শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

গেমিং কোম্পানির লাইসেন্সে অনলাইন ক্যাসিনো চালাতেন সেলিম

জুয়ার টাকা পাচার করতেন জাপান-থাইল্যান্ডে

নিজস্ব প্রতিবেদক

অনলাইন গেমিং ব্যবসার জন্য পি-২৪ গেমিং কোম্পানির নামে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছিলেন সেলিম প্রধান। যৌথ মূলধন কোম্পানি ফার্মগুলোর পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে কোম্পানিটির নিবন্ধনও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নিবন্ধনের শর্ত ভঙ্গ করে তিনি পরিচালনা করেছেন অনলাইন ক্যাসিনো। শুধু তা- নয়, ক্যাসিনো থেকে অবৈধ উপায়ে আয় করা বিপুল অর্থ পাচার করেছেন জাপান থাইল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশে। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে এসব তথ্য জানিয়েছেন প্রধান গ্রুপের কর্ণধার সেলিম প্রধান।

রাজধানীতে চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্যেই গত সোমবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশত্যাগের চেষ্টাকালে থাই এয়ারওয়েজের একটি উড়োজাহাজ থেকে সেলিম প্রধানকে আটক করে র‌্যাব। এরপর তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গুলশানে প্রধান গ্রুপের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ দেশী-বিদেশী মুদ্রা, মদ হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার মাদক আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্ত সেলিম প্রধানকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে র‌্যা জানায়, সেলিম প্রধান একজন মাদক ব্যবসায়ী। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত তিনি। ২০১৬ সালে থাইল্যান্ডে কোরিয়ার নাগরিক ডো বোং জো লিম ডু-নোনের সঙ্গে পরিচয় হয় সেলিমের। পরিচয় সূত্রে একটা সময় বন্ধুত্ব হয় তাদের মধ্যে। পরে সেলিম প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে অনলাইন ক্যাসিনো চালুর পরিকল্পনা করেন ডো বোং জো লিম ডু-নোন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে পি-২৪ গেমিং কোম্পানি লিমিটেড নামে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নেন সেলিম প্রধান। পাশাপাশি আরজেএসসির থেকেও কোম্পানিটির নিবন্ধন নেয়া হয়। এরপর কোরীয় ওই দুই নাগরিক বাংলাদেশে আসেন এবং ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু করেন। অনলাইন জুয়া থেকে তাদের উপার্জিত অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা হতে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, একটি গেটওয়ে দিয়ে মাসে কোটি টাকা পাচার করতেন সেলিম প্রধান। গেটওয়ে-সংক্রান্ত কাগজপত্রও র‌্যাবের হাতে এসেছে। বাকি দুটির বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। তিনটি গেটওয়ের বাইরে সেলিম লন্ডনেও টাকা পাচার করেছেন। গ্রেফতারের পর র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে তিনি স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

যে গেমিং কোম্পানির লাইসেন্স দিয়ে সেলিম প্রধান অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনা করেছেন, সেই লাইসেন্সটি দেয় ডিএসসিসি। ডিএসসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখা সূত্র জানায়, যে কোনো ব্যবসা পরিচালনার লাইসেন্স পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দেয়ার পর তা যাচাই-বাছাই করে লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। কেউ লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে তাত্ক্ষণিকভাবে লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি লাইসেন্সগ্রহীতার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

বিষয়ে জানতে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা উত্তর কুমার রায় বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করার সময় আবেদনকারীর সব তথ্য যাচাই করে দেখা হয়। পাশাপাশি নবায়নের সময়ও বিষয়গুলো পুনরায় যাচাই করে দেখা হয়। পি-২৪ গেমিং কোম্পানি লিমিটেডকে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে এসব নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি ডিএসসিসির কর্মকর্তা।

দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসা করে বিপুল পরিমাণ দেশী বিদেশী অর্থ অবৈধভাবে আয় করেছেন বলেও র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন সেলিম প্রধান। অবৈধভাবে আয় করা এসব অর্থ বিভিন্ন সময়ে থাইল্যান্ড, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন তিনি। এছাড়াও বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিউটি পার্লার স্পা সেন্টারে বিনিয়োগের কথাও র‌্যাবকে জানিয়েছেন থাই ডন হিসেবে পরিচিত সেলিম।

জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে ক্যাসিনো ব্যবসায়ী জানান, এক বছরে তিনি ৩২৪ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। তিনটি গেটওয়ের মাধ্যমে গত এক বছরে অনলাইন ক্যাসিনোর অর্থ পাচার করেন তিনি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, ১৯৭৩ সালে ঢাকায় জন্ম নেয়া সেলিম প্রধান ১৯৮৮ সালে চলে যান জাপানে। বড় ভাইয়ের সঙ্গে সেখানে কিছুদিন গাড়ির ব্যবসাও করেন। পরবর্তী সময়ে থাইল্যান্ডে গিয়ে শিপইয়ার্ডের ব্যবসা শুরু করেন। সেখানে এক কোরীয় নাগরিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

র‌্যাবের মুখপাত্র কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বণিক বার্তাকে বলেন, ওই কোরীয় নাগরিক সেলিম প্রধানকে বাংলাদেশে কনস্ট্রাকশন ব্যবসা করার প্রস্তাব দেন। একই সময় ক্যাসিনো ব্যবসার কথাও বলেন। কোরীয় নাগরিকের পরামর্শে সেলিম প্রধান ২০১৮ সালে বি-২৪ এবং টি-২১ নামে দুটি গেমিং সাইট খোলেন। সাইট দুটির মাধ্যমেই অনলাইন ক্যাসিনো শুরু হয় বাংলাদেশে। বাংলাদেশে কোরিয়ান নাগরিকের সঙ্গে ৫০:৫০ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ক্যাসিনো ব্যবসা করে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন তিনি। কাজে সেলিমের সঙ্গে কিছু বিদেশীর সম্পৃক্ততাও মিলেছে। তাদের বিষয়েও তদন্ত চলছে।

এদিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনলাইনে জুয়ার কারবারি সেলিম প্রধান তার দুই সহযোগীকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। দুই সহযোগী হলেন আক্তারুজ্জামান রোকন। গতকাল ঢাকার মহানগর হাকিম মইনুল ইসলাম তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন