শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

পাঁচদিনে ২০০ কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের

সাইদ শাহীন

হঠাৎ করেই আকাশচুম্বী হয়ে উঠলেও বাজারে পেঁয়াজের বেচাকেনার পরিমাণে খুব একটা হেরফের দেখা যায়নি এখনো। অস্বাভাবিক মূল্যেই বাজার থেকে নিত্যদিনের রান্নার অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গটি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ভোক্তারা। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতির সুযোগে বাজার থেকে শুধু গত পাঁচদিনেই প্রায় ২০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত মুনাফা তুলে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৪০ কোটি কেজি। সে হিসেবে দৈনিক চাহিদার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫ লাখ ৭৫ হাজার কেজির কিছু বেশি। অন্যদিকে বাজার থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গত পাঁচদিনে পেঁয়াজ ক্রয়ে কেজিপ্রতি গড়ে ৬০ টাকা করে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধে বাধ্য হয়েছেন ভোক্তারা। যদিও পণ্যটির কেনাবেচায় তেমন কোনো হেরফের ঘটেনি। সে হিসেবে পেঁয়াজের বাজার থেকে পাঁচদিনেই প্রায় ২০০ কোটি টাকা মুনাফা তুলে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, পেঁয়াজ আমদানি বা স্থানীয় উৎপাদনের ভিত্তিতে গড়ে তোলা মজুদ পণ্য দিয়ে আরো কয়েকদিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল। সব পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছে এমনিতেই ১২-১৫ দিনের পেঁয়াজ মজুদ থাকে। গত এক মাসের মধ্যে যেসব খুচরা পাইকারি ব্যবসায়ী, আমদানিকারক আড়তদার পেঁয়াজের মজুদ বাড়িয়েছিলেন, তাদের মুনাফা এখন সবচেয়ে বেশি। কেজিপ্রতি ৩৫-৪৫ টাকায় কেনা এসব পেঁয়াজ গত কয়েক দিনে বিক্রি হয়েছে ৯০-১১৫ টাকায়। তিন সপ্তাহ আগেও আমদানি করা পেঁয়াজের মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৪৫ টাকার নিচে। অন্যদিকে দেশী পেঁয়াজের ক্রয়মূল্য মজুদ ব্যয় মিলিয়ে সার্বিক খরচ ছিল ৫০ টাকার মধ্যেই।

বাজার থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, প্রতিবেশী ভারত পেঁয়াজের রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার আগেই দেশে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছিল পণ্যটির বাজার। সে সময় ভোক্তাদের পণ্যটির অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে কেজিতে ৩৫-৪৫ টাকা। ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি কেজি পেঁয়াজের মূল্য এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়ায় ১১৫ টাকায়। ওই সময়ে ভোক্তাদের অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কেজিতে প্রায় ৭৫ টাকারও বেশি। গত দুই দিনে ভোক্তাদের কাছ থেকে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কেজিপ্রতি মূল্য প্রায় ৫৫-৬০ টাকা বেশি নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সে হিসেবে গত পাঁচদিনে ভোক্তাদের পণ্যটি ক্রয়ে কেজিপ্রতি গড় অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৬০ টাকা।

ধরনের মুনাফা প্রবণতা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখনই প্রতিরোধ করা প্রয়োজন বলে অভিমত দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়ে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবসায়ীরা হলেন সবচেয়ে বেশি সুযোগসন্ধানী। ভারতের রফতানি বন্ধের সুযোগ নিচ্ছেন তারা। আড়তদার, আমদানিকারক থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের খুচরা পাইকারি ব্যবসায়ী এর সুবিধা নিচ্ছেন। ভোক্তাদের প্রতারিত করে বাড়তি মুনাফা করছেন তারা। যারা বেশি বাড়াবাড়ি করছেন, তাদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনতে হবে। আবার ধরপাকড় বেশি করলে পরিস্থিতি অন্যদিকে চলে যাবে। তাই সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মৌসুম না আসা পর্যন্ত আমদানির মাধ্যমে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে। পাশাপাশি মনিটরিংও জোরদার করতে হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) অ্যাসেজিং কম্পিটিশন ইন অনিয়ন মার্কেট অব বাংলাদেশ শীর্ষক এক গবেষণায়ও পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মুনাফা প্রবণতার তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ভোক্তা পরিশোধিত মূল্যে উৎপাদনকারীর আয়ের ভাগ থাকে মাত্র ৪৩ দশমিক শতাংশ। বাকি প্রায় ৫৬ শতাংশের পুরোটাই যায় কমিশন এজেন্ট, ফড়িয়া, ব্যাপারী, পাইকার খুচরা ব্যবসায়ীর পকেটে।

অন্যদিকে পেঁয়াজের মোট চাহিদার প্রায় ৭৩ শতাংশই দেশে উৎপাদন হয়। এর পরও দেশের বাজারে পণ্যটির মূল্য নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় অনুঘটকের কাজ করে পণ্যটি রফতানিতে প্রতিবেশী ভারতের অনুসৃত নীতি। কারণ বাংলাদেশে পণ্যটির আমদানি অতিমাত্রায় ভারতনির্ভর। পণ্যটির ঘাটতি পূরণে যে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, তার ৭৯ দশমিক ৬৫ শতাংশই আসে ভারত থেকে। কারণে ভারতে উৎপাদন কম হওয়া, শুল্কারোপ, বন্দর জটিলতাসহ সংশ্লিষ্ট যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পণ্যটির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। তাছাড়া উৎসবভিত্তিক চাহিদাও পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তবে কারণ যা- হোক না কেন, বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা সামান্যতম সুযোগেই পণ্যটির বাজার অস্থিতিশীল করে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক . আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবসায়ীরা যেখানে লাভ আছে, সে পণ্যই আমদানি কিংবা বিপণন করবে। কিন্তু তাদের অতি মুনাফার সুযোগ করে দেয়া যাবে না। রফতানি বাজার যেমন বহুমুখী করতে হবে, তেমনি উৎপাদন ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। সংকট থাকাকালে আমদানি সহজ করতে ছাড় দিতে হবে, আবার পেঁয়াজের মৌসুমে শুল্কারোপ করতে হবে। তাহলে ভোক্তা উৎপাদনকারীরাও লাভবান হবে, আবার ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার প্রবণতাও রোধ করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল ১৮ লাখ ৬৬ হাজার টন। পরের অর্থবছরে তা নেমে আসে ১৭ লাখ ৩৭ হাজার টনে। এরপর গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) এটি আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ হাজার টনে। অন্যদিকে বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ টন (২৪০ কোটি কেজি) অতিরিক্ত ছয়-সাত লাখ টন চাহিদা পূরণ করতে হয় আমদানির মাধ্যমে।

সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাণিজ্য সচিব . মো. জাফর উদ্দীন বলেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মজুদ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বাজার তদারকি করা হচ্ছে। একটি উচ্চপর্যায়ের টিম গঠন করা হয়েছে। ওই টিম পেঁয়াজ আমদানির পাশাপাশি পণ্যটি অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধ করতে পাইকারি বাজারগুলোতে অভিযান শুরু করেছে। টিসিবির মাধ্যমে সারা দেশে ট্রাকে করে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা যাতে বাড়তি মুনাফা করতে না পারেন, সেজন্য সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। স্থল নৌবন্দরগুলোয় আমদানীকৃত পেঁয়াজ দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বল্প সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন