শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

মুক্ত অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি

নীলাঞ্জন কুমার সাহা

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বেশি আলোচিত জাতীয় বিষয় হচ্ছে, আমাদের খুচরা বাজারে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, যার কারণে সাধারণ ভোক্তা-জনগণ তো বটেই, সরকারও এখন এর তীব্রতা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত গত আগস্টের মাঝামাঝি পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর থেকেই আমাদের পেঁয়াজের বাজার অস্বাভাবিক রকম বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং নভেম্বরের মাঝামাঝি তা সর্বোচ্চ পর্যায় পৌঁছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে নানা ব্যবস্থা, যেমন বাজার তদারকি জোরদার, খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি অন্য দেশ থেকে ত্বরিত আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তা থেকে আশাতীত ফল পাওয়া যায়নি। মাসেই মিসর থেকে জরুরি ভিত্তিতে পেঁয়াজ আমদানির পর বর্তমানে এর দাম কমা শুরু হলেও গতি অত্যন্ত মন্থর।

যেহেতু এরই মধ্যে আমাদের কৃষকদের উৎপাদিত নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসা শুরু করেছে এবং একই সঙ্গে তুরস্ক মিয়ানমার থেকেও পেঁয়াজ আমদানির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তাই আশা করছি শিগগিরই পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসবে অর্থাৎ পেঁয়াজের দাম ক্রেতার সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। আবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত যে, একটি দুষ্ট চক্র একই সঙ্গে লবণের বাজারও অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করেছে, যদিও সরকারের কঠোর নজরদারিতে শেষ পর্যন্ত তাদের অসৎ উদ্দেশ্য সফল হয়নি। আমাদের খুচরা বাজারের এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, তার ফলাফল নিয়ন্ত্রণ পর্যালোচনা খুবই জরুরি, কেননা এটা হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে সহায়তা করবে, যাতে ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ বা ঘটলেও শিগগিরই এর প্রতিকার করা সম্ভব হয়।

বর্তমানে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ কি শুধুই ভারত থেকে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ হওয়া না তার পেছনে আরো অনেক কারণ রয়েছে, তা একটু খতিয়ে দেখা দরকার। সবাই জানি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে যেকোনো জিনিসে দাম বেড়ে যেতে পারে। বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে পেঁয়াজ সরবরাহের তেমন কোনো ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়নি, তথাপি পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, কিন্তু কেন? পেঁয়াজের মাত্রাধিক মূল্যবৃদ্ধির অনেক কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হতে পারে:

) কৃষি, খাদ্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা: কৃষি মন্ত্রণালয় দেশে পেঁয়াজের ফলনের পরিমাণ সম্পর্কে অবগত, খাদ্য মন্ত্রণালয় গড় চাহিদার ব্যাপারে অবগত। আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাহিদা উৎপাদনের মধ্যে যে ঘাটতি, আমদানির মাধ্যমে তা সঠিক সময়ে পূরণ করে থাকে। এক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা বেশ প্রকট বলেই মনে হয়, যা অবশ্যই কাটিয়ে উঠতে হবে। উল্লেখ্য, এবার পেঁয়াজের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা যদি আগামীতে পেঁয়াজ চাষে বেশি ঝুঁকে পড়েন, তখন অন্য প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং এতে ওইসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে। সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিষয়েও আগাম দৃষ্টি দেয়া দরকার।

) একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অত্যধিক আমদানি নির্ভরশীলতা: গত অক্টোবরে ভারতের গোয়হাটিতে ভারত-বাংলাদেশ স্টেকহোল্ডারদের এক সভায় আমাদের মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দেশে বর্তমানে ছয় লাখ টন পেঁয়াজের ঘাটতি রয়েছে এবং ঘাটতির শতকরা ৮০ ভাগ পেঁয়াজই ভারত থেকে আমদানি করে মেটানো হয়। ভারতের সরকার বলছে, প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে পেঁয়াজের ফলন ভালো না হওয়ায় এবং মহারাষ্ট্রে নির্বাচনের কারণে তারা পেঁয়াজ রফতানি আপাতত বন্ধ রেখেছে। যদিও এটা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তবু আমাদের উচিত কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরশীল না হয়ে একাধিক রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা। অর্থাৎ আমদানির উৎসগুলো বাড়ানো, যাতে একটি দেশের নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের স্বার্থ কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।

) কৃত্রিম সরবরাহ সংকট তৈরি করে বা গুজব রটিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে অসৎ মুনাফাভোগী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সরকারবিরোধী কুচক্রী মহলের একটি যৌথ অপপ্রয়াস: কোনো একটি দল যখন সরকার গঠন করে, তখন বিভিন্ন ধরনের বাজার বা ব্যবসায়িক সমিতিতে ওই সরকার? সমর্থিত লোকজনই সাধারণত প্রাধান্য বিস্তার করে। যদি তা- হয়, তাহলে ওইসব লোকের সহায়তায় সরকার কেন দুষ্ট চক্র ভেঙে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না? তাহলে শর্ষেতেই কি ভূত রয়েছে? যদি তা- হয়, তাহলে সরকারের এখন উচিত ওঁঝা ডেকে শিগগিরই ভূত তাড়ানোর ব্যবস্থা করা, যাতে করে অসৎ ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই ব্যবসায়ী সমিতিগুলোয় প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে। অন্যথায় সুযোগ বুঝে আবারো তারা অতি মুনাফার আশায় কৃত্রিমভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে জনগণের মনে অসন্তোষের বীজ বপন করে দিতে পারে।

বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত লেখনী থেকে আমরা এও জানতে পারি, ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগ শাসনামলেও স্বাধীনতাবিরোধীরা সুকৌশলে পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য দ্রব্যসামগ্রীর অহেতুক গুদামজাতের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সরবরাহ সংকট তৈরি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে জনগণের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। এবারো বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় একটু চোখ রাখলেই বোঝা যাবে, একটি বিশেষ চক্র বা মহল পেঁয়াজের দাম বাড়াকে সুকৌশলে ব্যবহার করে বা গুজব রটিয়ে সরকারের ওপর জনগণের মনকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। তাই যেকোনো গুজব বা অপপ্রচারে জনগণ যাতে বিভ্রান্তিতে  না পড়ে, সেদিকেও সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে।

) কার্যকর বাজার তদারকি নিয়ন্ত্রণের অভাব: সমাজের সব ধরনের পেশার লোকজন, তাদের কাজের গতিপ্রকৃতি, আশা-আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদির প্রতি সমানভাবে সরকারের খবরদারি বা নজর রাখা উচিত। আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা, উৎপাদক থেকে ভোক্তা, রিকশাওয়ালা, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নার্স, ওষুধ ব্যবসায়ী, প্লাম্বার, রাজমিস্ত্রি, ধোপা, ড্রাইভার, টেকনিশিয়ান, সবজি বিক্রেতা, মুদিদোকানদার, এমনকি সেলুন কর্মীরাও যদি কোনো রাজনৈতিক কারণে জন বা সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন বা ধর্মঘটের ডাক দেন, তাহলে সমাজের লোকজন সাময়িকভাবে বিরাট অসুবিধায় পড়ে যাবে এবং শিগগিরই এর প্রতিকার না হলে সমাজের সবাই সরকারের দিকেই অঙ্গুলি প্রদর্শন করবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে সরকার একটি গোপন কার্যকর বাজার নজরদারি বা তদারকি সেল গঠন করতে পারে, যার প্রধান কাজ হবে বিভিন্ন বাজারে কোনো ধরনের অসংগতি পরিলক্ষিত হলে তত্ক্ষণাৎ তা সরকারকে অবহিত করা, যাতে করে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত যেকোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।

আবার সমাজে লোকজনের ব্যবহূত প্রতিটি বস্তু বা সেবার মান, তার দাম সরবরাহের প্রতি সরকারকে অবশ্যই লক্ষ রাখা উচিত, কেননা একটি পণ্যের বা সেবার অপ্রত্যাশিত সরবরাহ হ্রাস বা তার মূল্যবৃদ্ধি যেকোনো দক্ষ সরকারকেও অজনপ্রিয় করে দিতে পারে। সমাজে জনগণের যেকোনো সমস্যা, অসন্তোষ, অরাজকতা বা বিশৃঙ্খলা আপাতদৃষ্টিতে সরকারের কাছে তুচ্ছ মনে হলেও এগুলো একত্রে জটবেঁধে সরকারকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত করে ফেলতে পারে, আর দীর্ঘমেয়াদে এর প্রতিষেধক হয়তো সরকারেরও জানা থাকবে না। তাই সরকারের সুস্বাস্থ্যের ধারাবাহিকতার কারণেই যেকোনো সমস্যা তার গোড়াতেই নির্মূল করা প্রয়োজন, অন্যথায় তা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে সরকারের বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পরিশেষে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারের প্রত্যক্ষভাবে তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও এটা আশা করা হয়, একটি দক্ষ সরকার জনগণের স্বার্থেই পরোক্ষভাবে হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে অর্থাৎ এক্ষেত্রে সরকার শুধু বাজার নিয়ামক না হয়ে পরোক্ষ বাজার নিয়ন্ত্রক হিসেবেও কাজ করবে, যাতে মুক্তবাজার অর্থনীতির কুফল সমাজের লোকজনকে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।

 

নীলাঞ্জন কুমার সাহা: ডিন, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ

সহযোগী অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন