শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

বিআইডিএস রিসার্চ অ্যালমানাক-২০১৯

নীতি ও তথ্যের ভ্রান্তিতে ভারসাম্যহীন বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

নীতি তথ্যের ক্ষেত্রে এখন যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। এতে বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য এলেও আর্থিক খাতে ঝুঁকি রয়েছে। আর্থিক খাত এখন হুইল চেয়ারে। এনবিআরনির্ভর রাজস্ব অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করবে। তবে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রতিযোগিতা আইনের কার্যকারিতা মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা দেশে চালের বাজারের ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ৫০ জনের কাছে।

রাজধানীর লেক শোর হোটেলে দুই দিনব্যাপী বিআইডিএস রিসার্চ অ্যালমানাক ২০১৯-এর উদ্বোধনী দিনে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন গবেষকরা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) আয়োজনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিআইডিএস মহাপরিচালক . কেএএস মুরশিদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) . শামসুল আলম পরিকল্পনা কমিশনের সচিব মো. নুরুল আমিন। উদ্বোধনী সেশন ছাড়াও তিনটি কারিগরি সেশনে এদিন মোট ১০টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষকরা। এবারের অ্যালমানাকের থিম ট্র্যাকিং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, দেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ঠিক রাখতে ভারতের অর্থনীতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। আগামী দু-তিন বছর দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে। তবে আমাদের বড় দুর্বলতা হলো বাজেটের আকার ছোট। শুধু এনবিআরনির্ভর রাজস্ব ঠিক হবে না।

দেশে তথ্য বিভ্রাট রয়েছে জানিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্যের যে তথ্য দেয়া হয়, সেটি প্রকৃত অর্থে সঠিক নয়। দেশে এখনো তিন কোটি মানুষ দরিদ্র। বিশ্বের অনেক দেশ রয়েছে, যাদের জনসংখ্যাই তিন কোটি নয়। আমরা সাধারণ দারিদ্র্য নিরসনে যতটা গুরুত্ব দিয়েছি, সামাজিক সূচক উন্নয়নে ততটা গুরুত্ব দিতে পারিনি। তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জিডিপির শতাংশ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।

বেশকিছু কৃষিপণ্যের উৎপাদন, চাহিদা আমদানির তথ্য বোধগম্য নয় বলে মন্তব্য করেন . শামসুল আলম। তিনি বলেন, চাল উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই। তাই পণ্যের বাজারে ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করার আগে তথ্যের যথার্থতা যাচাই করতে হবে। আবার কয়েকটি জেলায় দারিদ্র্যের হারের যে তথ্য দেয়া হচ্ছে, সেটি অতিরঞ্জিত কিনা ভেবে দেখতে হবে। তাই নীতি তথ্যের ক্ষেত্রে ভ্রান্তি আছে কিনা সেটি আগে সমাধান করতে হবে। তা না হলে বাজার ভারসাম্যহীন হবে। আবার পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা আইন আদৌ কাজ করছে কিনা কিংবা সেটি আদৌ দরকার আছে কিনা তা- ভেবে দেখতে হবে।

দেশের অর্থনীতিতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে জানিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হার কমছে, বৈষম্য বাড়ছে। ব্যাংকিং খাতে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাইরে থেকে যা দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকিং খাতের ভেতরের অবস্থা আরো খারাপ। অনেকেই বলে, ব্যাংকিং খাত এখন হুইল চেয়ারে।

৫০ মিলারের দখলে চালের বাজারের ২০ শতাংশ: রাইস মার্কেট ইন বাংলাদেশ: রোল অব কি ইন্টারমিডিয়ারিস শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষণা ফেলো . নাজনীন আহমেদ। তিনি বলেন, দেশে মোট ৯৪৯টি অটো রাইস মিল থাকলেও এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ৫০টি অটো রাইস মিল মালিক চালের বাজারের ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করেন। এসব মিলের প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে দেড় হাজার টন চাল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তারা ইচ্ছা করলে প্রভাব বিস্তার করে চালের দাম বাড়াতে বা কমাতে পারেন। তবে সেটি তারা করেন কিনা জানা যায়নি। চালের বাজার প্রতিযোগিতামূলক রয়েছে এবং কোনো সিন্ডিকেট নেই। সবচেয়ে বড় ৫০টি অটো রাইস মিলের ওপর নিয়মিত তদারকি নজরদারি করতে হবে। দেশের সবচেয়ে বড় কৃষক মধ্যস্বত্বভোগীদের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সরকারের চলমান ধান ক্রয় মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ওএমএস কর্মসূচি সম্প্রসারণও অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ তারা ইচ্ছা করলে বাজারে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। কিন্তু তারা আইনবহির্ভূত প্রভাব বিস্তার করছেন কিনা সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না। আইন অনুযায়ী মিলাররা সময়ের চেয়ে বেশিদিন মজুদ রাখেন অধিক লাভের আশায়, তাহলে সেটি সরকারকে দেখতে হবে।

চালকলের চেয়ে গুদামের সক্ষমতা বেশি ১২ শতাংশ মিলারের: দেশের ১২ শতাংশ মিলার তাদের মিলিং সক্ষমতার চেয়ে অনেক বড় গুদাম তৈরি করেছেন। এটি কেন করেছেন সেটিও দেখা দরকার। শুধু অটো রাইস মিল মালিকরাই নন, চালের বাজারে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন বড় কৃষক, আড়তদার, ফড়িয়া কমিশন এজেন্টরাও।

কৃষিকে পেশা হিসেবে নেয়ার প্রবণতা কমছে: ডাইনামিকস অব রুরাল নন-ফার্ম সেক্টর ইন বাংলাদেশ: ২০০০-২০১৬ শীর্ষক একটি গবেষণা উপস্থাপন করেন . কাজী ইকবাল। গবেষণার তথ্যমতে, ২০১৬ সালে গ্রামে শুধু কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে নিয়েছে ৪৩ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে অকৃষি খাতে পেশা হিসেবে রয়েছে ৩১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং দুটোকেই পেশা হিসেবে নিয়েছে ২৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এছাড়া প্রধান পেশার পরিবর্তে দ্বিতীয় পেশা হিসেবে কৃষিকে গ্রহণ করার হার বাড়ছে। ২০১০ ২০১৬ সালে আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জমি বাড়েনি। এছাড়া গ্রামীণ পরিবারে কৃষিতে শ্রমশক্তিও কমে আসছে। ২০০৫ সালে তা ৪৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ হলেও ২০১৭ সালে ৩৭ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

গতকালের সেশনে হলি কাউস অ্যান্ড আনহোলি ইনস্টিটিউশন: অ্যানালাইজিং দ্য প্যাটার্ন অব গ্রোথ অব ক্যাটল পপুলেশন ইন ইন্ডিয়া শীর্ষক আরেকটি গবেষণা উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক . কাজী আলী তৌফিক। প্যানেল আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক . ফেরদৌসি নাহার।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন