রবিবার | নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক সহিংসতা: মামলা হলেও শাস্তি হয়নি কারো

তানিম আহমেদ

স্বাধীনতার পর থেকে পর্যন্ত দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোয় অসংখ্য সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যাও কম নয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সংঘটিত সহিংসতায় পর্যন্ত ১৬০ জনের অধিক শিক্ষার্থী মারা গেছেন। এসব ঘটনায় প্রতিবারই আন্দোলন হয়েছে, মামলা হয়েছে, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় শাস্তির হাত থেকে বেঁচে গেছে অপরাধীরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা বাতিলেরও ঘটনা দেখা গেছে।

১৯৭৪ সালের এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুন হন সাত ছাত্রনেতা। আলোচিত সেভেন মার্ডারের ঘটনায় ফাঁসির আদেশও হয়েছিল ছাত্রলীগের তত্কালীন (বহিষ্কৃত) সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানের। কিন্তু ৭৫-পরবর্তী সরকারের সাধারণ ক্ষমায় ফাঁসির হাত থেকে রক্ষা পান তিনি। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাঙ্গনে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তার ফলে সহিংসতা হত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে এখনো। ক্যাম্পাসে সহিংসতায় সর্বশেষ বলি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ছাত্রলীগের নিজেদের কোন্দলে নিহত হন ৩৯ জন। আর সময়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ হারান অন্য সংগঠনের ১৫ জন। ২০০৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের একাংশের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আসাদ ওরফে রাজীবকে হত্যা করে মরদেহ বহুতল ভবন থেকে ফেলে দেয়া হয়। ২০১০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে নিজ সংগঠনের কর্মীরাই মারধর করে বহুতল ভবন থেকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করে। এসব ঘটনায় এখনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি জড়িতদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক . সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ছাত্র রাজনীতি বলতে যা বোঝায়, তা এখন নেই বাংলাদেশে। ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রও নেই, নীতিও নেই। যার ফলে ধরনের ঘটনা হচ্ছে। আমরা দেখেছিলাম ইসলামী ছাত্রশিবির রগ কাটার রাজনীতি করত, এখন ছাত্রলীগও সেই রাজনীতিতে অবতীর্ণ হচ্ছে। এসব ঘটনায় তদন্তও কখনো হয় না। যখন ক্যাম্পাস প্রচণ্ড উত্তাল থাকে, তখন ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য এক ধরনের প্রহসন করা হয়। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রদল এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রলীগ এসব সহিংসতা করে। কিন্তু এদের কোনোদিন বিচার হয়নি, এগুলো হারিয়ে যায়। ফলে বুয়েটের আবরার হত্যার বিচার হবে কিনা, সে বিষয়েও আমি সন্দিহান।

২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এএফ রহমান হলে সিট দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সহিংসতায় খুন হন মেধাবী ছাত্র আবু বকর। ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মীর সবাই খালাস পেয়েছেন মামলার রায়ে। সব আসামি খালাস পাওয়ায় কে বা কারা আবু বকরকে খুন করেছে, বিচারে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হত্যাকারী চিহ্নিত করার মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতে আপিল করার যে সুযোগ ছিল, তা- রাষ্ট্রপক্ষ নেয়নি।

এরপর ২০১২ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ। হত্যা মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০১৫ সালে পাঁচজন আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। কিন্তু আসামিদের মধ্যে একটি বড় অংশই মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুধু ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক নয়, এটা বাইরেও আছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক . শান্তনু মজুমদার। তিনি বলেন, সংস্কৃতি গোটা রাষ্ট্রের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু বিশেষ সরকার এক্ষেত্রে দায়ী নয়, ক্রমাগতভাবে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতাও একটা বড় কারণ। মানুষ মনে করছে না যে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। এসব কারণে মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থনও করছে। বুয়েটের ঘটনাটা হলো দেশের সামগ্রিক অবস্থার যে অবনতি হয়েছে, সেটার একটা প্রতিফলন।

২০১৩ সালে এক হেফাজতকর্মী এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে বুয়েটের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ রায়হান দ্বীপকে। দীর্ঘদিন অচেতন অবস্থায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। পুলিশ ঘটনায় বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মেজবাহকে আটক করে। গ্রেফতারের পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল দখলকে কেন্দ্র করে শিবিরের ক্যাডাররা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। সংঘর্ষে শিবিরের ক্যাডাররা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কর্মী গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ফারুক হোসেনকে নির্মমভাবে খুন করে লাশ শাহ মখদুম হলের পেছনের ম্যানহোলে ফেলে রাখে।

এর আগে ২০০৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল ছাত্রদলের নেতা মাহাবুবুল ইসলাম খোকন। ওই হত্যাকাণ্ডের পর দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও প্রতিবেদন জমা পড়েনি। শাহবাগ থানায় মামলা হলেও এর বিচারকাজ শেষ হয়নি। খুনিরা এখন ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক দশক ধরে শিক্ষকতা করেন এমন শিক্ষকরা বলছেন, তাদের শিক্ষকতা জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক সহিংসতা ঘটলেও কোনো ঘটনার বিচার হয়েছে বলে তাদের জানা নেই। ঠিকমতো বিচার চাওয়াও হয়নি, বরং লাশের রাজনীতি হয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ঘটনা ঘটেছে।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান . নেহাল করিম বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলার অভাব। এরা উপরের মহল থেকে আশ্বাস পায় বলেই ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস পায়। তাদের মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণের দায়িত্ব কে দিয়েছে? সবারই নিজস্ব মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব এখানে সব এক পথে যাবে, ডানে-বামে কেউ যেতে পারবে না।

২০০২ সালের জুন দরপত্র নিয়ে বুয়েট ছাত্রদলের মুকি এবং এসএম হল ছাত্রদলের টগর গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে ক্রসফায়ারে পড়ে নিহত হন কেমিকৌশল বিভাগের ১৯৯৯ ব্যাচের ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০০৬ সালের ১০ মার্চ হাইকোর্ট মুকিত, টগর সাগরের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এসএম মাসুম বিল্লাহ মাসুমকে খালাস দেন হাইকোর্ট। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মোকাম্মেল হায়াত খান মুকি পালিয়ে যান অস্ট্রেলিয়ায়। পলাতক রয়েছেন নুরুল ইসলাম সাগর ওরফে শুটার নুরু; জেলে রয়েছেন টগর।

১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল ছাত্রলীগের নেতা পার্থপ্রতিম আচার্যকে হত্যা করা হয়। ১৯৯৬ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জগন্নাথ হলে একজন মারা যান। ১৯৯৭ সালের ১১ জুলাই কার্জন হল এলাকায় খুন হন ছাত্রলীগের কর্মী তনাই। একই বছর শাহীন নামে এক ছাত্রের মৃতদেহ পাওয়া যায় কার্জন হলে। ১৯৯৭ সালে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বঙ্গবন্ধু হলে গুলি করে হত্যা করা হয় আরিফকে। প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও প্রতিবেদন দেয়া হয়নি।

ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন বলেন, একটি অনির্বাচিত, অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী সরকার জবরদখল করে ক্ষমতায় বসে আছে। তাদের কর্মকাণ্ড হচ্ছে দস্যুবৃত্তি করে টাকা কামানো, মানুষ খুন করা এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা। যেহেতু মূল দলেরই কাজ, তাই তাদের লালিত-পালিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ তো ধরনের কাজ করবেই। সেই ধরনের নৃশংস কাজের উদাহরণ হলো বুয়েটের ঘটনা। সরকারের পতন হয়ে গণতান্ত্রিক সরকার না আসা পর্যন্ত মানুষের জানমাল নিরাপদ হবে না।

আপনাদের আমলেও ক্যাম্পাসভিত্তিক অনেক সহিংসতা হয়েছে কিন্তু সেগুলোরও বিচার হয়নিএমন প্রশ্নের জবাবে মিলন বলেন, ওই সময় যা হয়েছে সেগুলো ছিল দুর্ঘটনা। কোনো একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই ঘটনাগুলো ঘটে গিয়েছিল। কিন্তু এখন যেগুলো হচ্ছে সেগুলো পরিকল্পিত। দুর্ঘটনা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

অন্যদিকে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক সহিংসতার বিচার হয় না, এটা সঠিক না। অনেকগুলো ঘটনার বিচার হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি বিশ্বজিৎ হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়েছে। আমরা মনে করি, সামাজিক নৈতিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক উগ্রতার কারণে এগুলো ঘটেছে। তবে ভিন্নমতের কাউকে হত্যা করা কাম্য নয়, কারো কাম্য হতে পারে না। ধরনের ঘটনার আমরা নিন্দা জানাই। বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত অনেক আসামি এখনো পলাতক রয়েছে বিষয়ে তিনি বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আটকের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত কাজ করছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন