রবিবার| জানুয়ারি ১৯, ২০২০| ৬মাঘ১৪২৬

টকিজ

বিদায় ক্যামেরার সারথি

ফিচার প্রতিবেদক

প্রিয়জনদের কথায় মাহফুজুর রহমান খান...

দীর্ঘ পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন সিনেমাটোগ্রাফার মাহফুজুর রহমান খান অনেকের সঙ্গেই তার ছিল আত্মিক সম্পর্ক যাদের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছেন আবদুল লতিফ বাচ্চু; মূলত বাচ্চুর হাত ধরেই সিনেমাটোগ্রাফির জগতে তার পথচলা তার বন্ধুর তালিকায় রয়েছেন কবরী সুচন্দার মতো অভিনেত্রীরা গতকাল এফডিসিতে টকিজের মুখোমুখি হয়ে তারা বললেন তাদের প্রিয় মানুষ মাহফুজুর রহমান খানকে নিয়ে

দেশের প্রখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার মাহফুজুর রহমান খানকে চোখের জলে বিদায় দিল তার প্রিয় প্রাঙ্গণ এফডিসি গতকাল বিকালে এফডিসিতে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় জানাজায় উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা, অভিনেত্রী, প্রযোজক, পরিবেশকসহ তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা এর পর মাগরিবের নামাজের পর তাকে আজিমপুর গোরস্তানে দাফন করা হয় গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ২৬ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে মাহফুজুর রহমান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এর আগে ২৫ নভেম্বর রাতে বাসায় খাবার খাওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন মাহফুজুর রহমান খান সময় খাবার তার খাদ্যনালির বাইরে চলে গেলে জ্ঞান হারান এরপর স্বজনরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন তখন তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয় যদিও পরে তার শারীরিক অবস্থা ক্রমে অবনতির দিকে চলে যায়

মাহফুজুর রহমান খান ১৯৪৯ সালের ১৯ মে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি পেশাদার সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন স্বাধীনতা যুদ্ধের পরের বছর থেকে এরপর বিরতিহীনভাবে অসংখ্য ছবির সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন; অর্জন করেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সর্বাধিক সংখ্যক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের খেতাব শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে তার ঝুলিতে রয়েছে ১০টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এছাড়া আটবার বাচসাস পুরস্কার লাভ করেছেন তিনি কাজ করেছেন আলমগীর কবির, আলমগীর কুমকুম, হুমায়ূন আহমেদ শিবলী সাদিকের মতো নির্মাতাদের ছবিতে তিনি যেসব ছবির চিত্রগ্রহণ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে অভিযান, পোকা মাকড়ের ঘরবসতি, সহযাত্রী, হাজার বছর ধরে, আমার আছে জল, ঘেটুপুত্র কমলা

নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দিশা ইন্টারন্যাশনালের ব্যানারে নির্মাণ করেছেন নীতিবান, সম্মান, দুর্নাম কারফিউ নামে চারটি ছবি তিনি অভিনয় করেছেন আবদুল্লাহ আল মামুনের জল্লাদের দরবার; আলমগীর কুমকুমের জন্মভূমি ছবিতে

আবদুল লতিফ বাচ্চু

সিনেমাটোগ্রাফার


 

সন্তান যদি পিতার আগে মারা যায়, তাহলে পিতার কী অনুভূতি হয়, তা পিতা না হওয়া পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারে না মাহফুজকে হারিয়ে সন্তান হারানোর বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়েছি চলে যাওয়ার পর বুঝতে পারছি আমার কতটা আপন ছিল মাহফুজ ছিল আমার যোগ্য সহকারী উত্তরসূরি এমন সহকারী আর কখনো পাব না আমার হাত ধরে ক্যামেরাকে বুঝতে শিখেছিল, এরপর নিজে নিজেই অনেক কিছু করেছে, ক্যামেরাকে নানা নিরীক্ষায় সে ব্যবহার করেছে পরিচালকরা ক্যামেরাম্যানদের কাছ থেকে যা প্রত্যাশা করতেন, তা মাহফুজ অক্ষরে অক্ষরে পূরণের চেষ্টা করেছে গুরু হিসেবে গর্ববোধ করি এমন শিষ্যকে আর নাম ধরে কাছে ডাকতে পারব না! ভাবতেও পারছি না, মাহফুজ আর কোনো দিন আমার সামনে আসবে না

কবরী, অভিনেত্রী


মাহফুজুর রহমান খানের প্রথম পরিচয় তিনি অত্যন্ত মানবিক বন্ধুবৎসল তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের তিনি আমার ভালো বন্ধু সরলতা দিয়ে অন্যের হূদয়কে শুদ্ধ করার যে শক্তি, তা মানুষটির মধ্যে প্রবল ছিল আমরা একটি ছবির পরিকল্পনা করেছিলাম সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর চোখের চশমার ফ্রেমের ভেতর থেকে বাংলাদেশকে দেখাতে চেয়েছিলেন আইডিয়াটা ছিল দারুণ আমরা সবসময় তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতাম

ওনার চলে যাওয়ায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অনেক কিছু হারাল তিনি যে কাজ করে রেখে গেছেন, তা অত্যন্ত শিল্পমানসমৃদ্ধ একজন সৎ মানুষ হিসেবে তিনি যে জীবনযাপন করেছেন, তার কাজেও সে ছাপ অক্ষুণ্ন ছিল সবসময়ই তার কাজগুলো সুউচ্চ বলে বিবেচিত হবে তিনি ১০ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন, এটা যেমন অনেক গৌরবের, তার চেয়েও গৌরবের তিনি আমাদের চলচ্চিত্রকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন তিনি তার কাজ দিয়ে বেঁচে থাকবেন

সুচন্দা, অভিনেত্রী নির্মাতা


এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মাহফুজুর রহমান খান সেই নক্ষত্র হঠাৎ করে আকাশ থেকে ঝরে পড়ল আমাদের সবাইকে ফাঁকি দিয়ে অনন্তের পথে চলে গেলেন এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে মাহফুজকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি দুটো ছবির কথা বলতে পারি, একটি তিনকন্যা, আরেকটি আমার নির্মিত হাজার বছর ধরে এর মাধ্যমে ওকে অনেক কাছ থেকে দেখেছি এত হাস্যোজ্জ্বল, সুন্দর মনের মানুষ আর কখনো হয়তো পাব না কোনো দিন তার মুখে কারো বিরুদ্ধে বদনাম করতে শুনিনি

মাহফুজ আমাকে প্রায়ই ফোন করত কিছুদিন আগেও ফোন করে জানতে চেয়েছিল, আমি কেমন আছি অনেক সময় অভিমানের সুরে একটা কথাই আমাকে বলত, ম্যাডাম আপনি কেন চুপচাপ বসে আছেন? কেন কাজ শুরু করছেন না? আপনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি তো আর পারছি না, আমার তো মনে হয় আমার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে! মাহফুজ আরেকটি কথা বলেছিল, আমাদের দিন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, আমরা সবাই চলে যাব আমাদের শুধু কাজগুলোই রয়ে যাবে মাহফুজ ঠিকই বলেছিল, কিন্তু যে এত শিগগিরই এভাবে চলে যাবে, তা ভাবতে পারিনি মাহফুজকে বলেছিলাম, আমার জীবনের শেষ দুটি ইচ্ছার কথা জহির রায়হানের গল্প থেকে দুটি ছবি বানাতে চেয়েছিলাম, যার সিনেমাটোগ্রাফি করার কথা ছিল ওর কিন্তু আমার সে ইচ্ছাও পূরণ হলো না

 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন