শুক্রবার| জানুয়ারি ২৪, ২০২০| ১১মাঘ১৪২৬

সম্পাদকীয়

ওষুধ কোম্পানির বিপণন ব্যয় ২৯ শতাংশের বেশি

নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করুক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর

বিশ্বের অনেক দেশে ওষুধ বিপণন নিয়মের মধ্যে এলেও দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। ওষুধ কোম্পানির টাকায় চিকিৎসকদের বিদেশ ভ্রমণ বা উপঢৌকন নেয়ার মতো অনৈতিক চর্চাগুলো তদারকির মধ্যে নেই। ফলে ওষুধ বিপণন খরচের বড় অংশ অনৈতিকভাবে ব্যয় হচ্ছে। গতকাল বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণার বরাতে বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওষুধ কোম্পানিগুলো বিপণন বাবদ মোট ব্যয়ের ২৯ শতাংশের বেশি ব্যয় করছে। বিশ্বের অনেক দেশে ওষুধ বিপণন নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এ বিতর্ক নিরসনে বিপণন ব্যয়ে জাতীয়ভাবে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। বাংলাদেশে আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। নৈতিক চর্চা প্রায় অনুপস্থিত। সরকারের উচিত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ওষুধ বিপণনের খাতগুলো নজরদারির মাধ্যমে তদারক ও নিয়ন্ত্রণ করা।

বাংলাদেশে গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন মুনাফার একমাত্র উপকরণ নয়। এখানে উৎপাদিত ওষুধ বিপণনে বা প্রমোশনে যে যত বেশি টাকা ঢালতে পারবে, তার ওষুধের কাটতি তত বাড়বে; মুনাফা আসবে। ওষুধের কাটতি ও মুনাফার হার বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার হলো চিকিৎসক ও ওষুধ বিক্রেতা বা ওষুধের দোকানগুলো। ওষুধ কোম্পানি, চিকিৎসক, বিক্রয় প্রতিনিধিদের এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হওয়া দরকার। ওষুধ প্রমোশনে কোটি কোটি টাকা খরচের ভারটা রোগী বা ওষুধ ক্রেতাকেই বহন করতে হয়। এতে ওষুধের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। বিপণনে বেশি করা হলেও গবেষণায় ব্যয় করা হচ্ছে নগণ্য। এ কারণে জেনেরিক ওষুধ তৈরিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকছে। চিকিৎসকদের অজ্ঞতা, অবহেলা বা পড়াশোনার অভাবে নকল, ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধও রোগীর হাতে পৌঁছে যায় ওষুধ কোম্পানি ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ওষুধ কোম্পানি, চিকিৎসক ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের এ অশুভ ও অনৈতিক তত্পরতা নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। ভারতে এ ব্যাপারে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। কোনো চিকিৎসক উপহার নিলে তার চিকিৎসা সনদ বাতিল করার বিধান রাখা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে ওষুধ বিজ্ঞাপনে কোম্পানিগুলো বছরে কত টাকা খরচ করে তা প্রকাশ করতে হবে। বাংলাদেশেও এমন পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে।

জনস্বাস্থ্যের জন্য স্পর্শকাতর পণ্য ওষুধ নিয়ে কোম্পানিগুলোর অনৈতিক বিপণন নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। ওষুধের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করাটাই বরং যুক্তিযুক্ত। এমন বিপণন পন্থা ওষুধ শিল্পের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। সরকার বিশেষত ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে এটি রোধে আরো কঠোর হতে হবে। ওষুধের বিক্রি ও প্রচারের জন্য পৃথক কোড অব ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটিং প্র্যাকটিস প্রণয়ন করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রচারের উদ্দেশ্যে মেডিকেল পেশার সঙ্গে জড়িত কাউকে কোনো ধরনের উপহার দেয়া বা আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব কিংবা সহায়তা করা যাবে না। চিকিৎসকদের চেম্বার সাজানো থেকে শুরু করে নগদ অর্থ প্রদান করতে পারবে না ওষুধ কোম্পানিগুলো। যদিও এ নীতিমালাও লঙ্ঘন হচ্ছে। নিজেদের কোম্পানির ওষুধ বিক্রি বাড়াতে নানা উপঢৌকন নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে হাজির হচ্ছেন বিক্রয় প্রতিনিধিরা। এসব উপঢৌকনের বিনিময়ে চিকিৎসকরাও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওষুধ রোগীর ব্যবস্থাপত্রে লিখছেন। এছাড়া বিদেশে ভ্রমণ থেকে শুরু করে গাড়ি, ফ্রিজ, টিভি প্রদানের মতো ঘটনাও ঘটছে।

ওষুধ বাজারজাতে একটি সার্বিক নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে অবশ্যই বাজারজাতের পদ্ধতি, সীমারেখা, কোথায় কীভাবে কী ওষুধ প্রচার করতে পারবেন, প্রচারণার জন্য কতটুকু ব্যয় করতে পারবেন ইত্যাদির সীমারেখা টেনে দিতে হবে। শুধু নীতিমালা বা আইন থাকলেই চলবে না, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এখানেই পিছিয়ে আছে কর্তৃপক্ষ। এতে ওষুধ কোম্পানির সম্মান বাড়বে, ওষুধের অপব্যবহার কমবে, দামও সীমারেখার মধ্যে থাকবে এবং জনগণও উপকৃত হবে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প যখন দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বদরবারে মর্যাদার বাহক হয়ে বৈদেশিক আয়ের অন্যতম খাত হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছে, তখন এ নীতিমালা এ শিল্পকে নৈতিক ভিত্তিমূলে প্রতিষ্ঠিত করবে।

ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের লিটারেচারে যেসব তথ্য উপস্থাপন করে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি যাচাই করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। কারণ ওষুধ কোম্পানিগুলো যেসব তথ্য বিজ্ঞাপনে উপস্থাপন করে, তা সর্বাংশে সত্য বা বিজ্ঞান সমর্থিত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসকদের সবসময় স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন অনুসরণ করে রোগীর চিকিৎসা করা প্রয়োজন। এতে ভুল-ত্রুটি ও ওষুধ কোম্পানির অনাচার কমবে। অনৈতিক ওষুধ বিপণন বন্ধে সরকারের কোনো উদ্যোগ আছে বলে অতীতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশের অনেক পত্রপত্রিকায় এ ব্যাপারে অনেক প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে, প্রতিকারের উপায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি, যা কাম্য নয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবন করে সরকার জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে সবার প্রত্যাশা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন