শনিবার | ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

নদীমুখে ভূমির ভাড়া ৩০০% পর্যন্ত বাড়িয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর

ব্যবহারকারীদের আপত্তি

রাশেদ এইচ চৌধুরী, চট্টগ্রাম ব্যুরো

কর্ণফুলীর দুই পাশে নদীমুখে চট্টগ্রাম বন্দরের আওতাধীন জমিতে শিল্প-কারখানা বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাড়া পরিশোধ করতে হয় ব্যবহারকারীদের। সম্প্রতি এসব জমি ব্যবহারের ভাড়া ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা। তাদের দাবি, কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ হারে ভাড়া বৃদ্ধি অযৌক্তিক।

বন্দরের এস্টেট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নদীমুখে যেসব ব্যবহারকারী পাঁচ দৌড়ফুট (লম্বালম্বি ভূমি) পর্যন্ত দৌড়ফুটের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫০ টাকা। আগে যেখানে প্রতি দৌড়ফুটে ব্যবহারকারীকে ভাড়া পরিশোধ করতে হতো ৩২৮ টাকা। অর্থাৎ নদীমুখে শ্রেণীর ভূমির ভাড়া বেড়েছে প্রায় ১০০ শতাংশ। প্রায় একই হারে বেড়েছে নদীমুখে ছয় থেকে ১০ দৌড়ফুট ভূমির ভাড়াও। শ্রেণীর প্রতি দৌড়ফুট ভূমির ভাড়া ৬৫৬ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে হাজার ৩০০ টাকা। ১১ থেকে ২০ দৌড়ফুটের ক্ষেত্রে দৌড়ফুটপ্রতি ভাড়া আগের হাজার ৩১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে হাজার ৬০০ টাকা। তবে নদীমুখে ২১ বা তদূর্ধ্ব দৌড়ফুট ভূমির ক্ষেত্রে দৌড়প্রতি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশ। শ্রেণীর প্রতি দৌড়ফুট ভূমির বার্ষিক ভাড়া হাজার ৩১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে হাজার ২০০ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া নদীমুখে স্লিপওয়ের অবকাঠামোর বার্ষিক ভাড়া প্রতিফুট প্রস্থের জন্য হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৫ হাজার টাকা।

বর্ধিত ভাড়াসংক্রান্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিঠি গত মাসের শেষের দিকে হাতে পেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চিঠিতে তাদের চলতি বছরের (২০১৯ সালের) জানুয়ারি থেকে বর্ধিত হারে ভাড়া পরিশোধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি ব্যবহারকারী একাধিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠি দেয়া হয়। এতে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সুদসহ বর্ধিত ভাড়া পরিশোধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রেট্রোসপেক্টিভ ইফেক্ট দিয়ে তার সঙ্গে সুদসহ পরিশোধের যে আদেশ দেয়া হয়েছে, তা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এছাড়া বর্ধিত ভাড়ার ব্যাপারে আগে অবগতও করা হয়নি। তিন গুণ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে। বর্তমানে ব্যবসায় মন্দা ভাব বিরাজ করছে। অবস্থায় নতুন ভাড়া ব্যবসায়ীদের লোকসানের চাপ ফেলবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন্দরের ভূমি ব্যবহারকারী একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, চলতি বছরের ১০ জুনের দপ্তরাদেশ নামা নং ১৭/২০১৯ অনুযায়ী নদীমুখে জেটির ভাড়া বাড়ানোর কথা জানিয়ে ব্যবসায়ীদের চিঠি পাঠানো হয়েছে নভেম্বরে। এতে সুদসমেত বর্ধিত ভাড়া পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। এটিকে কার্যকর বলা হচ্ছে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে। এটা কোনোভাবেই আইনসিদ্ধ হয় না। ভাড়া বৃদ্ধির আগে-পরে কোনো পর্যায়েই ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। কোনো নীতিমালাও অনুসরণ করা হয়নি ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে।

বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ফোরামের চেয়ারম্যান চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তবে তার আগে ব্যবসায়ীদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে ভাড়ার হার যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা উচিত। ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত বলে আমি মনে করি।

যদিও বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, যৌক্তিকভাবেই ভাড়ার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে যেসব ব্যবসা-বাণিজ্য স্থাপনা গড়ে উঠেছে, সেগুলো নদীকেন্দ্রিক। বন্দর কর্তৃপক্ষের নদীশাসন সংরক্ষণ ছাড়াও ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ভূমি উন্নয়ন হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ সরকারকে বিভিন্ন ধরনের কর দিতে হচ্ছে, যেটা আগে কখনই দিতে হতো না।

চট্টগ্রাম বন্দরের এস্টেট বিভাগের প্রধান উপব্যবস্থাপক জিল্লুর রহমান প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা যে হারে ভাড়া নির্ধারণ করেছি, তা যেকোনো বাণিজ্যিক ভূমির ভাড়ার চেয়ে কম। বন্দরের ব্যয় অনেক বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, বন্দরের ইতিহাসে কখনই আউটার বারে পাঁচ মিটারের উপরে পানি ছিল না। সম্প্রতি আউটার বারে পানি উঠেছে সাত মিটার। প্রতিনিয়ত নদী খনন করতে হচ্ছে। আগে দিতে হতো না, কিন্তু এখন বাণিজ্যিক হারে সরকারকে আমাদের ভূমি কর দিতে হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ সরকারকে দিচ্ছে ৭০০ কোটি টাকা। ভূমি উন্নয়ন বাবদ দিচ্ছি ১৫ কোটি টাকা। এছাড়া হোল্ডিং ট্যাক্স দিচ্ছি আরো ৩৯ কোটি টাকা। এভাবে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা কর হিসেবে দিতে হচ্ছে, যেটা বন্দর কর্তৃপক্ষকে আয় করেই পরিশোধ করতে হচ্ছে। সময়ের ধারাবাহিকতাই বন্দরের আয়ের ক্ষেত্র হালনাগাদ করতে হয়েছে।

বন্দরের এস্টেট বিভাগের পক্ষ থেকে ভূমি ব্যবহারকারীদের দেয়া চিঠিতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বর্ধিত ভাড়া যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ এবং আগামী বছরের ভাড়া বাবদ প্রদেয় টাকা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কোনো অনুমোদিত তফসিলি ব্যাংক থেকে পে-অর্ডার অথবা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষ বরাবর পরিশোধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন