রবিবার | আগস্ট ০৯, ২০২০ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

টেংরাটিলা দুর্ঘটনা

সর্বজনের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে

ওমর ফারুক

প্রায় ১৫ বছর আগে ২০০৫ সালের জানুয়ারি ২৪ জুন বাংলাদেশের ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে (টেংরাটিলা) দুই দফায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সরকারি নানা বিভাগের কয়েকটি তদন্ত কমিটি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দুর্ঘটনার জন্য কানাডার বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি নাইকো রিসোর্সকে দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দেয় এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুপারিশ করে। এসব সুপারিশের আলোকে পেট্রোবাংলা ঘটনার প্রায় তিন বছর পর ২০০৮ সালের মে-জুনে ঢাকার এক আদালতে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৩ হাজার ৯৭৩ টাকা এবং এর ওপর ১২ শতাংশ সুদ দাবি করে মামলা দায়ের করে। ওই মামলা এখনো বিচারাধীন।

১৯৯৭ সালের এপ্রিলে নাইকোর দেয়া একটি অযাচিত প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মধ্যে প্রান্তিক পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। আলোচনার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালের আগস্টে প্রান্তিক পরিত্যক্ত বলে চিহ্নিত ছাতক, কামতা ফেনী গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা করার জন্য নাইকো বাপেক্স একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। গবেষণায় ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাতক ফেনী গ্যাসক্ষেত্রকে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জ্বালানিবিষয়ক সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিস্তারিত পর্যালোচনা আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত বিশ্লেষণের পর তদানীন্তন দুই প্রধানমন্ত্রীর (জুন ২০০১ মার্চ ২০০৩) অনুমোদন নিয়ে ছয় বছর পর বাপেক্স নাইকোর মধ্যে ছাতক ফেনী গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের জন্য ২০০৩ সালের অক্টোবরে একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি সম্পাদিত হয়। 

২০০৫ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), আইন সালিশ কেন্দ্র অধিকার হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করে। পিটিশনকারীরা কয়েকটি বিষয়ে আদালতের রায় চেয়েছেন: ২০০৩ সালে বাপেক্স নাইকোর মধ্যে সম্পাদিত জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির আইনি ভিত্তি নেই, কেননা চুক্তি সম্পাদনের সময় সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আইনসম্মতভাবে কাজ করেননি এবং ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতিপূরণ আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, ২০০৫ সালের জুনে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয় যে, নাইকো ওই সালের মে মাসে তত্কালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীকে একটি গাড়ি (মূল্য ১৯০,০০০ কানাডিয়ান ডলার) কানাডায় ভ্রমণের জন্য নগদ অর্থ (৫০০০ কানাডিয়ান ডলার) প্রদান করে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলেও ওই মাসে পদত্যাগ করেন। কানাডার ফেডারেল পুলিশ নিয়ে তদন্ত করে ২০১১ সালে কানাডার আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করলে নাইকো অভিযোগ মেনে নিয়ে দশমিক মিলিয়ন ডলার জরিমানা প্রদান করে। পিটিশনকারীদের আবেদনে সাড়া দিয়ে হাইকোর্ট ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার নাইকোকে জবাব দেয়ার জন্য রুলনিশি জারি করেন এবং মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নাইকোকে গ্যাস বিক্রির কোনো অর্থ পরিশোধে সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ২০০৯ সালের শেষের দিকে মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের দুটো অংশ আছে। এক. পিটিশনকারীদের তথ্য-উপাত্ত, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো নাইকোর পাল্টা জবাব বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট রায় দেন যে, বাপেক্স নাইকোর মধ্যে সম্পাদিত জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তিতে সরকার পক্ষ কোনো দুর্নীতি করেনি এবং চুক্তির বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দুই. হাইকোর্ট উল্লেখ করেন ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডের জন্য নাইকো থেকে পেট্রোবাংলার দায়ের করা ২০০৮ সালের মামলার রায় অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। ওই মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পেট্রোবাংলার কাছে নাইকোর পাওনা পরিশোধ করা যাবে না। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, বাপেক্স নাইকোর মধ্যে সম্পাদিত জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির আলোকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন চালু হয়, যা নাইকো ২০০৪ সালের নভেম্বর থেকে পেট্রোবাংলার কাছে গ্যাস বিক্রি করে আসছিল। গ্যাসের দর নিয়ে পেট্রোবাংলা নাইকো কোনো সিদ্ধান্তে না আসতে পারলেও গ্যাস কেনাবেচা বন্ধ থাকেনি। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে গ্যাসের দর নিয়ে পেট্রোবাংলা নাইকোর মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়।

নাইকো ঢাকার স্থানীয় আদালতে হাইকোর্টে মামলার মুখে থাকাকালে ২০১০ সালের এপ্রিল জুনে বিশ্বব্যাংকের আওতাধীন পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দুটো মামলা করে। সালিশি ট্রাইব্যুনাল (ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট), যা সংক্ষেপে ইকসিড নামে পরিচিত, মূলত বিদেশী বিনিয়োগকারীর সঙ্গে বিনিয়োগ খাটানো হয়েছে, এমন কোনো দেশের সরকার বা সরকারি সংস্থার মধ্যে সংঘটিত বিরোধ নিষ্পত্তি করে। ইকসিডের সালিশি ট্রাইবু্যুনালে বাংলাদেশ একেবারেই অপরিচিত নয়। ১৯৯৪ সালে সিমিটার কোম্পানি হরিপুর তেল-গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সালিশি ট্রাইব্যুনালে মামলা করে। ওই মামলায় সিমিটারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০০৪ সালে ইতালির কোম্পানি সাইপেন এসপিএ গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণবিষয়ক বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা করে এবং এতে বাংলাদেশ পক্ষ পরাজিত হয়। ২০১০ সালে শেভরন একটি মামলা করে। এতে শেভরন পরাজিত হয়। নাইকোর মামলায় দুটি ভিন্ন বিষয়ে ইকসিডের সালিশি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়েছে। একটি মামলায় নাইকো ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহকৃত গ্যাসের মূল্য বাবদ পেট্রোবাংলার কাছে পাওনা (৩৫.৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) আদায়ের রায় চেয়েছে। আগেই উল্লেখ করেছি বেলার মামলায় দেয়া হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে পেট্রোবাংলা নাইকোকে গ্যাসের পাওনা পরিশোধ করতে পারবে না। আরেকটি মামলায় নাইকো ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছে ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে নাইকোর কোনো দায়ভার নেই মর্মে রায় দেয়ার জন্য। 

নাইকোর দায়ের করা মামলা দুটির বিচার সমান্তরালে শুরু হয়েছে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সেই থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ আট বছরে ট্রাইব্যুনাল পাঁচটি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কোনোটিই বাংলাদেশের পক্ষে যায়নি। ২০১৩ সালের আগস্টে প্রথম সিদ্ধান্তে নাইকোর মামলা ওই ট্রাইব্যুনালে চলবে কিনা, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। নাইকো তার মামলায় বিবাদী করেছে তিনজনবাংলাদেশ রাষ্ট্র/সরকার, বাপেক্স, পেট্রোবাংলা। বিবাদীরা কাউন্সেল আন্তর্জাতিক আইনের নানা খুঁটিনাটি তুলে ধরে মতামত দেন যে নাইকো যেহেতু কানাডার আদালতে জরিমানা দিয়েছে, তাই ওই ট্রাইব্যুনালে তার মামলা চলতে পারে না। ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে সিদ্ধান্ত দেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র/সরকারের ওপর ট্রাইব্যুনালের কোনো এখতিয়ার না থাকলেও বাপেক্স পেট্রোবাংলার সঙ্গে নাইকোর সম্পাদিত দুই চুক্তির বিষয়ে এখতিয়ার আছে এবং নাইকোর মামলা ট্রাইব্যুনালে চলবে। [চলবে]

 

ওমর ফারুক: পোস্টডক্টরাল ফেলো

গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ

কুইন্স ইউনিভার্সিটি, কানাডা  

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন