শুক্রবার | জুলাই ০৩, ২০২০ | ১৮ আষাঢ় ১৪২৭

প্রথম পাতা

ওষুধ বিপণন ব্যয়ের ৬ হাজার কোটি টাকা কোথায় হয়?

বদরুল আলম

কিছুদিন আগে সপরিবারে ইন্দোনেশিয়ায় বেড়াতে যান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সরকারি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক। এর ব্যয় বহন করে ওষুধ প্রস্তুতকারক একটি কোম্পানি। শুধু তিনি নন, তার বিভাগের প্রায় ১০ জন চিকিৎসক বিভিন্ন সময় সপরিবারে বিদেশ ঘুরে এসেছেন ওষুধ কোম্পানির টাকায়।

ঢাকার আরেকটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের বাসায় এসেছে নতুন ফ্রিজ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান থেকে উপহারস্বরূপ ওই ফ্রিজ পাঠানো হয়েছে। কোম্পানির নিয়োগকৃত মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের (এমআর) মাধ্যমে চিকিৎসকের বাসায় উপহারসামগ্রীটি পৌঁছে দেয় ওষুধ কোম্পানি।

বিদেশ ভ্রমণ বা উপঢৌকন হিসেবে ফ্রিজ-টেলিভিশনই শুধু নয়, কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানি চিকিৎসকদের ফ্ল্যাট-গাড়ির মতো দামি উপহারও দিয়ে থাকে। এসবই তারা করছে ওষুধ বিপণনের প্রয়োজনে। আর বিপণন বাবদ মোট টার্নওভারের ২৯ শতাংশের বেশি ব্যয় করছে কোম্পানিগুলো। দেশে ওষুধের বাজারের আকার এরই মধ্যে ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। হিসাবে শুধু বিপণন বাবদ ওষুধ কোম্পানিগুলো বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করছে।

যদিও ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচারে বিধিনিষেধ থাকায় কৌশল অবলম্বন করছে তারা। কারণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া প্রচারমাধ্যমে ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচার ১৯৮২ সালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অবস্থায় ওষুধের বিজ্ঞাপন বাবদ বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় কোথায় হয়, সে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন গতকাল প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) সেখানেও বিপণন বাবদ ব্যয় হওয়া অর্থ কে পায়, সুনির্দিষ্টভাবে তা বলা নেই। তবে বিপণন ব্যয়ের খাত সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে। এমআরের মাধ্যমে চিকিৎসক ফার্মেসিতে ওষুধ পৌঁছে দিতে, হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরিতে বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে ক্যাম্পেইনে অর্থ ব্যয় করছে কোম্পানিগুলো। টেন্ডার বিজ্ঞাপনেও কিছু অর্থ ব্যয় হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশে ওষুধ বিপণন একটি নিয়মের মধ্যে এলেও দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। ওষুধ কোম্পানির টাকায় চিকিৎসকদের বিদেশ ভ্রমণ বা উপঢৌকন নেয়ার মতো অনৈতিক চর্চাগুলো তদারকির মধ্যে নেই। ফলে বিপণন খরচের বড় অংশ অনৈতিকভাবে ব্যয় হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি . রশীদ--মাহবুব বণিক বার্তাকে বলেন, ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপণন ব্যয় কোনোভাবেই ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ার যৌক্তিকতা নেই। বিশ্বের অনেক দেশে ওষুধের বিপণন নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে বিতর্ক নিরসনে বিপণন ব্যয়ে জাতীয়ভাবে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। বাংলাদেশে নৈতিক চর্চা প্রায় অনুপস্থিত। সরকারের উচিত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিপণনের খাতগুলো নজরদারির মাধ্যমে তদারকি নিয়ন্ত্রণ করা।

দেশের ওষুধ শিল্পের সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জ শীর্ষক গবেষণার প্রয়োজনে ২৬টি কোম্পানির ওপর জরিপ চালান বিআইডিএসের গবেষকরা। সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ওষুধ শিল্পের বার্ষিক টার্নওভারের ২৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ ব্যয় হয় বিপণনে। হিসাবে বার্ষিক বিপণন ব্যয় হয় হাজার ২২ কোটি টাকা। ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচারে বিধিনিষেধ সত্ত্বেও বিপণন ব্যয়ের পরিমাণকে অস্বাভাবিক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষণা পরিচালক . নাজনীন আহমেদ বলেন, এমআরের মাধ্যমে ওষুধগুলো চিকিৎসকের সহযোগিতায় ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর কৌশলই ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসরণ করে। চিকিৎসক, হাসপাতাল ফার্মেসিগুলোর ওষুধ পৌঁছে দিতেই এমআরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। পণ্য বিপণনের বড় কৌশল এমআরদের ঘিরেই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন