শনিবার| জানুয়ারি ২৫, ২০২০| ১২মাঘ১৪২৬

শেষ পাতা

আওয়ামী লীগের সম্মেলন

নতুন মুখ হিসেবে প্রাধান্য সাবেক ছাত্রনেতাদেরই

তানিম আহমেদ

ছাত্রলীগের জন্ম আওয়ামী লীগেরও এক বছর আগে। আওয়ামী লীগ নেতারাও দলের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছাত্র সংগঠনটিকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন বরাবরই। বিশেষ করে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন মুখ সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এখন ছাত্রলীগের ত্যাগী পরীক্ষিত নেতাদেরই মূল্যায়ন করা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। আসন্ন সম্মেলনেও ধারার ব্যত্যয় হবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষ্যমতে, অতীতে দলটি যতবারই দুঃসময়ে পড়েছিল, ততবারই ছাত্রনেতা তৃণমূলের নেতারা এগিয়ে এসে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কারণে আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের সময়ও ছাত্রনেতাদের কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক দক্ষতা ইত্যাদি বিবেচনায় নেয়া হয়। এক্ষেত্রে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার পাশাপাশি কমিটির সদস্য অন্যদেরও কার্যক্রমের মূল্যায়ন করা হয়। অতীতে যারা বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন, সেসব ছাত্রনেতাকে মূল্যায়ন করা হবে এবারো।

দলটির নেতারা আরো জানান, আওয়ামী লীগের নেতা নির্বাচন করা হয় সম্মেলনের মাধ্যমে। বিগত কয়েকটি সম্মেলনে পদ দেয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে। এবারের সম্মেলনের মাধ্যমেও অনেক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দায়িত্বে আসবেন। যারা আগামীতে দল দেশকে নেতৃত্ব দেবেন। সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে সৎ, দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ সংগঠক, ত্যাগী, যোগ্য দুঃসময়ে দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, তাদেরই আগামীতে দায়িত্বে আনা হবে।

এবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন মুখ হিসেবে যারা আলোচনায় আছেন তারা হলেন চিফ হুইপ নূর--আলম চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, বাহাদুর বেপারী, মাহমুদ হাসান রিপন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অজয় কর খোকন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, শেখ সোহেল রানা টিপুছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মহিউদ্দিন হেলাল, শাহাবউদ্দিন ফরাজী, সাইফুদ্দিন আহমেদ নাসির, এএইচএম মাসুদ দুলাল, আবদুল মতিন, প্রশান্ত ভূষণ বড়ুয়া, আবদুল মতিন, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পনিরুজ্জামান তরুণ, সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক সালাহউদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, সাবেক দপ্তর সম্পাদক কাজী নাছিম আল মোমিন রূপক, সাবেক সদস্য মাজহারুল ইসলাম মানিক প্রমুখ। এছাড়াও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সীমান্ত তালুকদার, জহিরউদ্দিন মাহমুদ লিপটন, জয়দেব নন্দী প্রমুখও আলোচনায় আছেন বলে জানা গেছে।

এছাড়াও আলোচনায় রয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, বিদ্যুৎ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম, নাহিম রাজ্জাক, কাজী নাবিল আহমেদ, আকবর হোসেন পাঠান (নায়ক ফারুক), শিক্ষক নেতা শাহজাহান আলম সাজু, পুরান ঢাকার আহছানউল্লাহ পরিবারের সন্তান ফয়সাল আহছানউল্লাহ প্রমুখ।

দলটির বিগত পাঁচটি কেন্দ্রীয় কমিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কমিটিতে সবচেয়ে বেশি রদবদল হয়েছিল ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত ১৮তম সম্মেলনে। সে সময় নতুন দায়িত্ব পাওয়া ১৮ জনই অতীতে সরাসরি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অন্য যারা নতুন মুখ ছিলেন, তারা জড়িত ছিলেন তৃণমূল দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে। সে সময় নতুন দায়িত্ব পাওয়া সাবেক ছাত্রনেতাদের সম্পাদকমণ্ডলীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়। সে সময় দেশব্যাপী দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় এবারো তাদের উপরেই ভরসা সবচেয়ে বেশি। ওই কমিটিতে দায়িত্ব পাওয়া সাত সাংগঠনিক সম্পাদকের সবাই অতীতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় তৃণমূলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

ওই সম্মেলনে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানককে প্রথমে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়, পরে পদোন্নতি দিয়ে করা হয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা আহমদ হোসেন, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন খালিদ মাহমুদ চৌধুরী দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্পাদকমণ্ডলীতে স্থান পান সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু, আফজাল হোসেন। এছাড়া সম্পাদকমণ্ডলীতে স্থান পাওয়া ফরিদুন্নাহার লাইলী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা ছিলেন ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতা। উপদপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজের ভিপি ছিলেন। এছাড়া কমিটিতে স্থান পাওয়াদের মধ্যে তৃণমূলে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, বাহাউদ্দিন নাছিম আবদুল মতিন খসরু। কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা মমতাজ উদ্দিন মেহেদী, সুজিত রায় নন্দী, আমিনুল ইসলাম আমিন প্রমুখ। কমিটির সদস্যপদ পাওয়া টিপু মুনশিও অতীতে ছিলেন তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের নেতা। সদস্য করা হয়েছিল তৃণমূলের ছাত্রনেতা মজিবর রহমান মজনুকেও। কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আজম ছিলেন এর আগে আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক।

এরপর সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ২০তম সম্মেলনেও সাবেক ছাত্রনেতাদেরই প্রাধান্য দেয়া হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক করা হয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদেরকে। সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুর রহমানকে সদস্য থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। ঘোষিত কমিটিতে চমক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন। তাকে বন পরিবেশ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। বিগত তিন বছরে তিনি দায়িত্ব পালনে দক্ষতারও পরিচয় দেন। অর্থ পরিকল্পনা সম্পাদক করা হয় সাবেক ছাত্রনেতা টিপু মুনশিকে।

ওই সম্মেলনে সম্পাদকমণ্ডলীতে স্থান পাওয়া সাবেক ছাত্রনেতারা হলেন শামসুন নাহার চাঁপা, রোকেয়া সুলতানা, আব্দুস সবুর। সাবেক ছাত্রনেতা বিপ্লব বড়ুয়াকে প্রথমে কার্যনির্বাহী সদস্য, পরে উপদপ্তর সম্পাদক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। কার্যনির্বাহী সদস্য করা হয় রাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল ইসলাম ঠান্ডু, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নজিবুল্লাহ হিরু, আমিরুল ইসলাম মিলন, পারভীন জামান কল্পনা, আনোয়ার হোসেন, ইকবাল হোসেন অপু, রিয়াজুল কবির কাওছার, গোলাম রাব্বানী চিনু, মারুফা আক্তার পপি প্রমুখকে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয় রেমন্ড আরেংকে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খানকে কার্যনির্বাহী সদস্য করা হয়।

এছাড়া তৃণমূলের নেতা পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য রমেশ চন্দ্র সেনকে সভাপতিমণ্ডলী সদস্য এবং রাফিকুল ইসলামকে সদস্য করা হয়।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, দলের প্রয়োজনে কৃষক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সহযোগী ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের বিভিন্ন পদে দায়িত্বে থাকা যোগ্য, দক্ষ নেতাদেরও কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দেয়া হবে। সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ, কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা এবং মহিলা শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি রওশন জাহান সাথীর নাম আলোচনা রয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবার যোগ হতে পারেন বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী। এক্ষেত্রে অতীতে যারা দলের জন্য অবদান রেখেছেন, তাদেরই বিবেচনা করা হবে।

নতুন নারী নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনায় আছেন মহিলা শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি রওশন জাহান সাথী। সাথী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফের সহধর্মিণী। তৃণমূল থেকে মূল্যায়িত হতে পারেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। জাতীয় নেতা শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের মেয়ে সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসতে পারেন। আলোচনায় আছেন ব্যারিস্টার ফারজানা মাহমুদ, সংসদ সদস্য জয়া সেনগুপ্ত, সাগুফতা ইয়াসমিন, ওয়াসিকা আয়শা খান, মেহের আফরোজ চুমকি, সাবেক সংসদ সদস্য মাহজাবিন খালেদ, নুরজাহান বেগম মুক্তা, ফজিলাতুন নেছা বাপ্পী, আমেনা কোহিনূর প্রমুখ।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, পরীক্ষিত, দলের আদর্শের প্রতি অনুগত, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ শিকার করেছেন এবং সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন এমন ছাত্রনেতারা অবশ্যই সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্বে আসবেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, ছাত্রলীগের দক্ষ, পরীক্ষিত, ত্যাগী সৎ নেতাদের যথাসময়ে যথাস্থানে মূল্যায়ন করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন