বৃহস্পতিবার| ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০| ১৪ফাল্গুন১৪২৬

টকিজ

যুদ্ধদিনের চলচ্চিত্রে ’৭১-এর কথা

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মানুষের কাছে এক পরম প্রাপ্তির নাম স্বাধীনতা। পশ্চিম পাকিস্তানি দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অজস্র জীবনের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। নিঃসন্দেহে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের হূদয়ের সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ আখ্যান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাই এ সময়কাল নানা আঙ্গিকে ইতিহাসের আদলে বয়ে চলছে। শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম চলচ্চিত্রেও নির্মাতারা তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধের নানান দিকের বয়ান। তবে একেবারে গোড়ার, অর্থা মুক্তিযুদ্ধকালে সরাসরি রণাঙ্গনের দৃশ্য, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা, পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা, জাতিসংঘের অধিবেশনে ভুট্টোর নিরাপত্তা সনদ ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্যসহ তাদের নৃশংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে যুদ্ধকালীন এবং এর পর পরই যেসব চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে সেগুলো অনেক বেশি গুরুত্ব ও তাত্পর্য বহন করে। এসব চলচ্চিত্র সেই সময় যেমন সারা পৃথিবীর সামনে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে জনমত গড়তে ভূমিকা রেখেছিল, তুলে ধরতে পেরেছিল পাক সেনাদের বর্বরতাকে, ঠিক তেমনিভাবে আজ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্লেষণ করতে নতুন প্রজন্মকে রসদ দিচ্ছে। যে কারণে যুদ্ধদিনে নির্মিত চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র বারবার তার বহুমাত্রিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সামনে আসে।



একাত্তরের যুদ্ধের সময় যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল তার বেশির ভাগের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল দেশের ভেতরে। আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সে সময় দেশের ভেতরে ছবি তৈরির যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা তখন একেবারেই সম্ভব ছিল না। এজন্য সম্পাদনা পর্যায়ের কিছু কাজ হয় দেশের বাইরে। তবে মুক্তিযুদ্ধকালে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য একটি পৃথক বিভাগ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর প্রধান ছিলেন নির্মাতা আবদুল জব্বার খান। পাশাপাশি প্রবাসী সরকার চলচ্চিত্র নির্মাণে অর্থায়নও করেছিল।  মোটাদাগে বাংলাদেশ, ভারত, ফ্রান্স, জাপান, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ চলচ্চিত্রগুলোর অধিকাংশ নির্মিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারি উদ্যোগ ছাড়াও ব্যক্তি উদ্যোগে ব্রিটিশ, ফরাসি, জাপানি ও আমেরিকান টেলিভিশন সংস্থা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধকালের ছবির মধ্যে নির্মাতা জহির রায়হান নির্মিত স্টপ জেনোসাইড অগ্রগণ্য। এছাড়া এ সময় ভারত সরকারের অনুদানে নির্মিত হয়েছিল রিফিউজি ৭১, নাইন মান্থস টু ফ্রিডম ও লুট অ্যান্ড ডাস্ট নামের তিনটি ছবি। ভারতে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র গবেষক মো. নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল ভারতে। এগুলো হলো বাংলা ভাষায় নির্মিত কলকাতার উমা প্রসাদ মৈত্রের জয় বাংলা, বোম্বের আইএস জোহরের নির্মিত হিন্দি ভাষায় জয় বাংলাদেশ এবং সুকদেবের নাইন মান্থস টু ফ্রিডম, ঋতিক ঘটকের দুর্বার গতি পদ্মা, গীতা মেহতার ডেটলাইন বাংলাদেশ ও দুর্গা প্রসাদের দুরন্ত পদ্মা। এর মধ্যে জয় বাংলাদেশ ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন বাংলাদেশের অভিনেত্রী কবরী। যদিও ছবিটিতে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি বলে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তির মুখে ভারত সরকার ছবিটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে।


প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে সাদা-কালো ফরম্যাটে নির্মিত হয়েছিল ৯ মিনিট দৈর্ঘ্যের কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। এর মধ্যে রয়েছে আলমগীর কবির ও বাবুল চৌধুরীর লিবারেশন ফাইটার্স, জহির রায়হানের আ স্টেট ইজ বার্ন ও বাবুল চৌধুরীর ইনোসেন্ট মিলিয়নস। অন্যদিকে বিদেশী উদ্যোগে নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে মেজর খালেদস ওয়ার, ডেটলাইন বাংলাদেশ, এ কান্ট্রি মেড ফর ডিজাস্টার। এছাড়া জাপানের টিভি চ্যানেলের উদ্যোগে ১৯৭২ সালে নাগিসা ওশিমা নির্মাণ করেন রহমান, ফাদার অব বেঙ্গল ছবিটি।

জাপানের চলচ্চিত্র নির্মাতা নাগিসা ওশিমা আরো নির্মাণ করেছিলেন বাংলাদেশ স্টোরি নামের একটি ছবি। এছাড়া বিবিসি, এনবিসি, ফরাসি টিভি, সিবিএসের মতো বিদেশী টেলিভিশনের প্রতিনিধিরা মুক্তিযুদ্ধের খণ্ড খণ্ড দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র। যদিও ছবিগুলো সে অর্থে জনগণের সামনে আসেনি। এমনকি এগুলো সংগ্রহে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগও নেয়া হয়নি।

অন্যদিকে স্বাধীনতার পর পরই আলমগীর কবির মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যেসব স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ, টুওয়ার্ড গোল্ডেন বাংলা, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ও বাংলাদেশ ডাইরি।   

মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং এর পর পরই যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল তার মধ্য থেকে কয়েকটি নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হলো:

স্টপ জেনোসাইড

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত ঘটনাবলিকে ধারণ করে যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হয় সেগুলোর মধ্যে প্রথমটি নির্মাণ করেছিলেন জহির রায়হান; নাম স্টপ জেনোসাইড। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সামাজিক অঙ্গীকার গ্রন্থের ১৯৮৭ সংস্করণের ৬৯ পৃষ্ঠায় চিন্ময় মুত্সুদ্দী ছবিটি সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ করার ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা নেয়ার জন্য বিশ্ববিবেকের প্রতি আহ্বান ছিল স্টপ জেনোসাইড ছবিতে। কিন্তু এটাই ছবির একমাত্র বক্তব্য নয় এবং সেখানেই আমরা দেখি জহির রায়হানের গভীর অন্তর্দৃষ্টি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি দেখেছেন পৃথিবীর মুক্তিকামী সকল মানুষের দুর্জয় সংগ্রামের একটি অংশ হিসেবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন