বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

খবর

গণপূর্তের প্রকল্প নিম্নমানের সামগ্রী ও টেন্ডারবাজিতে বিপর্যস্ত

দুর্নীতির ১০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

গণপূর্ত অধিদপ্তরের দরপত্র প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়েই দুর্নীতি। রয়েছে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারেরও অভিযোগ। এসব দুর্নীতির সঙ্গে ঠিকাদার আর কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গণপূর্তের দুর্নীতির ১০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে দুদক। একই সঙ্গে এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২০টি সুপারিশ তুলে ধরেছে সংস্থাটি। গতকাল সচিবালয়ে প্রতিবেদনটি গৃহায়ন গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করিমের কাছে তুলে দেন দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান।

সরকারি ২৫টি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইন, বিধি, পরিচালনা পদ্ধতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ-অপচয়ের দিক পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দল গঠন করে দুদক। দলগুলোকে এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে সফলতা সীমাবদ্ধতা, আইনি জটিলতা, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি দুর্নীতির কারণ চিহ্নিত করে তা বন্ধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়। কমিশনের নির্দেশনার আলোকে দুদকের দলগুলো প্রতিবেদন দাখিল করছে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিমান, রাজউক, ওয়াসা, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ ১৪টি প্রতিষ্ঠান সংস্থা নিয়ে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গণপূর্ত নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়া হলো।

দুদকের প্রতিবেদন বলছে, দরপত্র প্রক্রিয়াতেই দুর্নীতি বেশি হয় এর মধ্যে রয়েছে যথাযথভাবে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করা, অপছন্দের ঠিকাদারকে কাজ না দেয়া, অস্বাভাবিক মূল্যে প্রাক্কলন তৈরি, ছোট ছোট প্যাকেজে প্রকল্প প্রণয়ন, দরপত্রের শর্ত উপেক্ষা করা। এছাড়া নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কাজে ধীরগতি, প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ, প্রকল্পের অনাবশ্যক ব্যয় বৃদ্ধি, স্থাপত্য কাঠামোগত নকশা চূড়ান্তে বিলম্ব, প্রত্যাশী সংস্থার প্রয়োজনমতো জরুরি ভিত্তিতে কাজ শেষ না করা, সেবা প্রদানের বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগিতা, সময়মতো ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ না করা এবং বরাদ্দ থাকার পরও ঠিকাদারদের আংশিক বিল পরিশোধ করাও চিহ্নিত হয়েছে দুদকের প্রতিবেদনে।

দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান সাংবাদিকদের বলেন, দুদক ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে টিম গঠন করেছে। একেকটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কে একেকটি টিম। ২৫টির মধ্যে আজকের (বুধবার) প্রতিবেদনটি পঞ্চদশ। প্রতিবেদনের মূল বিষয় হচ্ছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রতিবেদনটি এক ধরনের পর্যবেক্ষণ বা সংক্ষিপ্ত জরিপ বলে উল্লেখ করেন তিনি। দুদক কমিশনার বলেন, কাজটি করতে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্টেকহোল্ডার, ঠিকাদার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, মন্ত্রণালয়ের অডিট রিপোর্ট, বার্ষিক প্রতিবেদন সবকিছু পর্যালোচনা করা হয়েছে।

দুদকের প্রতিবেদনকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হবে বলে জানিয়ে গৃহায়ন গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করিম বলেন, প্রতিবেদন আমাদের কাজের গতি বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা আনতে এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। গাইডলাইনকে আমরা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব। এর ভিত্তিতে যদি তদন্ত করতে হয়, তাও করবেন বলে জানান তিনি। গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, দায়সারা গোছের রিপোর্ট পেলাম আর দেখলাম, এটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

দুর্নীতির উৎস হিসেবে ১০টি ক্ষেত্রকে তুলে এনেছে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দরপত্র প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি খুঁজে পেয়েছে দুদক, যেমনঅতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন, দরপত্রের তথ্য ফাঁস, সমঝোতার নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এজেন্ট ঠিকাদার নিয়োগ, বারবার নির্মাণকাজের নকশা পরিবর্তন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বুঝে না নেয়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেরামত বা সংস্কারকাজের নামে ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বেনামে বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ এবং ঠিকাদার প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর অনৈতিক সুবিধালাভ। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বৃহৎ পরিসরের কাজ ছাড়াও মেরামত, সংস্কার রক্ষণাবেক্ষণ খাতে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। বরাদ্দের বিপরীতে কাজগুলো ছোট ছোট লটে ভাগ করা হয়। এসব কাজ তাদের পছন্দের ঠিকাদারদের দেয়ার জন্য -জিপিতে না গিয়ে গোপন দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেয়া হয় বলে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২০ দফা সুপারিশও উঠে এসেছে দুদকের প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে -জিপি দরপত্র প্রক্রিয়া সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করা, প্রকল্প নির্বাচনের যথার্থতা বা উপযোগিতা নিশ্চিত করা, প্রাক্কলন প্রস্তুত এবং দরপত্রের আর্থিক কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় স্থানীয় দরপত্রের ক্ষেত্রে প্রত্যাশী সংস্থা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি আন্তর্জাতিক দরপত্রের ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা নামে-বেনামে ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে জড়িত, তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। প্রকল্পের প্রাক্কলন প্রণয়ন প্রাক্কলিত কাজের বাস্তবায়ন পৃথক দুটি ইউনিটের ওপর ন্যস্ত করার সুপারিশও উঠে এসেছে দুদকের প্রতিবেদনে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন