শনিবার| জানুয়ারি ১৮, ২০২০| ৫মাঘ১৪২৬

টকিজ

‘আমার তারেক বেঁচে আছে’

নুরুন্নাহার মাসুদ। দ্বিতীয় কোনো পরিচয়ের হয়তো প্রয়োজন নেই; তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আকাশের ধ্রুবতারা তারেক মাসুদের মা। ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নুরপুর গ্রামের যে বাড়ির আঙিনায় ঘুমিয়ে আছেন তারেক মাসুদ, সেই বাড়িতেই তার বসবাস। দিনের বেশির ভাগ সময় তিনি কাটান প্রিয় সন্তানের সমাধিস্থলকে চোখে চোখে রেখে। গতকাল টকিজের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন, তখনো তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তারেকের সমাধির সামনে। আজ চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের ৬৩তম জন্মদিন উপলক্ষে তার মা নুরুন্নাহার মাসুদের সঙ্গে টকিজের সে কথোপকথন তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রুবেল পারভেজ

আগামীকাল (আজ) আপনার সন্তান তারেক মাসুদের ৬৩তম জন্মদিন...

কোনো উপলক্ষ কিংবা মুহূর্ত নয়, তারেককে নিয়ে কথা বলতে পারলেই শান্তি পাই। আমার বুকের ধন, আমার প্রিয় তারেক, তোকে ছাড়াই তোর জন্মো, এ তো আমি চাইনি! আমার সবসময় মনে হয়, তারেক বেঁচে আছে। এ কথা ও আমাকে নিজেই বলেছিল স্বপ্নে দেখা দিয়ে। মাটি দেয়ার পর তারেক স্বপ্নে এসে আমাকে ডেকে কাছে বসিয়েছিল। বললাম, ‘তারেক কী হয়ে গেল বাবা তোমার? তোমাকে যারা ভালোবাসে, সেই তারাই তোমাকে মাটির ভেতরে শুইয়ে দিয়ে গেল?’ আমার প্রশ্নে বলল, ‘আম্মা কিছু জানি না, আমি বেঁচে আছি। তো কই, ‘আমি তো তোমাকে খুঁজছি, কোথায় তুমি?’ এই তো কয়েক দিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে ম্যাজিক লণ্ঠন নামের যে চলচ্চিত্র সংগঠনটি আছে, ওদের আয়োজনে গিয়ে মনে হয়েছিল, আমার তারেক এ অনুষ্ঠানের মধ্যেই আছে। আসলে এ অনুভূতি নিয়ে আমি বেঁচে আছি।

 

নতুন প্রজন্মের মাঝে তারেক মাসুদের ছায়া দেখেন কতটা?

মা বলুন আর দর্শক বলুনআমি বিশ্বাস করি, তারেক যে ছবিগুলো বানিয়ে গেছে, সেসব ছবি দেখে শত শত তারেক তৈরি হবে। একজন মা হিসেবে এটা আমার কাছে আনন্দের ব্যাপার। আমি মনে করি, তারেক যা করে গেছে, তারেক যে স্বপ্ন দেখে গেছে, নতুন প্রজন্ম অক্ষরে অক্ষরে তা পূরণ করছে। এই দূর গ্রামে এখনো নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে, তারেকের প্রতি তাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আমি ওদের ভেতর তারেকের ছায়া দেখতে পাই।

 

আপনি তার সিনেমা দেখেন এখনো?

তারেক আমাকে ওর সিনেমা আগে দেখাত, আমাকে ও হলেও নিয়ে গেছে। মাটির ময়না দেখেছি, মুক্তির গান যখন আনল তখন দেখেছি। এখন তো দেখার মতো তেমন সুযোগ পাই না। তবে তারেককে নিয়ে ফেরা নামের যে ছবিটা আছে, ওটা দেখলে মনে হয়, আমার তারেক বেঁচে আছে। ছবিটা দেখতে বড় ভালো লাগে আমার।

 

তার বানানো সিনেমা দেখার পর কেমন বোধ করেন?

আমি গর্বিত বোধ করি। ওর ছবি দেখে মনে হয়, এত কষ্ট করেছে আমার বুকের ধন! ও জীবিত থাকতে কেন বুঝিনি। এখন তিলে তিলে বুঝতে পারছি। সত্যি বলতে কি, তারেক যে এত বড় মাপের নির্মাতা হয়ে যাবে তা বুঝিনি। কিন্তু এত বড় হয়েও তো কিছু হলো না। শেষ পর্যন্ত চলেই গেল। আমার মনে হয়, তারেক যদি এত বড় মাপের পরিচালক না হতো, তাহলে বোধহয় আমার সন্তানকে বুকে নিয়ে আমি আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকতে পারতাম।

 

নিজের সন্তানের ছবি নিয়ে যখন দেখেন কোথাও আলোচনা হচ্ছে...

মা হিসেবে শান্তি পাই। যারা ওকে নিয়ে, ওর ছবি নিয়ে চর্চা করে, যারা আমার তারেককে বাঁচিয়ে রাখছে, তাদের জন্য আমি দোয়া করি। তারাও আমার সন্তানের মতো।

 


আপনাদের মা-ছেলের সম্পর্ক কেমন ছিল?

ও আমাকে বন্ধুর মতো জানত, শ্রদ্ধা করত খুব। আমার জন্য ও অনেক চিন্তাভাবনা করত। আমাকে কোনো কাজ করতে দিতে চাইত না। বলত, ‘আম্মা, তুমি আমার কাছে বসো, বসো। এ কথাটিই বেশি বলত। কোনো কিছু  দরকার হলে আম্মা বলে জোরে ডাক দিত। বিনা প্রয়োজনেও একইভাবে ডাক দিত। বলতাম, ‘এত ডাকো কেন?’ ও বলত, ‘বসো বসো। আসলে ও সবসময়ই আমাকে পাশে রাখতে চাইত। ওর আব্বা মারা যাওয়ার পর বলত, ‘আমার মায়ের কাছে কেউ না থাকলে আমি থাকব।

 

আপনার অভিযোগ, তারেক মাসুদকে ইচ্ছাকৃতভাবে মারা হয়েছে।

কেন অভিযোগ করব না? আমি নিশ্চিত, ওকে ইচ্ছাকৃতভাবে মারা হয়েছে। তারেকরা যে গাড়িতে ছিল, সেটা অনেক উঁচু ছিল। ক্যাথরিন আমাকে বলেছিল, ওদের গাড়িটাকে প্রথমে বাসটি ধাক্কা দিল, এরপর উপরে উঠে গেল। মানুষভর্তি বাসটা যখন ওদের গাড়ির উপরে উঠে যায়, তখন গাড়ির ছাদে তারেকের মাথা লাগে। ওর শরীরের কোথাও কাটেনি পর্যন্ত। শুধু মাথায় আঘাত লেগে সব শেষ হয়ে গেল। আমি আল্লাহর কাছে বলেছিলাম, আল্লাহ তুমি আমার তারেককে ফিরিয়ে দাও, আমার সহায়-সম্পত্তি সব দান করে দেব। কিন্তু এ প্রার্থনার আগেই তারেক চলে গেছে।

 

তারেকের স্বপ্ন পূরণ করতে আপনার পুত্রবধূ ক্যাথরিন মাসুদ যা করছেন...

আমি ক্যাথরিনকে ধনবাদ দিই। ক্যাথরিন অনেক কাজ করেছে। আসলে ক্যাথরিনকে আল্লাহ আমাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। তারেকের চেয়ে ক্যাথরিনকে বেশি ভালোবাসতাম। সিনেমার কাজকর্ম নিয়ে তারেকের সঙ্গে যখন মাঝেমধ্যে ওর খুনসুটি লাগত, তখন আমি ক্যাথরিনের পক্ষে কথা বলতাম। তখন তারেক বলত, ‘আম্মা তুমি আমার পক্ষে নেই?’ বলতাম, ‘না, আমি ক্যাথরিনের পক্ষে।

 

আপনার নাতি নিষাদের সঙ্গে কথা হয়?

না, খুব বেশি যোগাযোগ করতে পারি না। একবার কথা হয়েছিল, তখন আমাকে বলেছিল, ‘দাদু আমি ভালো আছি। নিষাদের সঙ্গে গতবারের আগেরবার দেখা হয়েছে ওর বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে। তখন বাড়িতে এসেছিল। ওর মা ওকে ওর বাবার কবরের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। তখন ওর বাবার কবরে ঘাস দেখে ক্যাথরিনকে বলেছিল, ‘মাম, ঘাস কেন?’ আমার মনে পড়ে তারেকের সেই কথা, ও বলেছিল, ‘নিষাদকে পাঁচ বছর পর্যন্তও লালন-পালন করতে পারব না। ও আমার কবরে ঘাস দেখবে। সেটাই সত্যি হলো। ওর ছেলে সেই ঘাসই দেখে গেল ওর বাবার কবরে।

 

তারেকের সমাধির সামনে দিনের অনেকটা সময় কাটান, আসলে এ সময় আপনি কী ভাবেন?

আমি যে ঘরে থাকি, তার জানালা দিয়ে তারেকের কবর দেখা যায়। আমি সারাক্ষণই ওর জন্য দোয়া করি আর বলি, ‘আল্লাহ, তুমি আমারে যা খুশি তাই করো, কিন্তু আমার সন্তানকে তুমি বেহেশত নসিব করো। কারণ তারেক শুধু আমার একার রত্ন নয়, সারা বাংলাদেশের রত্ন।

 

আপনার কি মনে হয়, তারেক মাসুদের চলে যাওয়ার পর তাকে নিয়ে সরকার কিংবা চলচ্চিত্রকর্মীদের মধ্যে কোনো গাফিলতি আছে?

কিছু গাফিলতি তো আছেই। আটটা বছর হলো, ও চলে গেল। আমার আশা ছিল, তারেকের জন্য জাদুঘর ও লাইব্রেরি হবে। ও কষ্ট করে যা যা অর্জন করে গেছে, ওর হাতের ছোঁয়া লাগা জিনিসগুলো আমি নিজে সাজিয়ে রাখি। কিন্তু এতদিনে তা হলো না। এখনো ওর জিনিসপত্র ফার্মগেটের ভাড়া বাসায় আছে। ওখানে অনেক স্মৃতি রেখে গেছে আমার ছেলে। ভাড়া বাড়িতে এসব মূল্যবান জিনিস আর কতদিন রাখা যাবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন