বুধবার| জানুয়ারি ২২, ২০২০| ৯মাঘ১৪২৬

সম্পাদকীয়

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ‘গিনিপিগ’ বাংলাদেশ

নাজমুল হক তপন

একটু পেছনে ফেরা যাক। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সফরে আসে নিউজিল্যান্ড। ওই সফরের দুই বছর আগে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে অভিষেক হয়ে গেছে কিউই দলের উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান ব্রেন্ডন ম্যাককালামের। বাংলাদেশ সফরের আগে অনেকগুলোই টেস্ট সিরিজ খেলে ফেলেছেন কিউই হার্ডহিটার। কিন্তু কোনো ফরম্যাটেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেঞ্চুরির নাগাল পাচ্ছিলেন না ম্যাককালাম। বাংলাদেশ সফরে সেঞ্চুরি চানঢাকায় পা রেখেই বলেছিলেন ম্যাককালাম। আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছিল কিউই হার্ডহিটারের। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসেই ১৪৩ রানের ইনিংস খেলেছিলেন ম্যাককালাম।

এটা ছিল টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের শুরুর দিকের ঘটনা। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নিয়ে প্রতিপক্ষের এই যে ইচ্ছাপূরণের খেলা, এটা একদিন শেষ হবে বিশ্বাস ছিল আমাদের দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের। কিন্তু শুরুর দিকেগিনিপিগহিসেবে ব্যবহূত হয়েছে, তা থেকে আজও মুক্তি মেলেনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের। নিত্যনতুন কৌশল করে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে দিনকে দিন। সর্বশেষ ভারত সফরেগোলাপি বলেদিবারাত্রির টেস্ট ম্যাচ তারই এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

সবে শেষ হওয়া কলকাতার ইডেন টেস্টের আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তো অনেক দূরের ব্যাপার, ঘরোয়া ক্রিকেটেই গোলাপি বলে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারের। ঘরোয়া আসরে লম্বা দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটে সাকল্যে দিবারাত্রির একটি মাত্র ম্যাচ খেলার রেকর্ড আছে। সাত বছর আগে বিসিএল ফাইনাল ম্যাচটি ছিল দিবারাত্রির। একে তো ভারতের মতো মহাপরাক্রমশালী প্রতিপক্ষ, আবার খেলছে ঘরের মাঠে। এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই গোলাপি বলে খেলতে রাজি হয়ে গেল বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট। কারণ প্রয়োজনটা ভারতের। দিবারাত্রির টেস্ট খেলে ফরম্যাটে নিজেদের প্রস্তুতি পর্ব সেরে নিয়েছে ভারত। সোজা কথায়, গোলাপি বলে বাংলাদেশ ভারতের এক সফলকেস স্টাডি

বাংলাদেশ যে ব্যবহূত হয়েছে, এটা অনুধাবন করার জন্য প্রয়োজন পড়ে না বিশেষজ্ঞ হওয়ার। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাইরে গোলাপি বলে খেলার ব্যাপারে ভারতের ওজর আপত্তি সবারই জানা। মাত্র কিছুদিন আগেই দিবারাত্রির টেস্ট খেলার জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল ভারত। বাংলাদেশের বিপক্ষে গোলাপি বলে টেস্ট খেলার আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাবে তাদের আপত্তির বিষয়টি পরিষ্কার করেই বলেন কোহলি। তার ভাষায়, ‘ওই সময় গোলাপি বলে আমরা কোনো প্রথম শ্রেণীর ম্যাচও খেলিনি। আমরা অনুশীলনও করিনি। আসলে গোলাপি বলে আমরা আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতা নিতে চেয়েছিলাম দেশের মাটিতেই।কোহলির কথা থেকেই এটা সুস্পষ্ট যে দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে তারপর বিদেশের মাটিতে দিবারাত্রির টেস্ট খেলতে চেয়েছিলেন তারা। কোহলিদের ইচ্ছা পূরণ করতে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করেই অথৈ সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়ার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমাদের ম্যানেজমেন্ট। টেস্ট পৌনে দুদিন নাকি সোয়া দুদিনে শেষ হবে, অত ভাবার দরকারটাই বা কী?

ক্রিকেট গবেষণাগারের এক আদর্শ উপাদেয় নাম বাংলাদেশ ক্রিকেট। উপমহাদেশের কন্ডিশন-আবহাওয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সফর খুব কার্যকর মনে করছে অনেক দলই (বিশেষ করে উপমহাদেশের বাইরের প্রতিষ্ঠিত দলগুলো) উপমহাদেশ ক্রিকেটের দুই প্রতিষ্ঠিত শক্তি ভারত শ্রীলংকা সফরের আগে প্রবণতা দেখা যায়। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরে এসেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। দুই টেস্টের সিরিজে অংশ নিয়েছিল প্রোটিয়ারা। এর পরের মাসেই ভারত উড়ে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে তিন টেস্টের সিরিজ খেলেছিল প্রোটিয়ারা। বাংলাদেশের আবহাওয়া-কন্ডিশনের সঙ্গে ভারতের সাদৃশ্য থাকার সুযোগটা নিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০১৫ সালেও সেই একই ব্যাপার। বাংলাদেশ সফরের দুই মাসের মধ্যেই ভারত সফরে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। স্বাগতিক বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সেবারও ভারতে তিন টেস্টের সিরিজ খেলেছিল প্রোটিয়ারা।

একই পথে হেঁটেছে ইংল্যান্ডও। ২০১৬ সালে দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে এসেছিল ইংল্যান্ড। সফর শেষ করেই ভারতে উড়ে গিয়েছিল ইংলিশরা। ওই সফরে স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে পাঁচ টেস্টের সিরিজে অংশ নিয়েছিল ইংল্যান্ড। এর আগে ২০০৩ সালের শেষ দিকে শ্রীলংকা সফরের আগে বাংলাদেশ সফর করেছিল ইংল্যান্ড। বাংলাদেশে দুই টেস্ট সিরিজ শেষ করেই শ্রীলংকায় তিন টেস্টের সিরিজে অংশ নিয়েছিল ইংলিশরা।

টেস্ট যাত্রার শুরু থেকেই ভেনু উদ্বোধনের জন্য নিয়মিতভাবে ডাক পড়ছে বাংলাদেশের। ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ওই সফরে দুটো টেস্টে অংশ নিয়েছিল টাইগাররা। প্রথম টেস্টের ভেনু ছিল ডারউইন আর দ্বিতীয় টেস্ট খেলা হয়েছিল কেয়ার্নসে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই টেস্ট ভেনু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল কেয়ার্নস ডারউইন। অভিষিক্ত ভেনুর সঙ্গে বাংলাদেশের নামটা যেন জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্ঠেই। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ড সফরে নতুন ভেনু ডানেডিনের ইউনিভার্সিটি অব ওটাগো ওভালে প্রথম টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, দুই বছর পর একই ভেনু মর্যাদা লাভ করে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ভেনুর। বলা বাহুল্য, স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের প্রতিপক্ষ দলটি ছিল বাংলাদেশ। ভেনু উদ্বোধনের সেই ধারাটা এখনো সুনামের সঙ্গেই বহন করে চলেছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট খেলেছিল পচেফস্ট্রুমের সেনোয়েস পার্কে। দক্ষিণ আফ্রিকা-বাংলাদেশ ম্যাচের মধ্য দিয়েই টেস্ট মর্যাদায় আসীন হয় পচেফস্ট্রুমের ভেনু।

গত এক দশক নির্বাসিত থাকার পর পাকিস্তানে যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরছে, এর অনেকখানি কৃতিত্ব (!) দাবি করতেই পারে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালে লংকান ক্রিকেটারদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলা বর্জন করে আসছে ক্রিকেট বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত দলগুলো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই বদ্ধ দুয়ার খোলার জন্য বাংলাদেশের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করে এসেছে পাকিস্তান। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা তো বটেই, উপমহাদেশের দল শ্রীলংকার সঙ্গে আরব আমিরাতে টেস্ট খেলেছে পাকিস্তান। কিন্তু বাংলাদেশের বিপক্ষে তারা দুবাই, আবুধাবিতে টেস্ট খেলতে রাজি নয়। আরব আমিরাতে টেস্ট খেলার জন্য বাংলাদেশকে কখনই প্রস্তাব দেয়নি পাকিস্তান। তাদের সবসময়ই দাবি, পাকিস্তানে গিয়ে খেলতে হবে বাংলাদেশকে। পর্যায়ক্রমে পাকিস্তানের আবদার পূরণ করে আসছে বাংলাদেশ। জাতীয় দল না পাঠালেও দুই দফায় নারী জাতীয় দলকে পাকিস্তান সফরে পাঠিয়েছে বিসিবি। পাকিস্তান সফরে পাঠানো হয়েছে বয়সভিত্তিক দলকে। বাংলাদেশ জাতীয় দলকে তাদের দেশে নিয়েই ছাড়বেএই গোঁ পাকিস্তান এখনো ছাড়েনি। তাদের ক্রিকেটে বদ্ধ দুয়ার খোলার জন্য বাংলাদেশ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে বিশ্বাস থেকে এক চুলও সরেনি পাকিস্তান। অন্যের উপলক্ষ হতে বাংলাদেশ যে সবার উপরে, সত্যটা খুব ভালোভাবেই জানে পাকিস্তান।

বাংলাদেশকে খুব ভালোভাবেই ব্যবহার করেছে আফগানিস্তান। সীমিত ওভারের ক্রিকেটের দলের (ওয়ানডে টি২০) বাইরে নিজেদের পরিচয় করানোটা নতুন টেস্ট দলটির জন্য হয়ে ওঠে সময়ের দাবি। প্রায় দুই দশকের টেস্ট স্ট্যাটাসসমৃদ্ধ স্বাগতিক বাংলাদেশকে প্রথম সুযোগে হারিয়ে দিয়ে বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটে বড় বিজ্ঞাপনটাই হাতিয়ে নিয়েছে আফগানিস্তান। বলা বাহুল্য, নিজেদের তৃতীয় টেস্টেই বিদেশ জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি। এর মধ্য দিয়ে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার যৌক্তিকতাকে জোরালোভাবে প্রমাণ করেছে আফগানরা।

বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে সবাই ইচ্ছাপূরণের খেলায় মাতবে আর ক্রিকেটকে ভালোবেসে আমাদের দেশের মানুষ বছরের পর বছর তা সহ্য করবেএটাই যেন এক অলিখিত নিয়ম। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার শুরু থেকেই যে প্যাঁচ-পাকের ঘোরে পড়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল এখনো আয়ত্ত করতে পারেননি বাংলাদেশ ক্রিকেট কর্ণধাররা। অন্যরা বাংলাদেশকে নিয়ে খেলছে, খেলবেএটাই যেন চরম পরম সত্যি। প্রয়োগের আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সবেচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয় গিনিপিগের নাম। ক্রিকেটে বোধকরি গিনিপিগের জায়গাটি নিয়েছে বাংলাদেশ। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, অন্য দেশগুলোর প্রাপ্তির উপলক্ষ হওয়াটাই কি তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য নিয়তি নির্ধারিত?

 

নাজমুল হক তপন: সাংবাদিক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন