শুক্রবার| জানুয়ারি ২৪, ২০২০| ১১মাঘ১৪২৬

টকিজ

নির্ঝরের ৯ সিনেমার নেপথ্য কথা

রুবেল পারভেজ

মালাকিছু ফুল একটার পর একটা সুতোয় গাঁথা। তাল, লয়, ছন্দের অনবদ্য দ্যোতনাকে সঙ্গী করে মালা গাঁথার মতোই একটা ঐকতান তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন স্থপতি নির্মাতা এনামুল করিম নির্ঝর। একেবারে চুপচাপ, নীরব থেকে স্থাপত্য, গান আর সিনেমার মতো বিষয়কে একটু অন্যভাবে সাজানোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে আলোচিত ছবি আহা নির্মাণ করেছিলেন। ১২ বছর পর সম্প্রতি নির্মাতা ঘোষণা দিয়েছেন নয়টি চলচ্চিত্র নির্মাণের। এর পেছনের কারণ, উদ্দেশ্য কী? টকিজের কাছে নিজ বয়ানে এসব খোলাসা করলেন তিনি...

দেশকে এতকাল কী দিলাম?

আমার জন্ম ১৯৬২ সালে, আর আমার জন্মভূমির জন্ম ১৯৭১ সালে। বয়সের হিসাবে দেশের চেয়ে আমি নয় বছরের বড়। স্বাধীন দেশটি আমাকে বুকে আগলে রাখলেও এতকাল আমি দেশকে কী দিলাম? এতদিন পর এসে আমার বোধোদয় হয়েছে, আমি আমার দেশের ৫০ বছর পূর্তি সামনে রেখে কিছু কাজ করতে চাই। প্রিয় জন্মভূমিকে এমন কিছু দিতে চাই, যা ধারণ করে নতুন প্রজন্ম এগিয়ে যাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। এমন চিন্তা থেকেই স্থাপত্য, গান-সিনেমার মতো সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত হয়েছি।

সৃষ্টিতে কোনো আপস নয়...

উদযাপনের নামে এখন যে ভণ্ডামি হয়, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সবাই ভুলে গেছে। মূল্যবোধ বলে এখন আসলে কিছু নেই। সৃজনশীল চর্চায় নৈতিকতার বিষয়টি এখন আর মুখ্য নয় বেশির ভাগের কাছেই। কারণে ছবি বানানোর উদ্যোগ নেয়ার সময় আমার বিবেক আমাকে প্রশ্ন করেছে, ‘একজন ব্যাংক ডাকাতের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছবি করবে কেন? কেন এমন কারো কাছে যাবে, যে কিনা আমাদের পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে নষ্ট করে দিয়েছে, টেলিভিশন চ্যানেল দিয়ে সবকিছুকে কুক্ষিগত করে রেখেছে?’ এরপর সিদ্ধান্ত নিই আমি স্থাপত্য পেশা থেকে যে অর্থ আয় করি, তা দিয়েই ছবি বানাব। তবু কারো শর্তপূরণ করব না।

লক্ষ্য আমার যাদের ঘিরে

আমার অভিজ্ঞতা বলে তরুণ প্রজন্ম দেশকে ভালোবাসে, দেশের জন্য ওরা জীবন দেয়ার মানসিকতা রাখে। আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ওরা। কিন্তু ওদেরকে লক্ষ্য রেখে কেউ কিছুই করছে না। আমার মনে হয়েছে, আমরা যে প্রায় ৫০ বছর পার করে ফেলছি, জার্নিতে তো অসংখ্য ঘটনা-দুর্ঘটনা, ইতিহাস আছে, যা তরুণরা জানে না। এজন্য আমি প্রজন্মের জন্য ছবিগুলো বানাব বলে ঠিক করি। শুধু তা- নয়, আমার স্বপ্নপূরণের সারথিও ওরা। আমার প্রতিটি কাজে আমার সহসঙ্গী হিসেবে তরুণ প্রজন্মই আছে। তাছাড়া এতে বড়রা আসবে কেন, কারণ কাজগুলোয় বিশেষ করে চলচ্চিত্রে তো বড়দের সমস্যাই দেখানো হয়েছে। তো নিজের ভুল কি আর কেউ দেখতে চাইবে!

তারাই ছবির কারিগর

ছবি বানাতে গিয়ে ভেবেছি, কীভাবে কাজটি করলে সহজভাবে করতে পারব। এরপর কলাকুশলী, অভিনেতা-অভিনেত্রী প্রযুক্তি জোগাড় করলাম, তাদের প্রশিক্ষণ দিলাম, অভিনয় করালাম। প্রকল্পের প্রথম ছবি ব্যাপার বানানোর পর মনে হলো, বাহ! প্রফেশনাল অভিনেতা অভিনেত্রী দরকার কী, বাচ্চারাই তো অদ্ভুতভাবে ভালো অভিনয় করে।


কোনো
কিছুই বিনা মূল্যে নয়, তবে
...

আমার প্রকল্পের সঙ্গে যে তরুণরা যুক্ত, তাদের বলেছিলাম  দেখো ভাই, ’৭১- যখন মানুষ যুদ্ধে গেল, তখন কিন্তু কেউ আশা করেনি এটা করলে কত টাকা পাবে, কী লাভ হবে? কিন্তু বিজয় তারা ঠিকই ছিনিয়ে এনেছিল। তার মানে এই নয় যে, কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করিয়েছি ওদের দিয়ে। আমি শুধু বোঝানোর চেষ্টা করেছি, আমার এতটুকু বাজেট, তোমাকে এই দিতে পারব, তুমি করলে করো, না হলে করো না। অল্প হলেও লেগে থাকলে এটিকে লাভজনক করে তোলা যাবে। ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে যদি ১০০ টাকা রিটার্ন আনতে পারি, তা দিয়ে একসময় ওরাই ছবি বানাতে পারবে।

’-এর একটা ব্যাপার আছে...

বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, বদ্বীপ, বাংলা ভাষা। সবই মূলের শুরুই তোদিয়ে। বিষয়টির সঙ্গে অনুভূতির একটা যোগসূত্র তৈরির চেষ্টা করেছি এর মধ্য দিয়ে। প্রত্যেকটি ছবির গল্প এগোবে ভিন্ন ভিন্ন মানসিক বিষয় নিয়ে। এর মধ্যে যেমন আছে বাচ্চাদের নিয়ে, তেমনি আছে সাহিত্যিকদের নিয়ে। আরেকটা ছবির নাম বাকবাকুম, সেখানে চারপাশে চর্চিত শব্দের যে নান্দনিকতা, তা তুলে ধরা হবে।

প্রথম ছবি ব্যাপার কেন?

কারণ এটা তো একটা ব্যাপার। ছবিটির গল্প হচ্ছে এখনকার ছেলেমেয়েরা যারা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করেছে তাদের এক ধরণের মানসিক অবস্থান নিয়ে।

উদ্যোগ প্রথা ভাঙার উদ্যোগ

অনেকেই বিস্মিত হয়েছে, আহা ছবির পর ১২ বছর ছবি বানাইনি। এরপর হুট করে দুই বছরের মধ্যে নয়টি ছবি বানানোর ঘোষণা! আসলে এটা আমাদের অভিপ্রায়। আমার কথা হচ্ছে, একটা প্রসেস দাঁড় করাতে হবে; তাছাড়া আমি তো অন্য কারো পয়সা নিয়ে ছবি বানাচ্ছি না। বাচ্চারাও জানে, আমি সদ্ভাবে স্থাপত্য নিয়ে কাজ করে যে টাকাটা রোজগার করি, তা দিয়ে কাজ করছি। যাহোক, আমার মনে হয়েছে, যারা নিজেদেরসৃজনশীলদাবি করছে, তাদের পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দর্শক ভালো কিছু পায়নি। তাদের মেধাকে শাণিত না করতে করতে তারাও অকার্যকর হয়ে গেছে। এজন্য একটু অন্য রকম বিষয় তুলে ধরলে তাও তারা গ্রহণ করতে পারে না। সে জায়গা থেকে পুরো উদ্যোগটা শুধু কয়েকটি সিনেমা বানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রথা ভাঙার একটা বিষয় তৈরি করতে চেয়েছি।

একটা রিলে রেস, অতঃপর স্বপ্নপূরণ

আসলে অনেকটা সময় আমি একা দৌড়াচ্ছিলাম, কিন্তু দৌড়াতে দৌড়াতে মনে হলো, একা দৌড়ালে কিছু হবে না। রিলে রেস শুরু করব। রিলে রেসের প্রথম চক্করটা মারার পর আমাকে যদি কেউ বিশ্বাস করে, তবেই তো সে আমার লাঠিটা নেবে। এটা করতে পারলে সম্মিলিতভাবে স্বপ্নপূরণ সম্ভব। যে কারণে আমি কিছু উদ্যোগ নিই, যা মোটেও আমার ব্যক্তিগত কিছু নয়। হয়তো আমি কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু চারপাশটায় আরো অজস্র মানুষ স্বপ্নটাকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন