শুক্রবার| জানুয়ারি ২৪, ২০২০| ১১মাঘ১৪২৬

সম্পাদকীয়

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বদলি প্রথা চালু কতটা যৌক্তিক

মাছুম বিল্লাহ

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বদলির জন্য বেশ কিছুকাল ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তারা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মতো তাদের চাকরিতেও বদলি চাইছেন। বিষয়টির পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি অনেক। আমি শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলছেন, সরকার আমাদের ১০০ শতাংশ মূল বেতন দিচ্ছে, কাজেই আমরা সরকারি চাকরির মতো বদলি আশা করতে পারি। তারা আরো বলেছেন, স্বেচ্ছাচারী ও রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা প্রভাবিত ম্যানেজিং কমিটির অধীন বেশিদিন চাকরি করা যায় না। তাতে হয় শিক্ষকতার মহান ব্রতকে বিসর্জন দিতে হয়, না-হয় চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। চাকরি ছেড়ে দেয়া যেহেতু কোনো সমাধান নয় বা সবসময় সম্ভবও না, তাই বদলি এর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান। কিন্তু আমরা জানি যে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অন্যটি থেকে আলাদা, পরিচালনা কমিটি আলাদা, প্রতিষ্ঠানের  আর্থিক সক্ষমতা আলাদা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংখ্যা আলাদা, নিয়োগের শর্ত ও চাকরির প্রকৃতিও কম-বেশি আলাদা। তাছাড়া উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে তাদের কমন কোনো অথিরিটি নেই, যদিও উপজেলা পর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কিংবা জেলা পর্যায়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আছেন কিন্তু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তাদের একক কোনো কর্তৃত্ব নেই। কর্তৃত্ব এখনো সেই ম্যানেজিং কমিটির ওপর। তাই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির বিষয়টি কীভাবে মীমাংসিত হবে? কে এটি দেখভাল করবেন? কার নির্দেশে এটি হবে?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে দেশের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেখানকার শিক্ষকদের মধ্যেও আলাদা এক ধরনেরমোটিভেশন তৈরি হয়, তারা প্রতিষ্ঠানে আলাদা এক পজিটিভ কালচার তৈরি করেন। সেখানে বাইরে থেকে হঠাৎ কাউকে তারা নিতেও চাইবেন না। তবে এটিও ঠিক, ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে দু-চারজন শিক্ষক যদি অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি হয়ে যেতে পারেন, তারা সেখানে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে শিখে যাওয়া পজিটিভ কালচার অনেকটা চালু করতে পারেন নতুন প্রতিষ্ঠানে, অবশ্য কমিটি যদি সহায়তা করে। এসব ক্ষেত্রে একটি হতে পারে যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পারফর্মিং কমিটি যদি তাদের প্রতিষ্ঠান আসলেই ভালো করতে চায় এবং ভালো পারফর্ম করা কমিটিও যদি চায় যে, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের মতো হোক, তাহলে তারা মিউচুয়ালি সেটি করতে পারেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কিংবা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবগত করে। এখন যেহেতু অতিরিক্ত জেলা কমিশনার (শিক্ষা) নামে একটি প্রশাসনিক পদ আছে, তিনি পুরো বিষয়টি দেখভাল করতে পারেন।

তবে এসব সমস্যার সমাধান সহজেই হতে পারে যদি পুরো শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হয়। শিক্ষা জাতীয়করণ হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি সরকারি হবে, তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কিন্তু শিক্ষার মানে যে পরিবর্তন হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেমন নেপালের শিক্ষকরা রাষ্ট্র কর্তৃক বেতন-ভাতা পান কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালিত ওইসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মান একেবারেই ভালো নয়। আমি ঢাকা সিটির দু-একটি উদাহরণ দিতে পারি। একটি বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত, সেখানকার কমিটি চাইছে বিদ্যালয়টিকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে। তাই তারা বিভিন্ন ধরনের সহপাঠক্রমিক কাজ বিদ্যালয়টিতে চালু করতে চান। যেমন বিজ্ঞান মেলা, গণিত মেলা, ল্যাংগুয়েজ ক্লাব ইত্যাদি। কিন্তু শিক্ষকরা সেটিতে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, বরং তারা বিভিন্ন ধরনের বাধা সৃষ্টি করছেন; যাতে এসব কাজ বিদ্যালয়টিতে না হয়। এগুলো হলে শিক্ষকদের কাজ বেড়ে যাবে এবং তাদের প্রাইভেট টিউশনিতে সমস্যা হবে তাই। অন্য আরেকটি বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত নয়। সেখানকার মালিক-কমিটি বিদ্যালয়টিতে অনেক কিছু চালু করেছেন এবং শিক্ষকরাও সেগুলো পালন করছেন। কারণ তাদের বেতন-ভাতাদি নির্ধারণ করে কমিটি তথা মালিক। তবে শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ হতে হবে, কারণ প্রথমে তাদের অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উপযুক্ত প্রার্থীরা যাতে এ সুবিধা পান, সেটি দেখতে হবে। শিক্ষকতা করার উপযুক্ত নন, তারা বৈধ-অবৈধভাবে শিক্ষকতায় ঢুকে পড়বেন এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন, সেটি হওয়া উচিত নয়। এনটিআরসির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষক বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখানে অনেক সমস্যা রয়ে গেছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এনটিআরসির পরিবর্তে শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। যেসব শিক্ষক এরই মধ্যে শিক্ষকতায় ঢুকে পড়েছেন, তারা যাতে আধুনিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করতে পারেন, সেজন্য তাদের সময় দিতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা এই মহান দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেন। আর তা না হওয়া পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও বদলি চালু করা যেতে পারে, যেখানে বিদ্যালয়/কলেজের ম্যানেজিং কমিটি/উপজেলা/জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের অবগত করে এবং পুরো বিষয়টি অতিরিক্ত জেলা কমিশনার (শিক্ষা) দেখভাল করতে পারেন। শুধু কমিটি বা উপজেলা বা জেলা কমিটির হাতে থাকলে বিষয়টিতে দুর্নীতি ঢুকে যাবে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক বদলির সুযোগ দেয়া হলে সেখানে দুর্নীতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কারণ অধিক  সুবিধাজনক, বিখ্যাত ও অর্থনৈতিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় রাজনৈতিকভাবে আশীর্বাদপুষ্টরা দলে দলে প্রভাব খাটিয়ে বদলি হওয়ার জোর চেষ্টা চালাবেন। এক্ষেত্রে সৎ কর্মকর্তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের দাপটে টিকতে পারবেন না। শুরু হবে এমপি-মন্ত্রীদের কাছে দৌড়াদৌড়ি, শিক্ষা কার্যক্রম  হুমকির মুখে পড়বে। আর অসৎ কর্মকর্তাদের হবে পোয়াবারো। তারা যাকে-তাকে যেখানে সেখানে বদলি করে এক নতুন ধরনের বাণিজ্য শুরু করবেন, যা একাডেমিক কার্যক্রমে নিয়ে আসবে স্থবিরতা। তবে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে বদলি প্রথা চালু হতে পারে উল্লিখিত তিন পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে।

স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়া মানে কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া। যেখানে শিক্ষক প্রতিনিধি, অভিভাবক প্রতিনিধি, বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিরা থাকবেন। তারা এলাকার শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করবেন, ভবিষ্যৎ বংশধরদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখবেন। কমিটির সদস্যদের এ ধরনের কাজ হওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছেটা কী? কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য অর্থ ব্যয়, গণসংযোগ, তদবির, দলাদলি, ইজম করা ইত্যাদি কালচারে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় তাদের হাতে (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) শিক্ষকদের বদলির ভার বা দায়দায়িত্ব অর্পণ করা যে কী ধরনের বিপদ ডেকে আনবে, সেটি আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। আবার এ ধরনের কমিটির দ্বারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে এবং দীর্ঘদিন ধরে তাদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষকরা পরিচালিত হলে সৎ ও যোগ্য শিক্ষকরা যে শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক শিক্ষক শিক্ষকতা ছেড়ে অন্য চাকরিতে প্রবেশের চেষ্টা করবেন, সেটিও তো অস্বাভাবিক নয়। এ ধরনের শিক্ষকদের শিক্ষকতা পেশায় ধরে রাখার জন্য তাদের বদলির প্রয়োজন, যাতে তারা অপেক্ষাকৃত ভালো কোনো কমিটির সঙ্গে কাজ করতে পারেন। অনেক প্রতিভাবান ও যোগ্য শিক্ষক শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন শুধু এসব ঝামেলার কারণে। সেক্ষেত্রে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে শিক্ষকদের অসৎ ও অযোগ্য কমিটির কাছে দীর্ঘদিন জিম্মি হয়ে থাকতে না হয়। 

তবে ঢাকাসহ বড় বড় সিটিতে কিছু ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোয় ভর্তির জন্য সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েন। সবাই ভাবেন এসব প্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারলে সবকিছু উদ্ধার হয়ে যাবে। তাই তারা সন্তানদের ওইসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর জন্য কোচিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর অমানবিক প্রেসার দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ বৈধভাবে ভর্তি হতে না পারলেও অবৈধ উপায়ে ভর্তির চেষ্টা করেন এবং করিয়েও থাকেন। কেউ কেউ রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব খাটিয়ে সন্তানদের ভর্তি করে ফেলেন। এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে চলে এসব প্রতিষ্ঠানের লেখাপড়া, ভর্তি এবং সার্বিক একাডেমিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসলে কী হয়? শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশান্তির দিকটি বিবেচনায় না নিয়ে শ্রেণীশিক্ষক, বিষয়শিক্ষক, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান সবাই মিলে এসব মেধাবী ও সৃজনশীল শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার্থী বানিয়ে ফেলেন। পরীক্ষা দিতে দিতে তাদের জীবন তিক্ত হয়ে যায়। পরে পাবলিক পরীক্ষায় একটি ভালো গ্রেড নিয়ে বের হয়, আর সবাই উল্লিখিত ব্যক্তিদের শুধু বাহবা দিতে থাকেন। কেউ চিন্তা করেন না, আসলে শিক্ষার্থীরা কতটা প্রবলেম সলভিং স্কিল অর্জন করেছে, কতটা সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পেরেছে ইত্যাদি। আর এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর জন্য শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সময়ের অপচয় করেন; ট্রাফিক জ্যামের কষ্ট স্বীকার করে সন্তানদের এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান। আর এসব প্রতিষ্ঠানে কয়েকজন শিক্ষক থাকেন, যারা বিভিন্নভাবে পরিচিত। তাদের কারণে এবং তাদের কাছে সন্তানদের পড়ানোর জন্য অভিভাবকরা ওইসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে ছোটেন। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সিটির মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বদলির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাদের নিয়মিত বদলি করা হলে চলমান অনেক ঝামেলা থেকে শিক্ষাঙ্গন অনেকটাই মুক্ত থাকবে। আর একই সিটির মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বদলির ব্যবস্থা করা হলে একদিকে যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক ধরনের সমতা চলে আসবে, তেমনি অভিভাবকদের ব্যস্ততাও কমবে, শহরও অনেকটা যানজটমুক্ত হবে। এ ধরনের বদলিতে প্রশাসনিক জটিলতাও অনেকটা কম হবে, কারণ একই সিটির বা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি কিংবা কোনো না কোনোভাবে অভিভাবক হন ডেপুটি কমিশনার না-হয় বিভাগীয় কমিশনার কিংবা সিটি করপোরেশনের মেয়র-চেয়ারম্যানরা। তিনি অতি সহজেই এ বদলি কার্যক্রম চালু করতে পারবেন। বিশেষ কোনো কারণে বা শাস্তিমূলক বদলির ক্ষেত্রে এক শহর বা সিটি থেকে অন্য শহর বা সিটিতেও এটি চালু করা যায়। আবার মিউচুয়ালিও এটি করা যায়। তবে বেসরকারি শিক্ষকদের গণহারে সর্বত্র বদলির ব্যবস্থা করার পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। যেখানেই বিষয়টি সম্ভব সেখানেই তা চালু করা উচিত, কারণ বদলি এক ধরনের রিলিফ ও মানসিক প্রশান্তিও বটে। মানুষ সবসময়ই পরিবর্তন চায়, এটি জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

 

মাছুম বিল্লাহ: বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত

সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন