শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

তেরোমাসি বছর: আমানতকারীদের ঠকিয়ে ব্যাংক কীভাবে ব্যবসা করছে?

ড. আর এম দেবনাথ

বাঙালির বছর বারো মাসেবৈশাখ থেকে চৈত্র। সরকারি বছর বারো মাসেজুলাই থেকে জুন। আর ইংরেজি ক্যালেন্ডার বছরও বারো মাসেজানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর। কিন্তু কেউ কি জানেন, বাংলাদেশে এর চেয়ে ছোট-বড় বছর আছে। সেখানে বারো মাসে বছর হয় না। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরতে কম-বেশি সময় লাগে। একই সময়ে পৃথিবী তা করে না বা পারে না। প্রশ্ন, এসব বছর কোথায়? আমি অন্তত দুটোর সন্ধান পেয়েছি। এর বাইরে আছে কিনা আমার জানা নেই। আমার জানামতে দুটো বছরের একটি কিশোরগঞ্জে মহামান্য রাষ্ট্রপতির জেলায়। আর অন্যটি সারা বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোয়। কিশোরগঞ্জ জেলায় বছর হয় আট মাসে। আর ব্যাংকের ক্ষেত্রে বছর হয় ১৩ মাসে। বিচিত্র খবর নয় কি? নয় কি অবিশ্বাস্য দুটো খবর? অথচ এটা সত্য, বাস্তব সত্য। কিশোরগঞ্জের বেলায় বহুদিন ধরে। আমরা যখন ছোট, তখনো এর কথা শুনেছি, দেখেছি। আর ব্যাংকের বেলায় তেরোমাসি বছরের আবিষ্কার ইদানীংকালের। মজার বিষয়, একটি ঋণের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যটি আমানতের (ডিপোজিটের) সঙ্গে সম্পর্কিত। উভয় ক্ষেত্রে একটি বিষয় সমান। উভয়ইমহাজন একজন পুরনো কালের। আরেকজন ইদানীংকালের ভদ্রবেশীমহাজন একজন জোতদার-বড় কৃষক-সুদি ব্যবসায়ী; অন্যজন ব্যাংকার। উভয়ই তাদের স্বার্থরক্ষার্থে নিজস্ব গতিতে চলে। ঋণের ক্ষেত্রে যত নিয়ম-আইন সব তাদের পক্ষে। আবারআমানতেরক্ষেত্রেও নিয়মকানুন তাদের পক্ষে। কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, বিশেষ করে ভাটি অঞ্চলের কৃষকরা, ছোট কৃষকরা ঋণে জর্জরিত সবসময়। তাদের একবছরী ফসল প্রায়ই মার খায়। অকালবন্যা, বন্যা, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি কারণে তাদের ফসল প্রায়ই মারা যায়, তারা পড়েন মহাবিপদে। কে বাঁচাবে তাদের? একমাত্র ভরসামহাজন’, যিনি প্রায়ই বড় কৃষক-জোতদার। তার সম্পর্ক রাজনীতির সঙ্গে, প্রশাসনের সঙ্গে, শহরাঞ্চলের ভদ্রলোক ক্ষমতাধর লোকদের সঙ্গে। মহাজন হতভাগ্য কৃষকদের ত্রাণদাতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ঋণ দেন। ঋণ বার্ষিক ভিত্তিতে নয়। কয়েক দিন আগে একটি দৈনিকে সম্পর্কে তাজা খবর ছাপা হয়েছে। প্রাচীনকালের খবর, নতুনভাবে ভদ্রলোকদের জন্য পরিবেশিত। কী খবর? এতে বলা হয়েছেমহাজনী ঋণে হাজার টাকায় ৫০০ টাকা সুদ দিতে হয় আট মাসে। সুদের হার দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ (আট মাসে বছর)এই যে খবর, এতে লুকিয়ে আছে ভাটি অঞ্চলের, এমনকি অন্যান্য সমতল অঞ্চলের সাধারণ কৃষকের কান্না, বুকভরা কান্না।

আমার মনে আছে স্কুলে থাকতে একই হারে গ্রামে বড় কৃষকের কাছ থেকে আমরাও ঋণ নিয়েছিলাম। বড় সুদে সেই ঋণ শোধ করেছি লেখাপড়া শেষ করে। দুঃখের কথা কত লোকে কত সময়ে বলল, কত বক্তৃতা হলো, কত লোক এসব বলে সংসদ সদস্য হলেন, হলেন কত কিছু; কিন্তু গ্রামের, ভাটি অঞ্চলের অসহায় কৃষকদের দুঃখ আর গেল না! ‘আবিষ্কারহলোএনজিওর। গ্রামে গেল অনেক ব্যাংক। সবারই অঙ্গীকার তারা ঋণ দেবে সহজ শর্তে, কম সুদে, কৃষককে না ভুগিয়ে। কিন্তু কই, এখনো তো সেই একই কান্না, একই হাহাকার। মানুষ, দরিদ্র মানুষ, দরিদ্র কৃষকের সামনে ফসল। এখন হাতে টাকা নেই। সে ফসল কম দামে অগ্রিম বিক্রি করে দেয় নগদ টাকার বিনিময়ে, ঋণের বিনিময়ে। শতশত লোক হয়বন্ধকি শ্রমিক’ (বন্ডেড লেবার) আশ্চর্য লাগছে? যাদের তা লাগে, তারা ভাটি অঞ্চল ঘুরে আসতে পারেন। উল্লিখিত সংবাদটিতে পড়লাম দুঃখের কাহিনী। এতে বলা হচ্ছে রাজিব নামে এক কিশোরের কথা, যার বয়সে স্কুলে থাকার কথা, ডজন ডজন ছেলেমেয়ের সঙ্গেউদামখেলাধুলা করার কথা, সেই কিশোর আজবদ্ধ শ্রমিক কারণ? কারণ তার বাবা একজনবড়লোকেরকাছ থেকে ঋণ করেছিলেন। বাবা টাকা শোধ না করেই মারা যান। সেই ঋণের টাকা শোধ করতেই কিশোর রাজিবের এই শ্রম দেয়া। কতবড়লোকযে টাকা ঋণ দিয়ে এমন কত রাজিবকেবন্ধকরেখেছে, তার হিসাব কে দেবে? না, হিসাব দেয়ার কেউ নেই। অথচ দেখতে পাচ্ছি এসব দুঃখের কথা বলে, দুঃখ লাঘবের কথা বলে, কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে বলে কত এনজিও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে কাজ করছে। বড় বড় এনজিও। নাম শুনলে সবাই অবাক হবেন। তাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও মজার ঘটনা ঘটছে। মহাজনের কাছ থেকে মানুষ প্রথমে ঋণ নেয়। মহাজনের তাড়া খেয়ে কৃষক যান এনজিওর কাছে। এনজিওর তাড়া খেয়ে তারা যান ব্যাংকের কাছে। দিনে দিনে ঋণ বাড়ে। ঋণের জাল থেকে তিনি আর বেরোতে পারেন না ইহজীবনে। ঋণ নিয়ে জন্ম, ঋণ নিয়েই মৃত্যু।

আর তার সন্তান ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে শুরু করে জীবন। জীবনচক্র থেকে কি কৃষকের মুক্তি নেই? মনে হয়েছিল মুক্তি আছে। যখন প্রয়োজন ঠিক তখনই ঋণ দেয়া। যত ঋণ প্রয়োজন ঠিক ততটা দেয়া। সহনশীল সুদের হারে ঋণ দেয়া। ঋণের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা। এই ছিল কথা। এটি এনজিওগুলো পারত। পারে মহাজনরা। ব্যাংকগুলো পারে না। না পারার ডজন ডজন কারণ। ফলে এখন মহাজন, এনজিও আর ব্যাংক মিলে তৈরি হয়েছে এক ঋণের বৃত্ত। প্রথমে মহাজনের ঋণ, তারপর তা শোধ করতে এনজিওর ঋণ, তা শোধ করতে ব্যাংকের ঋণ। ব্যাংক সব সরকারের। সেখানে নানাভাবেহিসাবহয়, শেষ নেই যেন কোথাও। এই হচ্ছেআটমাসিবছরের কথা। এবারতেরোমাসিবছরের কথা বলি।

তেরো মাসে বছর’— হিসাবও আরেক মহাজনের। নব্য আধুনিক মহাজনের। তিনি হচ্ছেন ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং আমাদের দেশের। কীভাবে? কীভাবে খবরটা অনেকে জানেনই না। দেশের অনেক ব্যাংক চুপিচুপি ১৩ মাসের বছর কায়েম করছে। গ্রাম্য মহাজনরা আট মাসের বছর করেছেন ঋণের ক্ষেত্রে। কারণ এটাইতাদের স্বার্থে। আধুনিক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের স্বার্থ কায়েমের জন্য আমানত (ডিপোজিট) নেয় ১৩ মাসের জন্য। সুদ দেয় ১২ মাসের। এইপ্যাঁচকেউ বুঝতে পারে না। কোনো কোনো ব্যাংক করেছেসাতমাসিআমানত। এসব মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে, এই অঞ্চলে আমরা পরিচিত তিন মাসের, ছয় মাসের, এক বছরের অথবা ততোধিক বছরের মেয়াদি আমানতে। সব ব্যাংক তা অনুসরণ করছে দীর্ঘদিন থেকে। এটাই ব্যাংকের পুরনোমেয়াদি আমানত প্রডাক্ট মেয়াদি আমানতে আরো কিছু প্রকল্প ইদানীং অনেক ব্যাংক করছে। সেগুলো ভিন্ন জাতেরপ্রডাক্ট তেরোমাসি, সাতমাসি প্রডাক্ট অতিচালাক ব্যাংকারদের কীর্তি। এর দ্বারা যে মানুষকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, মানুষের সঙ্গে, আমানতকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে সম্পর্কে একটি দৈনিকে একটি স্টোরি (২২.১১.১৯) ছাপা হয়েছে। খবরের শিরোনাম: অযৌক্তিক চার্জে নাকাল ব্যাংকের গ্রাহকরা। খবরের ভেতরে বলা হয়েছে, ‘কোনো কোনো ব্যাংক ১৩ মাসে বছর ধরে আমানত সংগ্রহ করছে।স্টোরিটিতে ব্যাংকগুলো নানা অজুহাতে কত রকমের চার্জ মানুষের কাছ থেকে আদায় করে তার একটা বর্ণনা আছে। ব্যাংক কীভাবে ভালো ঋণগ্রহীতাদের ঠকাচ্ছে তার বর্ণনাও এতে আছে। এসব অনেক ঘটনাই প্রতারণার ঘটনা। মানুষ ঠকানোর ঘটনা। তা না হলে তেরোমাসি প্রডাক্ট আসে কোত্থেকে? কী বুদ্ধিতে? ঠিক আছে ১৩ মাসের আমানত, সুদ ১২ মাসের কেন? অথচ এসব চালাকি-প্রতারণার কথা সাধারণ গ্রাহক বুঝতে পারেন না। কোনো কোনো ব্যাংক আমানতের (ডিপোজিট) সংকটে আছে। তাদেরফান্ডদরকার। তারা ফান্ড পাচ্ছে না। বাজারে আমানত নেই। মানুষের হাতে টাকা নেই। তা না হলে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে কঠোর বাধা-নিষেধ সত্ত্বেও ব্যাংকে আমানত আসছে না কেন? তাহলে কি ফান্ড শেয়ারবাজারে যাচ্ছে? না, তাও না। যেহেতু ফান্ড পাওয়া যাচ্ছে না, তাই তারা সুদের হার বাড়াচ্ছে। অথচ ব্যাংক মালিকদের অঙ্গীকার আছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী অনেকটা বাজার অর্থনীতির বিপক্ষে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থেনয়-ছয়নীতি গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেন। ঋণের ওপর সুদ শতাংশ এবং আমানতে শতাংশ সুদ। ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিংহভাগ নয়-ছয়নীতি বাস্তবায়ন করছে না। এর কারণ অনেক। এই ফাঁকে তারা আমানতকারীদের ঠকিয়ে কম সুদ দিচ্ছে। একদিকে ব্যাংকগুলো শতাংশ সুদ কার্যকর করেনি, কিন্তু আমানতের ওপর সুদ ঠিকই কমিয়ে দিয়েছে। সরকারি ব্যাংক তো মেয়াদি আমানতের ওপর সুদ দেয় - শতাংশ। অথচ মূল্যস্ফীতির হারই শতাংশ। তার মানে মূল্যস্ফীতিরও কম সুদের হার। সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো করছে কী? তারা প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। মুখে বলছে সুদের হার বেশি অথচ দিচ্ছে কম।  তেরোমাসি আমানত, সাতমাসি আমানত এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কারণ তেরোমাসি হলেও সুদ বারো মাসের। সাতমাসি হলেও সুদ ছয় মাসের। এসব ঘটনা কি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে নেই? থাকলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কোথায়? পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশাবলি সমানে ভেঙে চলেছে। তারাস্প্রেডেরনীতি (আমানত ঋণের সুদহারের পার্থক্য) মানে না। বড় ঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিরুৎসাহিত করতে বলেছে। তারা তা আরো বেশি করে দিচ্ছে। ব্যাংকঋণ বিতরণে ভৌগোলিকভাবে সাম্য রক্ষা করার কথা তাদের। কিন্তু তারা ঢাকা চট্টগ্রামের বাইরে ঋণ দিতে চায় না। খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়। তা তারা পূরণ করতে পারে না। বেশি ঋণ দিয়ে অনেক ব্যাংক অন্যায় করেছে। তারা তা সমন্বয় করতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ তারা অমান্য করছে। অথচ তারা কত সুবিধাই না সরকারের কাছ থেকে নিয়েছে। আমার প্রশ্ন, এতসব অনাচার করে, নির্দেশ অমান্য করে, আদেশ ভঙ্গ করে অনেক ব্যাংক কীভাবে বাজারে ব্যবসা করছে? অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নয়-ছয় নীতি কার্যকর না করলে তিনি ব্যাংকের লাইসেন্স বাতিল করবেন। এমন কড়া বার্তা দেয়ার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনোনড়াচড়াদেখা যাচ্ছে না। সবকিছু বাদ দিই। ব্যাংকের অস্তিত্বের মূলে কাজ করে যে আমানত আমানতকারী, তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন, তাদের ঠকিয়ে প্রতারণা করে কোনো কোনো ব্যাংক ব্যবসা করছে কীভাবে?

 

. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন