শুক্রবার| জানুয়ারি ২৪, ২০২০| ১১মাঘ১৪২৬

দেশের খবর

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল

দূরযাত্রা ও পণ্য পরিবহনে গতি এনেছে ঘোড়ার গাড়ি

বণিক বার্তা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম

 উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ১৬টি নদ-নদী এসব নদ-নদীর অববাহিকায় জেগে ওঠা চার শতাধিক চরে বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি বসবাস করছে বহু মানুষ বরাবরই এসব চরবাসীর প্রধান সমস্যা ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে চরগুলো ধুধু বালুচরে পরিণত হলে হেঁটে চলা ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকত না অবস্থায় ছয়-সাত বছর আগে প্রচলন ঘটে ঘোড়ায় টানা গাড়ির, যা চরাঞ্চলে দূরের পথ পাড়ি দেয়া কিংবা ফসল পরিবহন অনেকটাই সহজ করে দেয়

সরেজমিন সদর উপজেলার চরযাত্রাপুরে দেখা মেলে বেশকিছু ঘোড়ার গাড়ির গাড়িতে করেই কেউ দুর্গম বালুপথ পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ পরিবহন করছেন কৃষিপণ্য মোটা টায়ারের চাকা দিয়ে তৈরি গাড়ি অনায়াসেই বালির ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে আর হাট-বাজার করাসহ দূরে কোথাও যেতে গাড়িই হয়ে উঠেছে চরবাসীর ভরসাস্থল

ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে উলিপুরের বেগমগঞ্জের জাহাজের আলগা চর থেকে ১০ বস্তা ধান নিয়ে যাত্রাপুর হাটে যাচ্ছিলেন মজিবর রহমান মেম্বার নৌকায় নদ পেরিয়ে এপারে এসে ধান পরিবহনের জন্য তিনি ভাড়া করেন দুটি ঘোড়ার গাড়ি সময় তিনি বলেন, বালিপথে যন্ত্রচালিত ভারী কোনো যানবাহন চলাচলের উপায় নেই তবে ঘোড়ার গাড়িতে করে সহজেই তিনি ধান পরিবহন করছেন গাড়ি না থাকলে তাকে শ্রমিক দিয়ে মাথায় করে ধান বাজারে নিতে হতো এতে খরচ বেড়ে যেত কয়েক গুণ

পুরো উত্তরবঙ্গের চরাঞ্চলের মধ্যে যাত্রাপুর সব থেকে বড় হাট ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় হাটে জেলার অধিকাংশ চরবাসী তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন একই সঙ্গে এখান থেকেই কিনে নিয়ে যান নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তাছাড়া হাটে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা চরবাসীর উৎপাদিত ফসল কিনে থাকেন ফলে সবদিক থেকেই কুড়িগ্রামের চরবাসীর কাছে হাটটির গুরুত্ব অনেক আর হাটকে কেন্দ্র করে পাঁচ শতাধিক মানুষ ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন

যাত্রাপুর হাটের কাঠ ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, তার -মিলে প্রতিদিন চরাঞ্চলের মানুষ গাছ নিয়ে এসে চেরাই করে নিয়ে যান এই গাছ কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রেও একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি

একাধিক ঘোড়ার গাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সাধারণত মাইক্রোবাসের পুরনো চাকা দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি তৈরি করেন প্রতিটি গাড়ি তৈরি করতে খরচ পড়ে ১১-১৫ হাজার টাকা আর ঘোড়া কিনতে লাগে আরো ২৫-৩০ হাজার টাকা

ঘোড়ার গাড়ির মালিক চালক যাত্রাপুর ইউনিয়নের গারুহারা গ্রামের মাহাবুর আলম বলেন, একটি ঘোড়ায় টানা দুই চাকার গাড়িটি তিনি তৈরি করেছেন পাঁচ বছর আগে তখন থেকেই ঘোড়ার গাড়িই তার পরিবারের অন্নসংস্থানের প্রধান উপায়

তিনি বলেন, শুকনো মৌসুমে চরাঞ্চলের প্রায় পুরোটাই বালিতে পূর্ণ থাকে এছাড়া রাস্তাঘাট যা আছে তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে যন্ত্রচালিত যানবাহন খুব একটা চলতে পারে না কিন্তু পথে চলতে ঘোড়ার গাড়ির কোনো সমস্যা হয় না ফলে অঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা বেশি

ঘোগাদহ ইউনিয়নের ঘোড়ার গাড়ির মালিক নুর ইসলাম বলেন, তিনি গাড়ি চালাচ্ছেন ছয় বছর ধরে আগে তার আয় অনেক বেশি হতো কিন্তু এখন গাড়ির সংখ্যা বেশি হওয়ায় আয় কমে গেছে তাছাড়া প্রতিদিন ঘোড়াকে ১০০-১৫০ টাকার খাবার দিতে হয় তার পরও এখন প্রতিদিন তার ৩০০-৬০০ টাকা আয় হচ্ছে

বিষয়ে সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী সরকার বলেন, আগে অঞ্চলে কোনো ঘোড়ার গাড়ি ছিল না তবে ছয়-সাত বছর আগে থেকে এর প্রচলন শুরু হয় এখন ঘোড়ার গাড়িতে করেই পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে যাত্রী পরিবহনও করা হচ্ছে কারণ বাইরের

ব্যবসায়ীরা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চরের রাস্তা দিয়ে বড় যানবাহন নিয়ে হাটে আসতে পারেন না ফলে তারা হাট থেকে পণ্য কিনে প্রথমে ঘোড়ার গাড়িতে করে ভাঙা সড়ক পার হন পরে তারা ভালো সড়কে গিয়ে পণ্যগুলো ট্রাকে তোলেন তাছাড়া চরের বালুপথে অটোরিকশা বা ভ্যান চলতে পারে না এসব যানবাহনের চাকা সহজেই বালিতে গেঁথে যায় অবস্থায় অঞ্চলে দিন দিন ঘোড়ার গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেছে বর্তমানে যাত্রাপুরের ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন দেখে অন্য চরগুলোতেও গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন বলেন, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমর, ফুলকুমরসহ ১৬টি নদ-নদী জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এসব নদ-নদীর অববাহিকায় চর রয়েছে চার শতাধিক চর ফলে নদীবেষ্টিত জেলার চরাঞ্চলে যাতায়াত পণ্য পরিবহনের প্রধান বাহন হয়ে উঠেছে ঘোড়ার গাড়ি, যা চরবাসীর জীবনযাত্রা অনেকটাই সহজ করে তুলেছে

তিনি আরো জানান, বর্তমানে কুড়িগ্রামে প্রায় আড়াই হাজার ঘোড়ার গাড়ি আছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘোড়ার মালিকদের উৎসাহিত করতে প্রতি বছর ঘোড়দৌড়ের আয়োজন করা হয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন