শনিবার| জানুয়ারি ১৮, ২০২০| ৫মাঘ১৪২৬

প্রথম পাতা

সঠিক নিয়মে খাবার পায় না ৬৬% শিশু

ফয়জুল্লাহ ওয়াসিফ

অনেক পরিবারের সামর্থ্যের অভাব নেই। পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার ক্রয়ের যথেষ্ট সক্ষমতা আছে। ঘাটতি কেবল সচেতনতার। অনেকে আবার সচেতন হলেও সামর্থ্য নেই। পরিবারগুলোর সামর্থ্য সচেতনতার অভাবে সঠিক নিয়মে খাবার পাচ্ছে না শিশুরা। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ জনতাত্ত্বিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার তথ্য বলছে, স্বীকৃত চর্চা আইওয়াইসিএফ (ইনফ্যান্ট অ্যান্ড ইয়াং চাইল্ড ফিডিং) অনুযায়ী খাবার খাওয়ানো হচ্ছে দেশের মাত্র ৩৪ শতাংশ শিশুকে। থেকে ২৩ মাস বয়সী ৬৬ শতাংশ শিশুই সঠিক নিয়মে খাবার পাচ্ছে না।

শিশুদের রীতি মেনে না খাওয়ানোর চর্চাকে দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রতিবন্ধক হিসেবে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শিশুর ছয় মাস বয়সে বুকের দুধের পাশাপাশি সম্পূরক খাবার দেয়ার নিয়ম থাকলেও তাতে বিলম্ব হচ্ছে। সম্পূরক খাবার দিলেও তাতে বৈচিত্র্য থাকছে না। ভাত, ডাল, সুজিই বেশি খাওয়ানো হচ্ছে। মাছ-মাংসের মতো প্রাণিজ আমিষ ফলমূল সেভাবে পাচ্ছে না দরিদ্র পরিবারের শিশুরা। ফলে দুর্বল হয়ে বেড়ে উঠছে এসব শিশু। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও ব্যাহত হচ্ছে তাদের।

শারীরিক সমস্যা নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুদের একজন সিলেটের খাদিম চা বাগানের অধীর মোদি। মা কাজল মোদি জন্মের পর ছেলেকে বুকের দুধ খাইয়েছেন ঠিকই, তবে ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও বাড়তি তেমন কিছু খাওয়াতে পারেননি। বাড়িতে তৈরি নরম ভাত খাইয়েছেন কেবল। পাঁচ বছর পূর্ণ করা অধীর বেড়ে উঠছে দুর্বল হয়ে। অন্য শিশুদের মতো খেলাধুলা-চঞ্চলতায় মন নেই তার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক . নাজমা শাহীন বলেন, ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুদের খাবারে কী থাকবে সে বিষয়ে একটি গাইডলাইন আছে। ঠিকমতো তা অনুসরণ না করলে শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিকল্প সহায়ক খাদ্যগুলো পরিমাণমতো না পেলে তাদের ওজনস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। কম পুষ্টি পাওয়া এসব শিশু বয়সকালে শারীরিক নানা সমস্যায় ভোগে।

আইওয়াইসিএফ নির্দেশিকা অনুযায়ী, শিশুর জন্মের আধা ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়াতে হয়। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ এবং এরপর সম্পূরক খাবার দিতে হয় শিশুকে। তবে সেই খাবার হতে হয় পর্যাপ্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ। দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে অবশ্যই বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। সম্ভব হলে আরো বেশিদিন খাওয়ানো যেতে পারে।

নিয়ম অনুযায়ী, ছয় থেকে আট মাস বয়সী শিশুকে দিনে অন্তত দুবার সলিড অথবা সেমিসলিড খাবার দিতে হয়। থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের দিতে হয় দিনে অন্তত তিনবার। তবে ক্ষেত্রবিশেষে সলিড, সেমিসলিড কিংবা দুধজাতীয় খাবার দিনে চারবারও দেয়া যেতে পারে।

স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (নিপোর্ট) সারা দেশের থেকে ২৩ মাস বয়সী হাজার ৩০৫ জন শিশুর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেছে, মাত্র ৩৩ দশমিক শতাংশ শিশুকে নির্দেশিকা মেনে খাবার খাওয়ানো হচ্ছে। হিসাবে ৬৫ দশমিক শতাংশ শিশু নির্দেশিকা অনুযায়ী খাবার পাচ্ছে না। যদিও পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। ২০১৪ সালের জরিপে আইওয়াইসিএফ অনুযায়ী খাবার না পাওয়া শিশুর হার ছিল ৭৭ শতাংশ।

গ্রাম শহরের শিশুদের মধ্যে সঠিক নিয়মে খাবারপ্রাপ্যতার হারে তফাত আছে। শহরে ৩৯ শতাংশ শিশুকে রীতি মেনে খাবার খাওয়ানো হলেও গ্রামে হার ৩২ শতাংশ। আর বিভাগ হিসেবে সঠিক নিয়মে খাবার পায় সবচেয়ে বেশি রংপুর বিভাগের শিশুরা। বিভাগের ৪১ দশমিক শতাংশ শিশুকে সঠিক নিয়মে খাবার দেয়া হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে সিলেট বিভাগ। বিভাগের মাত্র ২৬ দশমিক শতাংশ শিশুকে আইওয়াইসিএফ অনুযায়ী খাবার খাওয়ানো হয়। খর্বাকৃতি, কৃশকায় কম ওজনের শিশুও তাই বিভাগেই বেশি।

সঠিক নিয়মে খাবার না পাওয়ার কারণে এসব শিশু পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতায় ভোগে বলে জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সুষম খাদ্যের অভাব পড়লে শিশুদের শারীরিক মানসিক উভয় সমস্যাই হতে পারে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে শিশুর শারীরিক গঠন ব্যাহত হয়। এমনকি তাদের বৌদ্ধিক বিকাশও ব্যাহত হতে পারে।

আয় বিবেচনায়ও পরিবারভিত্তিক শিশুদের সঠিক নিয়মে খাবারপ্রাপ্তির হারে তারতম্য আছে। দেশের সর্বোচ্চ আয়শ্রেণীর পরিবারগুলোর ৪৭ দশমিক শতাংশ শিশু পর্যাপ্ত খাবার পেয়ে থাকে। যদিও সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুদের মধ্যে হার মাত্র ২৩ দশমিক শতাংশ।

নিয়ম অনুযায়ী পর্যাপ্ত খাবার পায়নি সিলেটের শ্রীপুর এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশু সায়মন। নিজের অসুস্থতার কারণে ছেলেকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেননি মা আয়মন বেগম। সন্তান জন্মের মাস দুয়েক পরই পাথর ভাঙার কাজে যোগ দিতে হয় তাকে। ছয় মাস বয়স হওয়ার আগেই সায়মনকে সম্পূরক খাবার দেয়া হলেও মাছ-মাংসের মতো আমিষ তাতে ছিল না। সায়মনের বয়স এখন সাত বছর। স্কুলেও ভর্তি হয়েছে। কিন্তু কিছুই মনে রাখতে পারে না। স্কুলের পড়ালেখা তো নয়-, সকালে বলা কথা ভুলে যায় বিকালেই।

একই অবস্থা কুড়িগ্রাম পৌরসভার পাঠানপাড়া এলাকার রাজু-সাজেদা দম্পতির সন্তান রাফিয়ারও। পাঁচ মাস বয়স থেকেই বুকের দুধের পাশাপাশি সম্পূরক খাবার পাচ্ছে সে। চালের গুঁড়ো সিদ্ধ করে নিয়ম করে খাওয়ানো হচ্ছে। বয়স এক বছর পেরিয়ে গেলে প্রাণিজ আমিষ বা ফল সেভাবে খাওয়াতে পারেন না দম্পতি।

সমস্যা সমাধানে পরিবার, সমাজ রাষ্ট্র সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া। তিনি বলেন, সব শিশুর মৌলিক খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এটাও খেয়াল রাখতে হবে, খাবারে পর্যাপ্ত পুষ্টি যেন থাকে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন