রবিবার | ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

খবর

বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি আমাদের পোশাক খাত কতটা প্রস্তুত?

গত ২৮ নভেম্বর বণিক বার্তা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের যৌথ উদ্যোগেবৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি: আমাদের পোশাক খাত কতটা প্রস্তুত?’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় দ্য ওয়েস্টিনে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্রোড়পত্রে প্রকাশ হলো

অংশ নিয়েছেন যারা-

প্রধান অতিথি
টিপু মুনশি, এমপি : মাননীয় মন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
সূচনা আলোচক
ড. কে এ এস মুরশিদ : মহাপরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান
আলোচক
এ কে আজাদ : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, হা-মীম গ্রুপ ও সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই
মোহাম্মদ আলী খোকন : প্রেসিডেন্ট, বিটিএমএ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ম্যাকসন্স গ্রুপ
আবদুস সালাম মুর্শেদী, এমপি : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এনভয় গ্রুপ ও সাবেক সভাপতি, বিজিএমইএ
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী : প্রেসিডেন্ট, বিসিআই ও চেয়ারম্যান, ইভিন্স গ্রুপ
এম আই সিদ্দিক : পরিচালক, বিকেএমইএ ও পরিচালক, বে ক্রিয়েশন লিমিটেড 
মো. আবুল কাশেম : উপাচার্য, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইল
ড. নাছিমা আকতার : পরিচালক, ডিপার্টমেন্ট অব টেক্সটাইল
মো. আলমগীর হোসেন : সদস্য, করনীতি, এনবিআর
আহমেদ জামাল  : ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
ড. রুবানা হক  : সভাপতি, বিজিএমইএ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মোহাম্মদী গ্রুপ 
মো. সিদ্দিকুর রহমান : সহসভাপতি, এফবিসিসিআই ও চেয়ারম্যান, স্টারলিং গ্রুপ
এনামুল হক :  হেড অব কমার্শিয়াল ব্যাংকিং, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড

সঞ্চালক
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ : সম্পাদকবণিক বার্তা

অবকাঠামোগত সমস্যাজ্বালানি  পানির সংকটমুদ্রা সমন্বয়তহবিলের উচ্চব্যয় খাতটির জন্য বড় রকমের চ্যালেঞ্জ

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, সম্পাদকবণিক বার্তা

আন্তর্জাতিক বাজারে এক দশকেরও বেশি সময় শক্তিশালী অবস্থান সত্ত্বেও দেশের অন্যতম রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পোশাক খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। দেশের মোট রফতানিতে ৮০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখার পাশাপাশি ৪০ শতাংশ শিল্প শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গার্মেন্ট পণ্য রফতানি হয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। যদিও তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এই ভেবে যে, আন্তর্জাতিক বাজারের ধীরগতি মোকাবেলার পাশাপাশি কীভাবে তারা বর্ধিত উৎপাদন খরচ সামলাবেন। অবকাঠামোগত সমস্যা, জ্বালানি পানির সংকট, মুদ্রা সমন্বয়, তহবিলের উচ্চব্যয় ইত্যাদিও খাতটির জন্য বড় রকমের চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে। সুতরাং বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তৈরি পোশাক শিল্পের অংশীজনদের পারস্পরিক মতামত বিনিময় খাতটির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির জন্য যুক্তি-পরামর্শ গ্রহণের সময় হয়েছে। শুধু গার্মেন্টই নয়, দেশের অন্যান্য রফতানি খাতও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রফতানি বৈচিত্র্যকরণের লক্ষ্যে ওইসব চ্যালেঞ্জ চিহ্নিতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

 


ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো কোরিয়াহংকংয়ে স্থানান্তরিত হয়েছেবিপরীতে আমরা এখনো শ্রমভিত্তিক শিল্পের গণ্ডিতে আটকে আছি

এনামুল হক , হেড অব কমার্শিয়াল ব্যাংকিং, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড


বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরএমজি খাতের অবদান জিডিপির ১১ শতাংশ এবং মোট রফতানির প্রায় ৮৩ শতাংশ। উত্তরোত্তর খাতটির উন্নতি হচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ আমরা বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হব বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতো বিশ্ব সংস্থা। এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আরএমজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।

অর্থনীতির ইতিহাস বলে, রফতানি শক্তিশালীকরণ ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়নি। চীন কিন্তু রফতানি শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে রফতানি বৈচিত্র্যকরণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এক্ষেত্রে আরএমজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমি মনে করি। বৈশ্বিক রফতানি বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষণীয়। বিশেষ করে পোশাকের ব্র্যান্ডগুলো অনলাইন স্টার্টআপের দিকে ঝুঁকছে, মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে পোশাকের ডিজাইন তৈরি হয়ে যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে ফ্যাশনের বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ভোক্তাদের প্রভাবিত করছে। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ায় পোশাক খাত বিভিন্ন চাপের মুখোমুখি হচ্ছে, যেমন অতিরিক্ত সক্ষমতা অর্জন, অতিরিক্ত উৎপাদন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ। এদিকে ২০২৪ সাল নাগাদ আমরা এলডিসি তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হব। সার্বিক বিষয়গুলো মোকাবেলার জন্য আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো কোরিয়া, হংকংয়ে স্থানান্তরিত হয়েছে, বিপরীতে আমরা এখনো শ্রমভিত্তিক শিল্পের গণ্ডিতে আটকে আছি। পোশাক খাতে অটোমেশন এবং এআই

প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক আইএলওর জরিপ বলছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে খাতে ৬০ শতাংশ কর্মীর প্রয়োজন হবে না।  এদিকে চীন-আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধ বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোর জন্য ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে বলে মনে করা হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাত নিয়ে আজকের আলোচনায় অনেক নতুন বিষয় যোগ হবে এবং আমরা সেক্টরের উন্নতিতে নতুন অনেক দিকনির্দেশনা পাব।


লিড বায়াররা চীনাদের ভিয়েতনামকম্বোডিয়ায় বিনিয়োগের কথা বলছে। তারা কেন বাংলাদেশের নাম বলছে না

. কে এস মুরশিদ, মহাপরিচালকবাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান

উন্নয়ন কৌশল হিসেবে বলা হয় যে আমরাএক্সপোর্ট-লেড গ্রোথ’- বিশ্বাসী। একসময়ফ্লাইং গিজ থিওরিউত্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশ এখন অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী দেশ। এক্সপোর্ট-লেড গ্রোথ ফ্লাইং গিজ থিওরি বাংলাদেশে কাজ করেছে। তবে প্রশ্ন আছে, তত্ত্বানুসারে আমরা কতদূর যেতে পারব?

আমাদের উন্নয়ন কৌশল শুধু এক্সপোর্ট-লেড গ্রোথকথাটিও পুরোপুরি ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন রয়েছে। সেখানে তৈরি পোশাক শিল্প অন্যতম। খাতে সাফল্যের নেপথ্যে কিছু শর্ত কাজ করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তা। এটা যদি না হতো, তাহলে আজ এখানে তৈরি পোশাক শিল্প গড়ে উঠত না। কেননা খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা। কারখানার শ্রমিকদের জন্য যদি স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব না হয়, তাহলে শিল্পায়ন হয় না। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উল্লেখযোগ্য প্রবাসী আয়ের বিষয়টিও।

আশি নব্বইয়ের দশকে যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়, সেখানে তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে। আমরা তৈরি পোশাক শিল্পের ইতিহাস জানি। এখানে তিনটি বিষয় চলে আসে। সেখানে তৈরি পোশাক শিল্প বিকাশে যে বিষয়গুলো সহায়ক ভূমিকা রেখেছে, তার মধ্যে অন্যতম বাজারে প্রবেশগম্যতা। কারণেই আমাদের এখানে বিনিয়োগ এসেছে। খাতটি উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ। আমরা এক ধরনের সক্ষমতা অর্জন করেছি। অবকাঠামো, বিনিয়োগ সবকিছু মিলিয়ে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, যা রাতারাতি অর্জন হয়নি। কম্বোডিয়া, মিয়ানমারসহ অনেক দেশের কথা বলা হচ্ছে, তবে সক্ষমতার দিক থেকে দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করা উচিত নয়। 

বলা হচ্ছে বর্তমানে আমরা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছি। চ্যালেঞ্জ আগেও ছিল। এর মধ্যে বৈশ্বিক মন্দা, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য। কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই এর একটা প্রভাব পড়েছে। তবে সে পরিস্থিতিও আমরা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। সেখানে তৈরি পোশাক শিল্পে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছি।

সাধারণত যারা লোকসানের শিকার হন, তারা তাদের কথাটাই বলেন। কেউ কেউ বলেন, কমপ্লায়েন্সের বিভিন্ন চাহিদা দাবির কারণে লোকসানের মুখে পড়ে তিনি ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। বিপরীতে একই সময় যদি নতুন কয়টি কারখানা কাজ শুরু করেছে সে তথ্যটা দেয়া হতো, তাহলে আমরা সঠিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারতাম। আমাদের একটা সমস্যা হচ্ছে, যারা ব্যর্থ হয়, তাদের দিকে কেউ তাকায় না। আমরা গবেষকরাও তাকাই না। আমার মনে হয়, কী কারণে কারখানাগুলো ব্যর্থ হয়েছে, তা জানা উচিত।

নতুন উদীয়মান সমস্যার মধ্যে অন্যতম বাণিজ্যযুদ্ধ রক্ষণশীলতার উত্থান। রক্ষণশীলতার উত্থানবিষয়ক সমস্যাগুলো দিয়ে আমরা এখনো প্রভাবিত নই। তবে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীন প্রভাবিত হচ্ছে। এর প্রভাব কিন্তু বাংলাদেশে এখনো পড়েনি। একটা পর্যায়ে গিয়ে যদি দেখা যায় চীনের অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, মার্কিন অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে, তখন আমাদেরও সতর্ক হতে হবে। তবে মুহূর্তে আমরা দেখছি চীন তার সেখানে তৈরি পোশাক শিল্প চামড়া শিল্প ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশে স্থানান্তর করছে। বাংলাদেশেও তারা করছে কিন্তু সংখ্যায় কম। এতে চীনাদের মার্কেট শেয়ার কমছে। আমাদের কমার কথা নয়। তবে চীনের শিল্প স্থানান্তরের প্রভাব বড় আকারে না হলেও ছোট করে বাংলাদেশে পড়বে। সাধারণত যারা লিড বায়ার, তারাই চীনাদের ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার কথা বলছেন। তারা কেন বাংলাদেশের নাম বলছেন না, আমি জানি না।

অন্য বিষয়টি হচ্ছে অটোমেশন। এটি এখনই আমাদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে না। কেননা একদিকে এগুলো অনেক বেশি ব্যয়বহুল

প্রযুক্তি, তাছাড়া অনেক কাপড় আছে, যেগুলো ম্যানুয়ালি সেলাই করতে হয়। প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি বলে শোনা যাচ্ছে। একজন একাডেমিক গবেষক হিসেবে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ভিয়েতনাম যে দামে দিতে পারে, আমরা কেন পারব না! আমাদের শ্রমিকদের চেয়ে তাদের শ্রমিকদের মজুরি কম নয়। তাহলে আমাদের সমস্যা কোথায়? পর্যায়ে সুদের হার, মুদ্রা বিনিময় হারের কথা আসতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে রাজনৈতিক আনুকূল্য রয়েছে। অন্যান্য খাতের চেয়ে বেশি প্রণোদনা সুবিধাও দেয়া হচ্ছে খাতটিকে। বিষয়টি স্বাস্থ্যকর নয়। কৃষি খাতসহ অন্যান্য খাতকে সহযোগিতা না করলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে হবে। তাছাড়া বর্তমানে যেখানে তৈরি পোশাক শিল্প একটি পরিণত শিল্প। এখনো কেন তাদের অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে যেতে হবে!

বরাবরই সেখানে তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এখন যদি আমরা বলি অটোমেশন, নতুন

প্রযুক্তি আসছেসেক্ষেত্রে খাতসংশ্লিষ্টরা কী বলবেনতাছাড়া আমাদের দেশে রাতারাতি পুঁজিপতি শ্রেণী তৈরি হয়েছে। শুরুর কথার সূত্র ধরে আমি যদি বলি যে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলটা কী? অন্যান্য দেশে নব্য আধুনিক উন্নয়ন কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে। এটা ঠিক যে নব্য আধুনিক উন্নয়ন কৌশল বা নীতির কারণে আমরা লাভবান হয়েছি। কিন্তু এটি টেকসই হবে কিনা, তা নিয়ে বিশ্বে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। আর এর প্রথম নমুনা বৈষম্য বৃদ্ধি, যা আমাদের দেশে দেখতে পাচ্ছি। বতর্মান উন্নয়ন কৌশলে যদি দেশে বৈষম্য বাড়তে থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধি থেমে যাবে। আমার মনে হয়, বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা জরুরি।


পণ্য খালাস করতে এখনো আমাদের ছয় থেকে সাতদিন সময় লাগে। কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে সময় লাগে আরো বেশি

কে আজাদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, হা-মীম গ্রুপ


গেল এক মাস আমি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি। উদ্দেশ্য ছিল বাজারজাতকরণ। আমার ক্রেতাদের অনেকে বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা সংকুচিত করেছে। অনেক ক্রেতাই অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে। তারা বলছে, আমাদের অনেক বেশি ইনভেন্টরি হয়ে গেছে, পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। এদিকে আমরা কারখানার কর্মীদের রাতারাতি বাদ দিতে পারি না। আমরা ভেবেছিলাম যে চীন-আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। কিন্তু দেখলাম যে ব্যবসাগুলো ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এমনকি মিয়ানমার, পাকিস্তান ভারতে চলে যাচ্ছে। সুযোগটা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। প্রথম সমস্যা বন্দর। পণ্য খালাস করতে এখনো আমাদের ছয় থেকে সাতদিন সময় লাগে। কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে সময় লাগে আরো বেশি। আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পণ্য পৌঁছতে সময় লাগে। ক্রেতাদের কয়েকটি চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটা হলো গতিকত দ্রুত পণ্যটি আমরা বাজারে পাঠাতে পারব। দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবন। আমাদের পণ্য সস্তাএটাই অর্ডার পাওয়ার একমাত্র কারণ নয়; বরং কত দ্রুত সময়ের মধ্যে কত নতুন ধরনের পণ্য আমরা দিতে পারছি, তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আবহাওয়া অনেক দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। আগে যেমন ক্রেতারা চার মাস সময় নিয়ে অর্ডার দিত, এখন মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে পণ্য হস্তান্তরের অর্ডার দেয়।

ক্রেতারা সময়, ডিজাইনের পাশাপাশি গ্লোবাল ফুটপ্রিন্টকে গুরুত্ব দিচ্ছে। গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট মানে থার্ড কান্ট্রিতে যাদের বিনিয়োগ রয়েছে। অথচ অন্য দেশে বিনিয়োগ করতে গিয়ে আমরা ভুক্তভোগী। বিদেশে আমি একটি সেমিনারে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে জানলাম ভারতে যদি নতুন কোনো বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করেন, বিশেষ করে ঝাড়খণ্ডসহ পিছিয়ে থাকা কয়েকটি অঞ্চলে, তবে সাত বছর পর্যন্ত ৫০ শতাংশ মজুরি সরকার দেবে। চীনের অনেক কোম্পানি সেখানে বিনিয়োগ করছে। তিন থেকে চার বছর পর আমরা এর প্রভাবটা বুঝতে পারব।

আশির দশকে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প যেমন ছিল, আজও তেমনই রয়েছে। ব্যবসাগুলো বাংলাদেশ থেকে আফ্রিকায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা তারা ডিউটি ফ্রি কান্ট্রি। আমরা যদি ফ্যাশনেবল পণ্য ডিজাইন করতে না পারি, পণ্য দ্রুত পৌঁছে দিতে না পারি, তবে ব্যবসাগুলো অন্যত্র চলে যাবে। অনেক ক্রেতাই বাংলাদেশ থেকে কম পণ্য কেনার কথা বলছে। এদিকে আমাদের ইউটিলিটি খরচ, ব্যাংক সুদসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিযোগিতা করব কি করে?

আমাদের মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা ভীষণ দুর্বল। শ্রীলংকা, ভারত চীনের লোকেরা এখানে প্রতিনিধিত্ব করছে। একজন বাংলাদেশীর তুলনায় তাদের দুই থেকে তিন গুণ বেশি বেতন দিয়ে রাখতে হচ্ছে। কেননা আমরা এখনো ভালো ডিজাইনার তৈরি করতে পারিনি। প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন ভালো ইংরেজি বলতে পারে, এমন লোকের সংখ্যা কম। তাদের বেতন হিসাবে বিলিয়ন ডলার প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে চলে যাচ্ছে। মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি মাননীয় অর্থমন্ত্রী, বন্দরপ্রধান, গভর্নর, বিদ্যুৎ জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং এনবিআরের চেয়ারম্যানআপনারা যদি সবাই একসঙ্গে আলোচনায় বসেন এবং আমরা যদি সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারি, তাহলে বিষয়টি ফলপ্রসূ হতে পারে।

ডলারের বিপরীতে আজ আমরা টাকার অবমূল্যায়ন করছি না। পাকিস্তানে ডলার সমান ১৫৬ রুপি। তাদের তৈরি পোশাকে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল, আজ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আমরা যেখানে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিলাম, আজ আমাদের পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি কমছে। আমরা বলে যাচ্ছি, আপনারা শুনে যাচ্ছেন; কিন্তু কার্যকর কোনো ফল মিলছে না। তাহলে আমরা কীভাবে টিকে থাকব? ১০০ ইকোনমিক জোন তৈরি হওয়ার কথা আমরা গর্ব করে বলি। যেখানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের কথা বলছি। বিপরীতে আমরা নিজেদের বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারছি না।


আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে

মোহাম্মদ আলী খোকন, প্রেসিডেন্টবিটিএমএ


তৈরি
পোশাক শিল্পের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কাপড়। যদি খাতটিকে টিকিয়ে রাখতে হয়, আমাদের সর্বপ্রথম ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ দরকার। বতর্মানে দ্রুত সময়ে পণ্য সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের টেক্সটাইল গার্মেন্ট দুটোই রয়েছে। অথচ বন্দর থেকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না হওয়ায় ইনপুট দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে প্রাইজ ডিসকাউন্ট হচ্ছে। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্পে  ১০ বিলিয়ন মিটার কাপড়ের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ডেনিমও রয়েছে। কিন্তু আমরা নিজেরা মাত্র চার বিলিয়ন মিটার কাপড় স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করতে পারি। এখনো বিলিয়ন মিটার কাপড় আমরা আমদানি করি। এর নানা জটিলতাও রয়েছে, সময় ব্যয় বেশি। তাই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এর সঙ্গে চাই পণ্য বৈচিত্র্যকরণ। সুতায় আমরা অনেক বৈচিত্র্য এনেছি। কিন্তু কাপড়ের ক্ষেত্রে ততটা হয়নি।

অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করতে হবে পরিকল্পনামাফিক। আমরা জুতার কারখানার পাশে গার্মেন্ট কারখানা করছি। অপরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়লে তা কার্যকর হবে না। চীনের প্রতিটি অঞ্চলে ভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি হয়। আমরা কেন পারছি না? বিশেষ করে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ নতুন নতুন উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত নই। বাংলাদেশে আমরা যারা পোশাক কারখানা পরিচালনা করছি, পৃথিবীর এমন কোনো উন্নত মেশিন নেই, যা আমাদের কারখানায় নেই। আগামীতে আরো ভালো প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য মুহূর্তে অর্থের প্রয়োজন। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো তারল্য সমস্যায় ভুগছে।

শুক্র শনিবার বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকে। বৃহস্পতিবার কোনো চালান এলে রোববার ছাড়পত্র পাওয়ার ৭২ ঘণ্টা পর পণ্য খালাস করা হয়। এভাবে থেকে ১০ দিন নষ্ট হচ্ছে, আমাদের অতিরিক্ত কনটেইনার চার্জ বন্দর চার্জ দিতে হয়। তাছাড়া বন্দরে সিন্ডিকেট রয়েছে, তারা কনটেইনার এক ডক থেকে অন্য ডকে নিয়ে যায় এবং অতিরিক্ত কনটেইনার চার্জ নিজেদের পকেটে রাখে, যার কারণে ইজ অব ডুয়িং বিজনেস কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ১৬৮। আমরা সোমালিয়ারও নিচে। বিষয়গুলোয় নজর দেয়া জরুরি। আগামী দিনে পোশাক শিল্পকে টিকে থাকার জন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য সার্বিক সমর্থন প্রয়োজন। সুদের হার বিনিময় হার যদি ঠিক না হয়, পোশাক শিল্পে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা ব্যর্থ হব।


আমাদের পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহচাহিদা  আকর্ষণ কম নয়। আকর্ষণ কম দুটো জায়গায়সময়  দাম

আবদুস সালাম মুর্শেদী, এমপি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এনভয় গ্রুপ


একক
শিল্প হিসেবে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর অতিনির্ভরতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা তো কাউকে জোর করে ব্যবসায় আনতে পারব না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোসহ যেখানেই উন্নয়ন হয়েছে, সেখানে আমরা দেখতে পাই তাদের শুরুটাই হয়েছে টেক্সটাইল তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে। এখনো তৈরি পোশাক শিল্পে ইনটেনসিভ কিছু সহযোগিতা আমাদের দরকার। কারণ এর মাধ্যমে বড় ধরনের কর্মসংস্থান হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবসময় আমাদের দেশের জন্য চ্যালেঞ্জের।

তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে আর্থিক সংস্থা, বন্দর, যাতায়াত সবকিছু জড়িত। তাজরীন গার্মেন্ট রানা প্লাজা দুর্ঘটনা আমাদের জন্য দুঃখজনক। ঘটনার মাধ্যমে কারখানাগুলোয় বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। কারখানাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অটোমেশনে যেতে হয়েছে, যা ইতিবাচক। বাংলাদেশ সরকার এক্ষেত্রে সার্বিক সহায়তা জুগিয়েছে। আমাদের পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ, চাহিদা আকর্ষণ কম নয়। আকর্ষণ কম দুটো জায়গায়সময় দাম। আমাদের তিন থেকে চারটি জায়গায় ভীষণ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা উচিত। সর্বশেষ তিন মাসে আমাদের পোশাক রফতানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পোশাক খাত কোন জায়গায় আটকে আছে, সেটা দেখা দরকার। ক্রেতাদের অর্ডার আছে কিন্তু আমরা দাম পাচ্ছি না। কেন? প্রথমত, শ্রমিকদের মজুরি বাবদ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ খরচ বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, গ্যাসের দাম ৩৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানি-রফতানি খরচও বেড়েছে। নতুন আইন হয়েছে, যেখানে ট্রাকের নতুন মাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশে ১৬ লাখ কাভার্ড ভ্যান রয়েছে। এগুলোর কী হবে? সরকার আমাদের নীতি সমর্থন দিচ্ছে। নতুন বাজারে প্রবেশের প্রণোদনা দিচ্ছে এবং উৎসে কর কমিয়েছে। এজন্য আমি সরকারকে ধন্যবাদ দিই।

তবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় আমরা অনেক পিছিয়ে। আমাদের টেক্সটাইল  শিল্প আছে অথচ কাঁচামাল নেই। কোনো কারণে যদি কোনো দেশ আমাদের তুলা রফতানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমাদের উপায় কী? ভারত, ভিয়েতনাম পাকিস্তান আপগ্রেডেশনের নামে কারখানায় ভর্তুকি, শ্রমিকদের ১২ শতাংশ প্রভিডেন্ট ফান্ড দিচ্ছে। কোনো কোনো রাজ্যে তারা ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। ভিয়েতনাম, পাকিস্তান প্রত্যেকেরই কিন্তু তুলা আছে। আমাদের যারা রফতানিকারক, তারা যতটুকু রিটেইন করে, আমি এখানে কাঁচামালের কথা বলছি না, তার ওপর যদি কয়েক বছরের জন্য প্রণোদনা দেয়া হয়, তাহলে আমি বিশ্বাস করি আমরা এগিয়ে যাব। ক্রেতাকে ডাকার দরকার হবে না, তিনি নিজেই এখানে আসবেন। 


প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের জন্য আমাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সুদের হার কমাতে হবে

আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী, প্রেসিডেন্টবিসিআই


আমাদের
শিক্ষা পদ্ধতি চাকরির বাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যেসব দেশ দক্ষতা বাড়িয়েছে এবং শিক্ষাকে পেশার সঙ্গে যুক্ত করেছে, তারা অন্যান্য সেক্টরে যেতে পেরেছে। বিষয়গুলোয় আমাদের দৃষ্টি দেয়া উচিত। উন্নত দেশগুলো যেমন চীন কিংবা ভারত এখনো টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক শিল্পে ভর্তুকি/সহায়তা দিচ্ছে। তারা কেন করছে? এর অন্যতম কারণ কর্মসংস্থান। পোশাক শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে অদক্ষ অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান করা যায়। এজন্যই তারা পোশাক খাতকে এতটা গুরুত্ব দেয়। আমাদের অর্থনীতি মাত্র তিনটি খাতকৃষি, প্রবাসী আয় এবং তৈরি পোশাক বস্ত্র শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। আমি পোশাক শিল্পের লোক হয়েও অন্য খাতকে সমর্থন করছি।

অনেকে বলেন, ভিয়েতনাম পারে, আমরা কেন পারি না! ভিয়েতনাম থেকে যেকোনো পণ্য ইউরোপে যেতে মাত্র থেকে ১০ দিন সময় লাগে, সেখানে বাংলাদেশে লাগে ২১ দিন। তাদের পণ্য আমেরিকায় পৌঁছতে সময় লাগে ২৮ দিন, আমাদের প্রয়োজন হয় ৪৫ থেকে ৫০ দিন। নিটে আমরা ৮০ শতাংশ স্বয়ংসম্পূর্ণ, ওভেনে আমরা এটা অর্জন করতে পারিনি। চীন পোশাক পণ্যের সবচেয়ে বড় রফতানিকারক। একই সঙ্গে কাপড়ের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক। আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। আমরা সবকিছুর উৎপাদন স্থানীয়ভাবে করতে পারব না। আমদানি করা কাঁচামালের ওপর আমরা নির্ভরশীল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভিয়েতনামের সময় বাঁচছে, কম্বোডিয়ার সময় বাঁচছে। পণ্য পরিবহন খরচও তাদের কম। আমাদের এখান থেকে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে খরচ হয় হাজার ৬০০ ডলার। তাদের অর্ধেকেরও কম খরচ হয়। স্যাম্পল আনতেও সময়ক্ষেপণ হয় আমাদের। 

এদিকে আমরা টাকার অবমূল্যায়ন করছি না। ভারত, পাকিস্তান কিন্তু এটা করেছে। চীন আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীন তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে। তাদের সঙ্গেই আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ গবেষকরা পোশাক খাতের প্রণোদনা, মজুরি ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেন। আজ যদি শুরু করা হয়, তাহলে নতুন কোনো শিল্প দাঁড় করাতে কমপক্ষে ১০ বছর লাগবে। তার মানে কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের পোশাক শিল্পের প্রয়োজন রয়েছে। ২০২৪, ২০৩০ কিংবা ২০৪১ সাল নাগাদ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে যেতে এককভাবে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর করলে হবে না। তবে খাতটিকে সঙ্গে রাখতে হবে কর্মসংস্থানের জন্য।

পোশাক খাতের জন্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। গতি, দাম পণ্য বৈচিত্র্যকরণের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম বাড়ছে, শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে, ভারত সুতার দাম কমাচ্ছে। আমাদের স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, উইভিং মিল বন্ধ হচ্ছে। আবার পোশাক শিল্পকে বলা হচ্ছে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন করতে। কীভাবে সম্ভব? প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের জন্য আমাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সুদের হার কমাতে হবে। কারখানার গ্যাসের দাম কমাতে হবে। এর মাধ্যমে শিল্প বাঁচবে, দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।


যে ধরনের প্রযুক্তিমেশিনম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়া আসছেতার জন্য উপযোগী করে আমাদের জনশক্তি তৈরি করতে হবে

মো. আবুল কাশেম, উপাচার্যবাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইল


অনেকের
বক্তব্যে উঠে এসেছে যে দেশে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি আছে। সমস্যা মোকাবেলায় অনেক আগে থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার যে সরবরাহ হচ্ছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বুটেক্স থেকে যাচ্ছে। আমরা মনে করছি এবং শিল্পপতিরা বলেন যে বুটেক্সের গ্র্যাজুয়েটরা মন্দের ভালো। তার মানে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যারা আসছে, তাদের চেয়ে বুটেক্সের গ্র্যাজুয়েটদের মান ভালো। চাহিদা অনুযায়ী শিল্প খাতের জন্য আমরা যাতে দক্ষ জনশক্তি জোগান দিতে পারি, সেজন্য আমাদের একাডেমিক কাউন্সিলে বিজেএমইএ, বিকেএমইএর প্রতিনিধি রেখেছি। শিল্পোদ্যোক্তারা যাতে দক্ষ জনশক্তি পান, সেজন্য আমরা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামের পাঠক্রম প্রতিনিয়ত পর্যালোচনা করি, হালনাগাদের চেষ্টা করি। এক্ষেত্রে কখনো কখনো আমরা তাদের সহযোগিতা পাই, আবার কখনো কখনো পাই না। আমি অনুরোধ করব, আপনাদের প্রতিনিধিরা যাতে একাডেমিক কাউন্সিলে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন, যাতে আপগ্রেডেশনের মধ্য দিয়ে তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারি।

আরেকটি বিষয়, নতুন ডিজাইনের কথা বলা হচ্ছে। নতুন ডিজাইনের কারণেও রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতা করতে সমস্যা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে ডিজাইনের জন্য আমাদের বুটেক্সে ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন নামে একটি বিভাগ আছে। বিভাগ থেকে যে ধরনের গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, তাদের বিষয়ে আমরা নিজেরাও সন্তুষ্ট নই। কারণ ভালো গ্র্যাজুয়েট বের করতে হলে ভালো ওস্তাদ দরকার। আমরা এক্ষেত্রে ভালো শিক্ষক প্রাপ্তিতে পিছিয়ে আছি। দেশে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাওয়া ভালো শিক্ষক মিলছে না। সেক্ষেত্রে চুক্তির ভিত্তিতেও যদি বিদেশ থেকে ভালো শিক্ষক আনতে পারি, তাহলে আমরা দক্ষ মানসম্পন্ন ফ্যাশন ডিজাইনার উপহার দিতে পারব।

আরেকটি বিষয়, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। তৈরি পোশাক শিল্পে আমাদের গবেষক, শিক্ষকরা অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু মুশকিল হলো, শিল্পের উৎপাদন, মান ব্যয়ের দিক দিয়ে উদ্যোক্তারা যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেগুলো সমাধানে যদি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করা হতো, তাহলে গবেষণায় আরো উন্নতি ঘটত। এজন্য আমাদের একাডেমিক কাউন্সিলে শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের নিয়মিত উপস্থিতি চাইছি।

এখন উন্নত দেশগুলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে যাত্রা করছে। যেভাবে আমরা শিল্প চালাচ্ছি, উৎপাদন করছি, তাতে পরিবর্তন আসছে। পরিবর্তনই হলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। আমরা এখন যে ধরনের গ্র্যাজুয়েট বের করছি, তাদের দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। আগামী দিনে যে ধরনের

প্রযুক্তি, মেশিন, ম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়া আসছে, তার জন্য উপযোগী করে আমাদের এখনই জনশক্তি তৈরি করতে হবে। আর এর চাহিদাটা শিল্প খাত থেকে আসতে হবে। তখন এসব বিষয় এগিয়ে নেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব। সর্বোপরি প্রয়োজন নীতি পৃষ্ঠপোষকতা। আসলে সরকারের পক্ষ থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার কমই আছেন, যারা মন্ত্রণালয়ে বসে আপনাদের সমস্যাগুলো উপলব্ধি করতে পারবেন বা সরকারকে পরামর্শ দিতে পারবেন  কী ধরনের সাপোর্ট দেয়া নেয়া প্রয়োজন। কাজেই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়াররা যাতে ওইসব জায়গায় যেতে পারেন, সেই প্রভিশনটা রাখা দরকার।


বস্ত্র খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির দায়িত্ব পালন করছি বিভিন্ন সরকারি সার্কুলার  অর্ডারের মাধ্যমে

. নাছিমা আকতার, পরিচালকডিপার্টমেন্ট অব টেক্সটাইল


ডিপার্টমেন্ট
টেক্সটাইলের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস দিয়ে শুরু করি। এটি ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। ডিরেক্টোরেট অব টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠিত হয় বস্ত্র পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এর মধ্যে বেশ উত্থান-পতন হয়। আসলে আলোচ্য ডিরেক্টোরেট আপগ্রেড হয়ে একটি ডিপার্টমেন্টে পরিণত হয় ২০১৭ সালে। ডিপার্টমেন্ট থেকে আমরা মূলত দুই ধরনের দায়িত্ব পালন করি। এক. স্পন্সরিং অথরিটিজ ফর টেক্সটাইল সেক্টর এবং দুই. ক্রিয়েটিং এমপ্লয়মেন্ট। বস্ত্র খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির দায়িত্ব পালন করছি বিভিন্ন সরকারি সার্কুলার অর্ডারের মাধ্যমে। আসলে ২০১৮ সালে সরকার বস্ত্র আইন কার্যকর করে। আইনে পোশাক বস্ত্র খাতের জন্য কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আইনে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইনিং প্রতিষ্ঠান স্থাপনে জোর দেয়া হয়েছে। আইনে নিবন্ধন এবং পোশাক খাত সম্পর্কিত অন্য কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধানে ডিপার্টমেন্ট অব টেক্সটাইলকে ম্যান্ডেট দেয়া হয়েছে।

 

বিবর্তিত পরিবেশে (গেম চেঞ্জিং এনভায়রনমেন্টঅন্য প্রতিযোগীরা কী কৌশল ঠিক করছেনএটি পর্যালোচনা করা আমাদের জন্য প্রয়োজন

মো. আলমগীর হোসেন, দস্যকরনীতিএনবিআর

পোশাক শিল্প যখন বাংলাদেশে শুরু হয়, তখন থেকেই আমরা নানা চ্যালেঞ্জ শুনে এসেছি। সময়ে সময়ে চ্যালেঞ্জ এসেছে, আমরা সেগুলো থেকে উত্তরণও করেছি। এগুলো অতিক্রমের জন্য সরকারের পরিদপ্তর, দপ্তর, বিভাগ, মন্ত্রণালয় সব ধরনের নীতিগত সহযোগিতা দিয়ে আসছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও প্রথম থেকেই কর অব্যাহতি, কর অবকাশ, কর ছাড়সহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি একটি গেম। এখানে প্লেয়ার হলো চীন, ভারত, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ। এরা হলো বিভিন্ন প্লেয়ার। কাজেই এই বিবর্তিত পরিবেশে (গেম চেঞ্জিং এনভায়রনমেন্ট) অন্য প্রতিযোগীরা কী কৌশল ঠিক করছেন, এটি পর্যালোচনা করা আমাদের জন্য প্রয়োজন। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা কৌশল নির্ধারণ করতে না পারলে আমাদের জন্য সামনে ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। এটা শুধু রফতানি নয়, এসডিজির লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গেও যুক্ত। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কয়েক লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন এবং প্রায় ১০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। বেকারত্ব বেড়ে গেলে আমাদের উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন হবে না। জায়গাটি আমাদের জন্য সত্যিই চ্যালেঞ্জের। কাজেই এসডিজি অর্জনের সঙ্গে শুধু পোশাক নয়, অন্য রফতানিমুখী শিল্পের সবলতা-দুর্বলতার সংযোগ আছে। গেম চেঞ্জিং দৃশ্যপটে সমস্যাগুলো বিস্তৃত হওয়ার আগেই যদি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স-জাতীয় কিছু গঠিত হয়, তাহলে সেটি ফলদায়ক হবে। বন্দর, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিদ্যুৎ, গ্যাস, অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট অন্য স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে আমরা যদি সমস্যাগুলো দ্রুত নিরসনের উদ্যোগ না নিই, তাহলে হয়তো বন্ধ হওয়া কারখানার সংখ্যা আগামীতে বাড়তে থাকবে। এখন সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। এক্ষেত্রে এনবিআর অতীতে যেমন ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে, আগামীতেও তা- করবে। আমি যেহেতু ট্যাক্স উইংয়ের পলিসি দেখছি, আশা করছি আমাদের পক্ষ থেকেও সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে। আমরা চাই আগামী দিনে কর্মসংস্থান যেন আরো বাড়ে। এখনো শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো উন্নয়ন হবে না। জায়গাটায় আমাদের আরো সতর্ক নজর দিতে হবে। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখতে হবে। তার পরও আরেকটি বিষয় উল্লেখ করব, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দরকার। আমরা দেখছি সবাই কর অব্যাহতি চাইছেন কিংবা ছাড় চাইছেন। আমরা অব্যাহতভাবে ছাড় দিলে রাজস্ব আহরণ কমে যাবে। কাজেই আমাদের একটি ভারসাম্য রাখতে হবে। আমরা কীভাবে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াব, একই সঙ্গে একটি ব্যবসা রফতানিবান্ধব পরিবেশ তৈরি করব? বিষয়টি সার্বিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মকৌশল প্রণয়ন করা জরুরি।


আমরা চাইছি  শিল্পঋণেরযার ওপর দেশের অর্থনীতি  কর্মসংস্থান নির্ভর করেসুদের হার যেন এক অংকে নামিয়ে আনা হয়

আহমেদ জামাল, ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক


আজকের
গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পর্কিত দুটি ইস্যু মূলত এসেছে। এক. সুদ হার এবং দুই. বিনিময় হার। দুটিই বহুল আলোচিত ইস্যু। এটি ঠিক, আমাদের মূল রফতানি খাত পোশাক শিল্পের প্রতিযোগীদের বাংলাদেশের তুলনায় মুদ্রার অনেক অবমূল্যায়ন হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে আমাদের অনুরূপ একটি ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হয় যে আমাদের রফতানি ৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি এবং আমদানি প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। সুতরাং এর প্রভাব আমদানির ওপরও পড়ে। আমদানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হলো কনজিউমার গুডস। জ্বালানি তেল, ডাল, গম। আমাদের প্রায় ৬৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হয় প্রতি বছর। ভোজ্যতেল পুরোটাই আমদানিনির্ভর। কাজেই মুদ্রা অবমূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে এসব পণ্যের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বেড়ে যাবে মূল্যস্ফীতি। মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি বাড়ুক, সেটি সরকার চাইছে না। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংককে দুটো দিককে ট্রেড অফ করতে হচ্ছে। হ্যাঁ, আমরা মনে করি ডলারের বিপরীতে প্রতিযোগীদের চেয়ে আমাদের মুদ্রা একটু শক্তিশালী অবস্থানে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্ষেত্রে কৌশল হলো, মুদ্রাকে সহনীয় মাত্রায় অবমূল্যায়ন করা। অতীতেও এভাবে এগিয়েছিলাম। ভবিষ্যতেও করব। এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মুদ্রা অবমূল্যায়নের ক্ষেত্রে এটিই হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, ব্যাংকের সুদ হার। অন্য দেশের তুলনায় এটি বেশি। আমরা এটি এক অংকে আনার চেষ্টা করছি। প্রতিনিয়ত এটা নিয়ে ব্যাংকগুলোকে বলছি, তদারক করছি। প্রতি মাসে তাদের কাছ থেকে সুদের হারের কাঠামো নিচ্ছি। যেসব ব্যাংক সুদের হার এক অংকে আনতে পারিনি, তাদের এটি কমিয়ে আনার কথা বলছি। বলছি এটা পরিপালন না করলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেয়া সুযোগ-সুবিধাগুলো প্রত্যাহার করা হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সুদের হার মোটামুটি নামিয়ে এনেছে। বেশির ভাগ ব্যাংকই শতাংশের নিচে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু সমস্যা হলো ব্যক্তি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নিয়ে। বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকের তহবিল ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) শতাংশের অধিক। এখানে শতাংশ সুদের হার বাস্তবায়ন করতে গেলে তাদের বিরাট প্রভাব পড়ে। আমরা হিসাব করে দেখেছি, শুধু শিল্প খাতেই বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের পরিমাণ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা। আমরা চাইছি অন্য ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিল করলেও বিশেষ করে শিল্পঋণের, যার ওপর দেশের অর্থনীতি কর্মসংস্থান নির্ভর করে, সুদ যেন এক অংকে নামিয়ে আনা হয়। নিয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিল্পঋণের সুদের হারের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে কোনো সীমা বেঁধে দেয়া যায় কিনা, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।


যখন ইনোভেশন না থাকেতখন শিল্প স্থবির হয়ে পড়ে। সেই ইনোভেশন কোথায়কোথায় ডিরেকশন?”

. রুবানা হক, সভাপতিবিজিএমইএ


কয়েকটি
তথ্য জানানো দরকার। একটি হলো, চীন মিয়ানমারে পণ্য পাঠাচ্ছে। আর মিয়ানমার পাঠাচ্ছে ভিয়েতনামে এবং ভিয়েতনাম সেগুলো বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করছে। এভাবে ভিয়েতনামের রফতানি বাড়ছে। আমরা কিন্তু এটি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করব। আমাদের এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত। এটা একটি দিক। দ্বিতীয়ত, প্যাটাগনিয়াসহ অনেকগুলো ব্র্যান্ড বলছেডোন্ট বাই মাই গার্মেন্ট, ইউজ হট, মিনড ইট। কাজেই স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন আছে এবং বদলে যাচ্ছে। আমরা আসলে সবসময় আজকের দিনটাকে দেখি। আমরা প্রায় সময় দশমিক শতাংশ, শতাংশ কিংবা শতাংশ প্রণোদনা এর মধ্যেই থাকি। এর বাইরে দেখি না। আরেকটি বিষয়, বাংলাদেশে আমরা শুধু নিজেদের কথা ভাবি। আসলে দেশটিকে নিয়ে চিন্তা করি না। এত সুরক্ষাবাদী। যদি বলি যে এমএমএফ বেজড টেক্সটাইল করা উচিত, যারা স্থানীয়ভাবে টেক্সটাইল করেন, তারা সঙ্গে সঙ্গে বলবেননা, না, আমরাই তো করতে পারি। এখানে যে বিদেশী বিনিয়োগ দরকার, সেটি বুঝি না বা খেয়াল করি না। জয়েন্ট ভেঞ্চারে করেন, ১০০ শতাংশ এফডিআই অনুমোদনের দরকার নেই। কিন্তু এমএমএফ বেজড টেক্সটাইল বাংলাদেশের দরকার। আজকাল আমরা উদ্ভাবনের কথা বলছি। কিসের উদ্ভাবন? সম্প্রতি মরক্কো সফরের অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেখানে পুরো একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উদ্ভাবনগুলো (ইনোভেশন) নিয়ে কাজ করে। আমাদের সেই ইনোভেশনের ভিশন কোথায়? ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি করেছি। শুধু তাদের ওয়েবসাইটে যান, দেখুন তারা কী করছে। আমার কথা হলো, ভিশন কে নির্ধারণ করছেন? নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এত সমন্বয়হীনতা কে দেখবে?

আমার কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ আছে। প্রথমটি হলো, এমএমএফ বেজড টেক্সটাইল। আমি মনে করি, মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের এটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কারণ ২০২৭ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরে অবস্থা খুবই খারাপ হবে। দুই. আমরা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বলছি, অথচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা উচিত, আমাদের এক্সটেন্ডেড ইভিএ এনগেজমেন্টে যেতে হবে। অনেক সেমিনার করছি কিন্তু কোথায় গেল এক্সটেন্ডেড ইভিএ এনগেজমেন্টের কথা? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা আছে? কোনো পলিসি আছে? তারা কি আমাদের জানিয়েছেন? অথবা পররাষ্ট্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কি একসঙ্গে কাজ করে? আমার জানা দরকার আছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশে নীতির স্থবিরতা আছে। এর কারণ আমরা পড়াশোনা করি না। ধরেই নিয়েছি পড়াশোনা না করে, কোনো কিছু রিসার্চ না করে কথা বলা খুব সহজ। জেনেরিক কথা বলতে বলতে আমাদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। তথ্য-উপাত্ত দিয়ে কোনো কিছু সাপোর্ট করি না এবং একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকি। কাকে আমরা দোষ দেব? নিজেরাই নিজেদের শত্রু। নিজেরাই দাম কমাচ্ছি। কাকে দোষ দেব? শুধু নিজের কথাটি বলার জন্য আমরা সবাই ব্যস্ত। আমার মনে হয় উদ্ভাবনমুখী বিনিয়োগ (ইনোভেশন-লেড ইনভেস্টমেন্ট) হওয়া উচিত। একটি অর্থবছরে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১১ শতাংশ হওয়ার কথা বলেছেন একজন। তিনি হয়তো খেয়ালই করেননি, এখন আমরা ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে আছি। গত নভেম্বর পর্যন্তও আমাদের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আমার কথা হলো, এটা কেউ খেয়াল করছেন না যে কোথায় গেছি। শিল্প পরিপক্ব হয়েছে। কিন্তু এটি সানসেট ইন্ডাস্ট্রি নয়। যখন প্রবৃদ্ধি সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসছে, যখন ইনোভেশন না থাকে, তখন শিল্প স্থবির হয়ে পড়ে। সেই ইনোভেশন কোথায়? কোথায় ডিরেকশন? আমরা এখনকার সমস্যা নিয়ে সামনের বিষয়গুলো দেখছি না। 

আমাদের দেশে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব আছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে কথা বললে অনেকেই ট্যাবু ভাবেন। হ্যাঁ, আমাদের ডুয়াল কারেন্সির দরকার নেই। কিন্তু যে নামেই হোক, ফরেন এক্সচেঞ্জে অন্তত টাকা সাহায্য করতে হবে। ভারত ৫০ হাজার কোটি টাকা সাপোর্ট দিচ্ছে। আমরা কোথায় আছি? ভারত আমাদের মিরপুর থেকে উঠিয়ে উঠিয়ে শ্রমিকদের নিয়ে যাচ্ছে। এটা সবার অলক্ষে হয়ে যাচ্ছে। অথচ নীতিনির্ধারক কিছু বুদ্ধিজীবী ধরে বসে আছেন, তৈরি পোশাক শিল্প কখনো মরবে না। আমি বলব, তৈরি পোশাক শিল্প মরে যাচ্ছে। আমরা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হওয়ার পর অনেক কারখানাই শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছে না। আমাদের পোশাক শিল্পের যেভাবে নেগেটিভ গ্রোথ চলছে এবং যদি বসে যাই, তবে একটি সামাজিক অবক্ষয় হবে। এতগুলো নারী শ্রমিকের কী হবে? তাদের কোথায় চাকরি হবে? নারী শ্রমিকরা যদি রাস্তায় নামেন, তাহলে এর দায় কে নেবে?  

একজন ডুয়িং বিজনেসের কথা উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে কয়েকটি তথ্য দেব। টাইম টু এক্সপোর্টে শুধু ডকুমেন্টস কমপ্লায়েন্সে আমাদের লাগে ১৪৭ ডলার, ভিয়েতনামে লাগে ৫০ ডলার। টাইম টু এক্সপোর্ট, কস্ট টু এক্সপোর্ট যদি হিসাব করি, প্রতিটিতেই ভিয়েতনামের ব্যয় আমাদের এক-তৃতীয়াংশ। ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এফটিএ হয়েছে। আমরা আগামী তিন বছরে আরো ১২ বিলিয়ন ডলার মার খাব ভিয়েতনামের কাছে। কিন্তু তাদের এটি তো প্রধান রফতানি পণ্য নয়। তার পরেও তারা এগিয়ে যাচ্ছে।

 আমি নীতিনির্ধারকদের অনুরোধ করবসুযোগ-সুবিধা যতটুকু দেয়া হোক না কেনআমাদের অন্তত ব্যবসা করার ক্ষেত্রে বাধাগুলো থেকে মুক্তি দেন

মো. সিদ্দিকুর রহমান, সহসভাপতিএফবিসিসিআই

আমরা আমাদের অসুবিধাগুলো জানি। কিন্তু এগুলোর প্রতিকার অস্পষ্ট। রানা প্লাজা ধ্বংসের পর আমরা কারখানাগুলো সংস্কার করলাম। এত টাকা বিনিয়োগ করলাম। যখন আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি, ঠিক সে সময় ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে লোকসান করছে আমাদের পোশাক শিল্প। আমরা যে বিনিয়োগটা করেছি সেটি দূরে থাক, বরং লোকসানের বৃত্তে পড়ে গেছি। এটি হলো আসল দৃশ্যপট। কিন্তু মানুষ বলে গার্মেন্ট খাতে টাকার কোনো অভাব নেই, অসুবিধা নেই। আমার শুধু দুটি প্রশ্ন। সবাই বলে, আমাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। আমাদের শতাংশ প্রণোদনা পেতে মোটামুটি কান্নাকাটির অবস্থা হয়। শতাংশে কত টাকা হয়? আমরা পুরো খাতে বেতন কত দিই? এই শতাংশ দেয়ার জন্য কেন এত বাধা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এটি সংসদে ঘোষণা করেছেন। তাহলে এটি পাওয়ার জন্য আমাদের এত শর্ত পূরণ করতে হবে কেন? একটি হিসাব দেখা যাক, আমাদের উৎসে কর হিসেবে দশমিক ২৫ শতাংশ কাটা হয়, এটি কাটা হয় যাদের ঠিকানা নেই তাদের কাছ থেকে, কনট্রাক্টরদের কাছ থেকে। আমাদের কাছ থেকেও কাটা হয়। এটি অপমানজনক। সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকদের আমরা বলি যে ফুল অ্যান্ড ফাইনাল সেটেলমেন্ট লিখে দেন। কিন্তু সেটি কোনোভাবেই দেয়া হয় না। বরং পরিদর্শক এসে প্রথমে দশমিক দিয়ে শুরু করেন। এখান থেকে আমরা কোনো সুবিধা পাই না। এর পরে মুনাফা করলে ১০ ১২ শতাংশ কর নেয়া হচ্ছে। সেই কর নেয়া হচ্ছে আমার কোম্পানি যদি আবার কোথাও বিনিয়োগ করে। আবার ওই টাকাটা আরেকটি ব্যবসা করার জন্য যদি ব্যক্তিগত ফাইলে নিতে যাই, তখন ২৫ শতাংশ হারে কর নেয়া হয়। তাহলে করটা কোথায় কম দিলাম। এর বিপরীতে আমাদের কী সুবিধা দেয়া হচ্ছে? একটি জায়গায় সুবিধা দেয়া হয়েছে, যখন ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজটা গড়ে উঠেছে তখন ২৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল। যার জন্য আজকে গর্ব করে বলতে পারিনিটে আমরা ১০০ শতাংশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখনো আমরা ৬০ শতাংশের ওপর ওভেন ফ্যাব্রিক আমদানি করি। পাকিস্তান থেকে কাপড় আনতে আমাদের অনেকদিন লাগে, বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকে। রাজনৈতিক সমস্যা থাকতে পারে, ব্যবসার ক্ষেত্রে তো রকম হওয়া উচিত নয়। জায়গাটি খেয়াল করতে হবে। আমি নীতিনির্ধারকদের অনুরোধ করব, সুযোগ-সুবিধা যতটুকু দেয়া হোক না কেন, আমাদের অন্তত ব্যবসা করার ক্ষেত্রে বাধাগুলো থেকে মুক্তি দেন। অন্যায় অত্যাচার থেকে মুক্তি দেন। যেমন উেস করে দশমিক ২৫ শতাংশ ফাইনাল সেটেলমেন্ট লিখতে অসুবিধা কোথায়?


প্রতিযোগীরা কীভাবে এগোচ্ছেসে অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পোশাক শিল্পকে সাহায্য জোগাতে হবে

টিপু মুনশি, এমপি, মাননীয় মন্ত্রীবাণিজ্য মন্ত্রণালয়


আমাদের
পদে পদে সমস্যা। এসব দূর করতে হবে। অনেকেই বলেছেন, ডিজাইনে আমাদের নতুন নতুন সৃজনশীলতা দরকার। এসব জায়গায় আমরা এখনো আগের পর্যায়েই রয়ে গেছি। আমাদের দক্ষ জনবল নেই। বুটেক্সের ভিসি নিজেই এটি নিয়ে হতাশার কথা বলেছেন। তিনি শিক্ষক না পাওয়ার কথা বলেছেন। না পাওয়া গেলে আনতে তো হবেই। বাইরে থেকে এনে হলেও আমাদের দক্ষ লোকবল তৈরি করতে হবে। অত বেশি না বুঝলেও এটুকু বুঝি যে ডিজাইন, ইনোভেশনের জন্য অন্য ধরনের দক্ষতার লোক প্রয়োজন। সবাইকে দিয়ে সবকিছু হয় না। ভিসি সাহেব যদি হতাশার কথা বলেন, তাহলে আমাদের ভরসার জায়গাটি কোথায়! এমনটি হলে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আমরা এগোব কীভাবে? এটা বাস্তবতা যে নতুন কিছু ডিজাইন, অভিনবমূলক কিছু করতে হবে; যাতে আমরা আবার ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে পারি। হতাশার কথা বললে এগোনো যাবে না। শিক্ষক পাওয়া না গেলে আনতে হবে। বাইরে থেকে এনে হলেও সেই ধরনের ছাত্র তৈরি করতে হবে। এত কিছু বুঝি না, ডিজাইনের জন্য অন্য ধরনের দক্ষতা লাগে। সেরা ছাত্রের সে দক্ষতা বা মন থাকবে, তা না- হতে পারে। সেখানে অন্তত যারা কিছু করতে চায়, তাদের নিতে হবে। হতাশ হয়ে বসে থেকে লাভ নেই। আমাদের চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচুর বাইরের লোক কাজ করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের অনেক ফ্যাক্টরি এখনো ভারতীয় বায়িং হাউজের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের বায়িং হাউজগুলো ভারতীয় কর্মী থাকলে বেশি আরাম বোধ করে। ধরনের চাপ তো আছেই। আমাদের নিজেদের লোক তৈরি করা দরকার। আজকের কথা চিন্তা না করে সামনের দিনগুলোয় কী করা যায়, সেদিকেও খেয়াল করা দরকার।

বন্দরে জট (পোর্ট কনজেশন) একটা বড় সমস্যা, এটি আমরা জানি। এটা নিয়ে কথা বলব। সুরাহার চেষ্টা করব। আমরা চিন্তা করছি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত বড় সেমিনার, মিটিং করার। আরেকটি সমস্যা, শুল্ক বিভাগের হয়রানি। প্রায় সব ব্যবসায়ী একই কথা বলেন, কাস্টমসের কারণে আমাদের ব্যবসা থেকে মনই উঠে গেছে। হয়তো এক-দুজন অনিয়ম করেন। তাদের জন্য কি সবাইকে হয়রানি করতে হবে? সবাই ব্যবসা সামান্য কিছু দিয়ে শুরু করেছিলেন। কষ্ট, সংগ্রাম করে এতদূর এসেছেন। আজকে বৈচিত্র্যের কথা বলা হচ্ছে। খুব ভালো কথা। এককভাবে রফতানির ৮৫ শতাংশ দখল করে আছে। আমরা ৮৫ শতাংশ থাকতে চাই না। আমরা চাই রফতানির অংশ ৫০ ভাগ হোক কিন্তু ভলিউমটা বাড়ুক। আজ পোশাক রফতানি হচ্ছে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের। আমরা ভলিউম ৫০ বা ৬০ বিলিয়ন ডলারে নিতে চাই। সবাই এগিয়ে আসুক, তারা এসে ৫০ শতাংশ নেয় না কেন?

গার্মেন্ট সেক্টর আছে, এটিকে যথেষ্ট কেয়ার নিতে হবে। পাশাপাশি অন্যরা আসুক না কেন, সমস্যা নেই। ব্যবসা থেকেই অনেক মালিক শিল্পে কিছুটা বৈচিত্র্য এনেছেন। আজও মূল ব্যবসায় নজর দিয়ে অন্যদিকে পা বাড়াতে হবে। একজন গেম প্ল্যানের কথা বলেছেন। এটা ঠিক আছে। প্রতিযোগীরা কীভাবে এগোচ্ছেন, সেই অনুযায়ী আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে। আমি মনে করি, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পোশাক শিল্পকে নানাভাবে সাহায্য করতে হবে। বাজার গবেষণা করা, বৈচিত্র্য আনা সবই আমাদের বিশেষজ্ঞরা করবেন। মুহূর্তে বাস্তবতা হলো, কোনোভাবে গার্মেন্ট খাতকে যদি সাপোর্ট না দেয়া হয়, তাহলে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে। সামনের দিনে কারখানা বন্ধের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। আমি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, চিন্তা করবেন। আমরা আশা করি, বছরের শুরুতেই একটি কমিটি করে, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে দেশে শিল্প ব্যবসার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করব। আমার পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে।

[আরো উপস্থিত ছিলেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিটপী দাশ চৌধুরী।]

 

সুপারিশ :

গবেষণা উদ্ভাবন কর্মসূচি গ্রহণ

তৈরি পোশাক শিল্প রক্ষায় টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ

বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন

পণ্য খালাসের সময় ব্যয় কমানো

বিদ্যুৎ জ্বালানি ব্যয় কমানো

পোশাক রফতানির রিটেনশনের ওপর প্রণোদনা

প্রণোদনার অর্থ ছাড়ের জটিলতা হ্রাস

হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা

ব্যাংকঋণের সুদের হার হ্রাস

নতুন বাজার সৃষ্টি করা

পোশাকপণ্যে বৈচিত্র্য আনয়ন

অযাচিত লেনদেন বন্ধ করা

শিক্ষার সঙ্গে পেশার সামঞ্জস্য বিধান

কারিগরি শিক্ষা দক্ষ জনশক্তির উন্নয়ন

খাতভিত্তিক পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা

সব কার্যক্রমে সমন্বয়ের উদ্যোগ নিতে হবে

শ্রুতি লিখন: রুহিনা ফেরদৌস হুমায়ুন কবির

আলোকচিত্রী: সোহেল আহমেদ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন