, যার প্রতিটিরই নিজস্ব শেয়ারহোল্ডার রয়েছে।

এভাবে ভবিষ্যতে শোধ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লাভের আশায় বর্তমানের মূল্য স্থানান্তর করতে নজিরবিহীনভাবে নতুন দেনা তৈরি করা হয়। তাই বৃহত্তর আর্থিক, মেগা ইকুইটি, বৃহৎ অবসর তহবিল এবং বড় ধরনের আর্থিক সংকট ছিল যৌক্তিক পরিণতি। ১৯২৯ ২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয়, বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির অবিরাম উত্থান পুঁজিবাদের সঙ্গে আজকের অন্য সব উপাদানের অসন্তুষ্টির বিষয়টি তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে।

ব্যবস্থায় শোভন পুঁজিবাদের আহ্বানগুলো অনেক বেশি বিবর্ণ, বিশেষ করে ২০০৮-পরবর্তী বাস্তবতার পর। ২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয় আমাদের চোখে খুব ভালোভাবে আঙুল চালিয়ে দেখিয়ে দেয় যে বৃহৎ সংস্থা আর ব্যাংকগুলো কীভাবে আমাদের গোটা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা যদি সর্বপ্রথম ১৫৯৯ সালে প্রবর্তিত বিক্রয়যোগ্য শেয়ারগুলো নিষিদ্ধ করতে ইচ্ছুক না হই, তাহলে আজও সম্পদ ক্ষমতা বণ্টনে আমরা কোনো গ্রহণযোগ্য পার্থক্য তৈরি করতে পারব না। পুঁজিবাদের বাইরে গিয়ে কল্পনার অর্থ কী হতে পারে তা অনুশীলনের জন্য করপোরেশনের মালিকানা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ভেবে নিন যে শেয়ারগুলো অনেকটা নির্বাচনী ভোটের মতো, যা ক্রয় বা বিক্রয়যোগ্য নয়। যেমন নিবন্ধনের পর যে শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরি কার্ড পান, তাদের মতো নতুন শিক্ষার্থীরা করপোরেশনের প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেপরিচালনা পরিকল্পনা থেকে শুরু করে নিট আয়ের বোনাস বিতরণ পর্যন্তসব শেয়ারহোল্ডারের একটি করে ভোট দেয়ার নিশ্চয়তাস্বরূপ একটি করে শেয়ার পাবেন।

হঠাৎ করে মুনাফা-মজুরির পার্থক্য কোনো ধরনের অর্থ তৈরি করে না। তাছাড়া সংস্থাগুলোর আকার ছেঁটে ফেলে কেবলই বাজার প্রতিযোগিতাকে বাড়ানো হয়। যখন কোনো শিশু জন্ম নেয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে একটি কল্যাণ তহবিলের (কিংবা ব্যক্তিগত মূলধন তহবিল) অনুদান দেয়, যা পর্যায়ক্রমে সর্বজনীন মৌলিক লভাংশের সঙ্গে শীর্ষে থাকে। শিশুটি কিশোর হয়ে উঠলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার দিকে বিনা মূল্যের একটি চেকিং অ্যাকাউন্ট ছুড়ে দেয়।

কর্মীরা স্বাধীনভাবে কোম্পানি বদলের সময় নিজেদের কল্যাণ তহবিলটি সঙ্গে নিয়ে যান, যা কিনা তারা ওই কোম্পানি কিংবা অন্য কাউকে ধার হিসেবে দিতে পারেন। যেহেতু ওই বিশাল কল্পিত মূলধনের ওপর কোনো নির্দিষ্ট সুদ নেই, তাই আর্থিক বিষয়গুলো এখানে কার্যত স্থির বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রগুলো সব ধরনের ব্যক্তিগত বিক্রয়কর বাদ দেয়, এর পরিবর্তে কেবল করপোরেট রাজস্ব জমির ওপর করারোপ করে, যা সাধারণের কর্মকাণ্ডগুলোকে কমিয়ে দেয়।

পরিশেষে বলব, দিবাস্বপ্নে হারিয়ে যাওয়া অনেক হয়েছে। পর্যায়ে মূল বিষয় হচ্ছে নতুন বছরের শুরুতে সত্যিকারের উদার, উত্তর-পুঁজিবাদী প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সমাজের বিস্ময়কর সম্ভাবনা সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদান করা। তবে যারা এটি কল্পনা করতে অস্বীকার করছেন, তারা স্লোভেনীয় দার্শনিক আমার বন্ধু স্লাবয় জিঁজ্যাক নির্দেশিত উল্লিখিত অযৌক্তিকতার শিকার হতে বাধ্য: পুঁজিবাদের অবসানের চেয়ে বিশ্বের পরিসমাপ্তির কথা চিন্তা করাটা সহজ।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

ইয়ানিস ভারোফাকিস: এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন