রবিবার| জানুয়ারি ২৬, ২০২০| ১৩মাঘ১৪২৬

শেষ পাতা

উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল যাবে কমলাপুর পর্যন্ত

সমন্বয় চায় রেলওয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকায় উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের প্রথম মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-) দুই ভাগে চলছে নির্মাণকাজ। উত্তরা-আগারগাঁও অংশের কাজ এগিয়েছে ৬৫ শতাংশ। আগারগাঁও-মতিঝিল অংশের অগ্রগতি প্রায় ৩৫ শতাংশ। নির্মাণকাজের পর্যায়ে এসে মেট্রোরেলের লাইনটি কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এতে রেলস্টেশনের যাত্রীরা মেট্রোরেল ব্যবহারেরও সুযোগ পাবে, এমন যুক্তিই দিচ্ছেন ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা।

তবে লাইনটি কমলাপুর পর্যন্ত বাড়ানো হলে রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সেটি বাস্তবায়নের কথা বলছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। সমন্বয় না হলে বর্ধিত অংশটি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের যাত্রীসেবায় বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি স্টেশনের আধুনিকায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। সে অনুযায়ী এগিয়ে নেয়া হচ্ছে নির্মাণকাজ। বর্ধিত অংশটুকু যেন পরিকল্পনায় বিঘ্ন না ঘটায়, সেজন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো শুরু করে দিয়েছে ডিএমটিসিএল। উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য ২০ দশমিক কিলোমিটার। মতিঝিল-কমলাপুরের বর্ধিত অংশটির দৈর্ঘ্য হবে আরো দশমিক ১৬ কিলোমিটার।

নির্মাণের মাঝপথে মেট্রোরেলটি বর্ধিত করার সিদ্ধান্তকে কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শী পরিকল্পনার ফসল হিসেবে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক . সামছুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্পের কাজ অর্ধেকের বেশি শেষ হতে চলল। এখন লাইনটা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলো। এটা অনেকটা জোড়াতালি দেয়ার মতো। আমাদের এখানে উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু সেটা সমন্বিতভাবে হচ্ছে না। সমন্বয়হীনতার উন্নয়ন ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাপনাটিকে দিন দিন জটিল করে তুলছে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে লাইনটির পরিসর কমলাপুর পর্যন্ত বাড়ানো সম্পর্কে ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথমে মেট্রোরেলের রুট ছিল উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। রুটটির সঙ্গে কমলাপুরের কোনো সংযোগ ছিল না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক যাত্রী কমলাপুরে নামে। সেখান থেকে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বাস বা সিএনজি অটোরিকশাই প্রধান ভরসা যাত্রীদের, যা অনেক সময়ই প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকে। ফলে কমলাপুরে নেমে যাত্রীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলটি কমলাপুর পর্যন্ত নিয়ে গেলে স্টেশনে আসা যাত্রীদের একটা বড় অংশ সেটি ব্যবহার করতে পারবে।

উত্তরা থেকে মিরপুর, আগারগাঁও, ফার্মগেট, শাহবাগ, সচিবালয় হয়ে মতিঝিলপুরো লাইনটিই হচ্ছে রাস্তার ওপর দিয়ে। ভূমি অধিগ্রহণ বা স্থায়ী স্থাপনা অপসারণের খুব বেশি দরকার হয়নি। কিন্তু মতিঝিল থেকে কমলাপুরে মেট্রোরেলটি সড়কের ওপর দিয়ে নেয়াটা সম্ভব নয়। কারণ মতিঝিল-কমলাপুর সড়কে একাধিক মোড় রয়েছে, যেগুলো ৪৫ থেকে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁকানো। এসব বাঁক দিয়ে ট্রেন চলাচল সম্ভব নয়। কারণে মতিঝিল-কমলাপুর অংশটি নির্মাণ করতে হবে বাণিজ্যিক এলাকার ওপর দিয়ে। যে রুট চূড়ান্ত করা হয়েছে, সেখানে অন্তত ৩১টি ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থায়ী স্থাপনা রয়েছে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণ করতে হলে এই ৩১টি স্থায়ী স্থাপনা ভাঙতে হবে। ফলে নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলক বেশি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিষয়ে জানতে চাইলে বর্ধিত অংশের নির্মাণ ব্যয়ের জন্য বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে না বলে জানিয়েছেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক। তিনি বলেন, আট প্যাকেজে প্রকল্পের কাজ হচ্ছে। প্রথম প্যাকেজটি ছিল ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন। বরাদ্দ ছিল ৫০০ কোটি টাকা। কাজ শেষে সেখান থেকে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা অব্যয়িত রয়েছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত। ২০২১ সালের মধ্যেই যদি আমরা কাজ শেষ করতে পারি, তাহলে অন্যান্য প্যাকেজেও এমন সাশ্রয় হবে, যা বর্ধিত অংশটি বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলটি কমলাপুর পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে কিছুটা আপত্তি সংশয় প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, কমলাপুরে এমনিতেই দুটি মেট্রোরেল স্টেশনের জন্য নির্ধারিত আছে। একটি বিমানবন্দর-কমলাপুর মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-) আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন, অন্যটি কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-) এলিভেটেড স্টেশন। গাবতলী-চিটাগং রোড মেট্রোরেলও (এমআরটি লাইন-) কমলাপুর দিয়েই যাবে। রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় এতগুলো মেট্রোরেল স্টেশন হলে, তার বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান বিষয়টি নিয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, এক কমলাপুর স্টেশনেই এতগুলো মেট্রোরেল চাপিয়ে দেয়া হলে, রেলওয়ে স্টেশনটির যাত্রীসেবা বিঘ্নিত হতে পারে। পাশাপাশি স্টেশনটি আধুনিকায়নের যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেটির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের বর্ধিতাংশ।

তবে রেলওয়ে মহাপরিচালকের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশনের সৌন্দর্যে কোনো ক্ষতি না করেও আমরা সেখানে মেট্রোরেলের স্টেশন বানাব। আগে হয়তো এটা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এখন প্রযুক্তি অনেক দূর এগিয়েছে। কমলাপুরে মেট্রোরেল স্টেশন নির্মাণের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বণিক বার্তাকে বলেন, কমলাপুরে মেট্রোরেলের স্টেশন হলে যাত্রীদের সুবিধা হবে। তবে এটি হতে হবে পরিকল্পিতভাবে। তা না হলে স্টেশনটি আমাদের কার্যক্রমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। তাই স্টেশনটি নির্মাণে রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয় থাকাটা খুব জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন