শনিবার | ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

ব্যাংকঋণে এত সুদ বিশ্বের কোথাও নেই: অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের মতো ব্যাংকঋণে এত বেশি সুদহার বিশ্বের কোথাও নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি বলেছিলাম খেলাপি ঋণ বাড়বে না। কিন্তু খেলাপি ঋণ বেড়েছে। দেশে খেলাপি ঋণ বাড়ার মূল কারণ উচ্চ সুদহার। বাংলাদেশের মতো এত বেশি সুদ বিশ্বের কোথাও নেই। এজন্য ব্যাংকঋণের সুদহার কমাতে হবে।

গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

মুস্তফা কামাল বলেন, ব্যাংকঋণের সুদহার কমাতে আজই একটি কমিটি গঠন করা হবে। আগামী সাতদিনের মধ্যে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। সে অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সুদহার হ্রাস এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু হবে।

দেশে বেকারত্ব দিন দিন বাড়ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই বেকারত্ব কমাতে হলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। উৎপাদনশীল খাতকে বাঁচাতে ব্যাংকঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এখনো সুদহার এক অঙ্কে নামেনি কেন এবং খেলাপি ঋণ দিন দিন কী কারণে বাড়ছে, সেটা তদারকির জন্যই কমিটি গঠন করা হবে।

সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর, সরকারি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রধান অর্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে কমিটি গঠিত হবে। কমিটির সদস্যসংখ্যা সাত হতে পারে।

খেলাপি ঋণ কমাতে সরকারের সুপারিশে ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালা জারির পর খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো বেড়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বলেন, শতাংশ ডাউন পেমেন্টে শতাংশ সুদে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দেয়ার কারণে নিয়মিত গ্রাহকরাও এখন খেলাপি হয়ে গেছে। সে কারণেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ অবশ্যই কমবে বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী।

খেলাপি ঋণ কমাতে শুরু থেকে সরকার শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ না কমার কারণেই ঋণের সুদহার বেড়েছে। সুদহার বাড়লে একটি দেশের উৎপাদনশীল খাত, শিল্প খাত উন্নত হতে পারে না। মুহূর্তে যেকোনোভাবে খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অর্থঋণ আদালতে আটকে থাকা মামলাগুলো ব্যাংকের সুদহার কমিয়ে আনতে বাধা হিসেবে কাজ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জিডিপি কমলেও আমাদের দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমার কোনো ভয় নেই। কারণ আমাদের দেশের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কখনো কমবে না, বরং বাড়বে।

অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রিসহ কয়েকটি প্রক্রিয়া বিবেচনাধীন। যেগুলো ক্যাবিনেটে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগ-বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমানসহ দেশের সবকটি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এমডি বৈঠকে অংশ নেন।

বৈঠকের শুরুতেই বক্তব্য দেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিজাম চৌধুরী। তিনি ব্যাংকিং খাতের সংকটের কারণ উল্লেখ করে তা সমাধানে নজর দেয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্সশিট পরিচ্ছন্ন করতে একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগ-বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, গঠিত কোম্পানি খেলাপি ঋণ কিনে নিলে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্সশিট পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। এতে ঋণের সুদহার কমে আসবে।

বৈঠকে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে বণিক বার্তাকে জানান এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। তিনি বলেন, ব্যাংকঋণের সুদহার কমিয়ে আনার বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে একটি কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গঠিত কমিটির সুপারিশের আলোকে সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। আশা করছি, আগামী এক মাসের মধ্যে সুদহার কমানোর উদ্যোগ কার্যকর করা সম্ভব হবে।

সুদহার কমিয়ে আনার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমাতে বিচার বিভাগের গতি বাড়ানো এবং ব্যাংকের সঞ্চিতির ওপর ট্যাক্স আরোপের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান এবিবির চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

ঋণের সুদহার কমাতে সাত সদস্যের কমিটি: ব্যাংকঋণের সুদহার কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় গভর্নর ফজলে কবির কমিটি গঠন করেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান . জায়েদ বখত, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল্ মাসুদ, এবিবি চেয়ারম্যান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি শাহ আলম সারওয়ার এবং এনআরবি ব্যাংকের এমডি মো. মেহমুদ হোসেন। তবে কমিটি চাইলে সদস্যসংখ্যা বাড়াতে পারবে।

গঠিত কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাংকঋণের সুদহার কমানোর প্রক্রিয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন