শনিবার| জানুয়ারি ১৮, ২০২০| ৫মাঘ১৪২৬

শেষ পাতা

শ্রম মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন

অকটেনের সংস্পর্শে দ্রুত ছড়ায় ফ্যান কারখানার আগুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা আনুমানিক ৫টা ৪০ মিনিটে আগুন লাগে গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়ীয়া ইউনিয়নে কিশোরিতা গ্রামের রোজা হাই-টেক কারখানায়। দুইতলাবিশিষ্ট পাকা কারখানাটির ভবনের ছাদের ওপর প্রায় অর্ধেকজুড়ে অননুমোদিত টিনশেড। এর দরজার পাশে রক্ষিত বৈদ্যুতিক সুইচবোর্ড থেকে শর্ট সার্কিট হয়। বিকট শব্দ হয়ে মুহূর্তেই সম্পূর্ণ ফ্লোরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদনকাজে ব্যবহূত অকটেনের সংস্পর্শে এসেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে নিহত হন ১০ জন। অগ্নিদুর্ঘটনাটি নিয়ে শ্রম কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল জমা দেয়া প্রতিবেদনটিতে আগুন লাগার কারণসহ সার্বিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দুইতলা ভবনের কারখানাটির শ্রমিক সংখ্যা ৩৪। দুটি তলায় কারখানার অনুমোদন থাকলেও দ্বিতীয় তলার ছাদের ওপর অর্ধেক অংশে গড়ে তোলা টিনশেডের কোনো অনুমোদন ছিল না। চলতি বছরের এপ্রিলে নিয়মিত পরিদর্শনে আইন লঙ্ঘনের কারণে কারখানা কর্তৃপক্ষকে নোটিস করার পাশাপাশি শ্রম আদালতে মামলাও করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অননুমোদিত সম্প্রসারিত বা নির্মিত টিনশেডে কোনো নিয়ম মেনে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বৈদ্যুতিক লোড বেড়ে যাওয়া বা ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগের কারণে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের ঘটনা ঘটতে পারে। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনা সঠিক থাকলে আগুনের সূত্রপাত হতো না। কেমিক্যাল ব্যবহারে নিয়ম মেনে চললে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত না। বিকল্প বহির্গমনপথ থাকলে হতাহত বা নিহতের ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার জানা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।

শ্রম কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি মোট নয়টি সুপারিশ উপস্থাপন করেছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে প্রথমেই আছে কারখানায় কর্মরত সবাই যেন জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নির্গমন করতে পারেন সেজন্য নিরাপদ, সহজ জরুরি বহির্গমনপথ রাখা বাঞ্ছনীয়। উৎপাদন প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় জরুরি বহির্গমনপথ খোলা রাখা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা।

কেমিক্যাল প্রসঙ্গে সুপারিশে বলা হয়েছে, অতিমাত্রায় দাহ্য পদার্থ, কেমিক্যাল, গ্যাস ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে সক্ষমতা বা নিরাপত্তা সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক করা। কেমিক্যাল ব্যবহারকারী কারখানাগুলোয় সেফটি কমিটি গঠন জোরদার করতে হবে এবং শ্রমিকদের সেফটি কমপ্লায়েন্সবিষয়ক যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, কল-কারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বয় আরো জোরদার করা প্রয়োজন। কারখানার ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং লাইসেন্সপ্রাপ্ত ঠিকাদার কর্তৃক নিশ্চিত করা দরকার। এছাড়া বৈদ্যুতিক ডিবি বোর্ড, ট্রান্সফরমার ইত্যাদি অগ্নিনিরাপত্তামূলক দেয়াল ইনসুলেশন দিয়ে আলাদা এবং কর্মক্ষেত্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে স্থাপন করলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলেও জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।

এছাড়া উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন কারখানাগুলোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তাত্ক্ষণিকভাবে অবহিত করতে বলেছে কমিটি। সবশেষে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আরোপিত জরিমানা বা শাস্তি বৃদ্ধির ব্যবস্থা করার সুপারিশ জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।

১৫ ডিসেম্বর অগ্নিকাণ্ডের পর পরই কারণ দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। শ্রম কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব একেএম রফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে গঠিত ওই কমিটিতে সদস্য সচিব ছিলেন মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মো. মতিউর রহমান। এছাড়া সদস্যদের মধ্যে ছিলেন অধিদপ্তরের গাজীপুর অঞ্চলের উপমহাপরিদর্শক মো. ইউসুফ আলী ঢাকা বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর হোসাইন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন