শনিবার | আগস্ট ০৮, ২০২০ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রথম পাতা

রেলের কনটেইনার পরিবহন

কোম্পানি আছে কার্যক্রম নেই

শামীম রাহমান

রেলপথে কনটেইনার পরিবহন বাড়াতে চার বছর আগে কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) নামে স্বতন্ত্র একটি কোম্পানি গঠন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এখনোকাগুজে কোম্পানিই রয়ে গেছে এটি। ফলে কাটেনি কনটেইনার পরিবহনে রেলওয়ের বেহাল দশাও। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে যত পণ্য পরিবহন হয়, তার ৮০ শতাংশই হয় সড়কপথে। নৌপথে ১৬ ও রেলপথে পরিবহন হয় মাত্র ৪ শতাংশ।

কনটেইনার পরিবহনকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে ২০১৬ সালের ১৭ মে সিসিবিএল প্রতিষ্ঠা করেছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সুপারিশে ভারতের কনটেইনার করপোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেডের (কনকর) আদলে গড়ে তোলার কথা সংস্থাটি। কিন্তু প্রতিষ্ঠার চার বছর পার হলেও সিসিবিএল কোনো কাজই করতে পারেনি। রেল ভবনে কোম্পানিটির জন্য বরাদ্দ আছে মাত্র দুটি কক্ষ। ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকলেও কোম্পানির সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে চুক্তিতে। কোনো জনবলও নেই। এখন পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহন পরিচালনাও শুরু করতে পারেনি সংস্থাটি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলাল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিষ্ঠার চার বছর হলেও সিসিবিএল এখনো ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর্যায়েই আছে। জনবল কাঠামো প্রস্তুতসহ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালন কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। গত মাসেই জনবল কাঠামো তৈরির জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগামী মার্চের মধ্যে এ কাজ শেষ হতে পারে।

কোম্পানির বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি, আগামী মার্চের মধ্যে ভারত থেকে একটি কনটেইনারবাহী ট্রেন বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত পরিচালনা করার। এজন্য সিরাজগঞ্জে এরই মধ্যে ২২ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে কাস্টমস সুবিধাসহ নতুন একটি আইসিডি গড়ে তোলা হবে। ক্রমান্বয়ে দর্শনা, বেনাপোল, রহনপুর ও বিরল স্থলবন্দর দিয়েও ভারত-বাংলাদেশ কনটেইনার পরিবহন শুরু হবে। সিরাজগঞ্জ আইসিডি পরিচালনার জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কমলাপুর আইসিডি পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েও সিসিবিএল কাজ করছে বলে জানান তিনি।

সমুদ্রপথে দেশে যত কনটেইনার পরিবহন হয়, তার ৯৮ শতাংশই আনা-নেয়া করা হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এ বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ২৮ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন হয়। বন্দরের সিংহভাগ কনটেইনারের গন্তব্য রাজধানী ঢাকা। ১৯৮৭ সাল থেকে কনটেইনার পরিবহন শুরু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডির (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) মধ্যে কনটেইনার পরিবহন করছে সংস্থাটি। ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৭ লাখ ৪২ হাজার টন কনটেইনার পরিবহন করেছিল রেলওয়ে। পরের অর্থবছর (২০১৭-১৮) কনটেইনার পরিবহন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮১ হাজার টনে। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেলে ৭ লাখ ৬ হাজার টন কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরে যত কনটেইনার পরিবহন হয়, তার মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ রেলপথে পরিবহন হচ্ছে।

পণ্য ও কনটেইনার পরিবহন উভয় ক্ষেত্রেই অনেক পিছিয়ে রেলওয়ে। বিষয়টি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বণিক বার্তাকে বলেন, রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ছিল। এ অবহেলাই রেলের আজকের এ দুরবস্থার জন্য দায়ী। তবে আমরা এ অবস্থা থেকে রেলকে বের করে আনতে চাই। এজন্য সারা দেশে একাধিক আইসিডি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পণ্যবাহী ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রেলপথে পণ্য ও কনটেইনার পরিবহন বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। পণ্য পরিবহন বৃদ্ধির মাধ্যমে রেলকে লোকসানি থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সহজ হবে বলে এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।

দেশে ১৫ শতাংশের মতো কনটেইনার নৌপথে পরিবহন হয়। বাকি ৮০ শতাংশ কনটেইনার পরিবহন হচ্ছে সড়কপথে। সড়কপথের ওপর চাপ কমাতে নৌ ও রেলপথে কনটেইনার পরিবহন বাড়ানোর কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না। এর একটা বড় কারণ ওভারলোড। আমাদের এখানে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাটি পুরোপুরি সড়কনির্ভর। আর ওভারলোডটা হয় পণ্য পরিবহনেই। উন্নত দেশে কিন্তু চিত্রটি একেবারে উল্টো। পণ্য পরিবহনে তারা রেল ও নৌপথকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে। আমরা হাঁটছি উল্টোপথে। সড়কপথের ওপর চাপ কমিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার সিংহভাগই রেল ও নৌপথনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন